নিকোলাই ইভানোভিচ বুখারিন (রুশ ভাষায়: Николай Иванович Бухарин, ৯ অক্টোবর ১৮৮৮ – ১৫ মার্চ ১৯৩৮) ছিলেন একজন রুশ বিপ্লবী, সোভিয়েত রাজনীতিবিদ এবং মার্কসবাদী তাত্ত্বিক। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টির “সবচেয়ে মূল্যবান এবং প্রধান তাত্ত্বিক” হিসাবে বর্ণনা করেছেন। বুখারিন এমন একজন বিশিষ্ট বলশেভিক যিনি ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৩৭ সালে তার শুদ্ধিকরণের আগ পর্যন্ত সোভিয়েত সরকারে সক্রিয় ছিলেন।[১]
১৯০৬ সালে বুখারিন রুশ সমাজ গণতান্ত্রিক শ্রমিক পার্টিতে যোগ দেন এবং তখন মস্কো ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করতেন। ১৯১০ সালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অভ্যন্তরীণভাবে ওনেগায় নির্বাসিত করা হয়, কিন্তু পরের বছর তিনি বিদেশে পালিয়ে যান, যেখানে তিনি লেনিন এবং লিও ট্রটস্কির সাথে দেখা করেন এবং সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্ব অর্থনীতি (১৯১৫) নামক বই রচনার মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর, বুখারিন মস্কোতে ফিরে আসেন এবং দলের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন এবং অক্টোবর বিপ্লবের পর পার্টির সংবাদপত্র প্রাভদার সম্পাদক হন। তিনি ১৯১৮ সালে বাম সাম্যবাদী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেন এবং গৃহযুদ্ধের সময় অন্যান্য রচনার মধ্যে সাম্যবাদের অ-আ-ক-খ (১৯২০; ইয়েভগেনি প্রিওব্রাজেনস্কির সাথে) এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ: সমাজবিজ্ঞানের এক ব্যবস্থা (১৯২১) লেখেন।
বুখারিন প্রথমে যুদ্ধ সাম্যবাদের সমর্থক ছিলেন, কিন্তু ১৯২১ সালে তিনি নতুন অর্থনৈতিক নীতি (NEP) প্রবর্তনকে সমর্থন করেন এবং এর প্রধান তাত্ত্বিক এবং প্রবক্তা হয়ে ওঠেন, একই সাথে ত্রতস্কি ও বাম বিরোধীদের বিরুদ্ধে দলীয় নেতৃত্বকে সমর্থন করেন। ১৯২৪ সালের শেষের দিকে, এই অবস্থান বুখারিনকে জোসেফ স্তালিনের প্রধান মিত্র হিসেবে অনুকূলভাবে স্থাপন করে, বুখারিন শীঘ্রই স্ট্যালিনের “এক দেশে সমাজতন্ত্র” তত্ত্বটি ব্যাখ্যা করেন। ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত, বুখারিন কমিন্টার্নের নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মহা উল্লম্ফনের সময় স্তালিনের কৃষি যৌথকরণের সিদ্ধান্তের পর, বুখারিনকে ডানপন্থী ঝোঁকের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং ১৯২৯ সালে কমিন্টার্ন, প্রাভদা এবং দলীয় নেতৃত্ব থেকে অপসারণ করা হয়।[২]
নিম্ন পদে কিছু সময় থাকার পর, ১৯৩৪ সালে বুখারিন কেন্দ্রীয় কমিটিতে পুনঃনির্বাচিত হন এবং ইজভেস্তিয়া পত্রিকার সম্পাদক হন। তিনি ১৯৩৬ সালের সোভিয়েত সংবিধানের একজন প্রধান স্থপতি ছিলেন।
মহা শুদ্ধিকরণের সময় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য স্তালিনের সাংগঠনিক ও তাত্ত্বিক নেতৃত্বে যে নীতি সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি গ্রহণ করেছে, বুখারিন পার্টির অভ্যন্তরে দক্ষিণপন্থী ভিন্ন একটি গ্রুপ গঠনের মাধ্যমে তার বিরোধিতা করছেন। ১৯৩৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বুখারিন ও তাঁর উপদলের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কাজের অভিযোগ আনা হয় এবং ১৯৩৮ সালে মস্কো মামলার একটি মুক্ত বিচারের পর তাঁর অপর সঙ্গীদের সঙ্গে তাঁকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।[৩]
রাজনৈতিক মর্যাদা এবং অর্জন
ক্ষমতা থেকে পতনের পরেও, বিশ শতকের বিশ এবং ত্রিশের দশক জুড়ে নিকোলাই বুখারিন দলের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। লেনিন তার ইচ্ছাপত্রে তাকে দলের সোনার ছেলে হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন।
বুখারিন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী চিন্তাধারায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল “ক্রান্তিকালীন সময়ের অর্থনীতি” (১৯২০) এবং তার কারাগার বিষয়ক লেখা, “দার্শনিক আরবেসকস”, পাশাপাশি সোভিয়েত শিল্পকলা ও বিজ্ঞান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং একজন আগ্রহী উদ্ভিদবিদ ছিলেন। অর্থনীতিতে তার প্রাথমিক অবদান ছিল প্রান্তিক উপযোগ তত্ত্বের সমালোচনা, সাম্রাজ্যবাদের বিশ্লেষণ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমে উত্তরণের উপর তার লেখা।
কিছু পণ্ডিত ত্রতস্কির পাশাপাশি বুখারিনকে স্তালিনবাদের রাজনৈতিক বিকল্পের প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন। এর আংশিক কারণ ছিল যে, তিনি ডানপন্থী এবং বামপন্থী উভয় উপদলেই কার্যত নেতৃত্ব দিয়েছেন, এবং সেই নেতৃত্ব স্তালিনের থেকে আলাদা। এই মূল পার্থক্যগুলি অর্থনীতি, পররাষ্ট্র নীতি এবং সাংস্কৃতিক বিষয়গুলির সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছিল।
বুখারিনের ধারণা, বিশেষ করে অর্থনীতি এবং বাজার সমাজতন্ত্রের প্রশ্নে, যা বুখারিনবাদ নামে পরিচিত, পরবর্তীতে চীনা সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতি এবং দেং জিয়াওপিংয়ের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মার্কিন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের অনুগত দাসলেখকেরা তাঁর মৃত্যুকে নিয়ে অনেক কল্পকাহিনী রচনা করে সাম্রাজ্যবাদী মিথ্যা প্রচারণার দাবার ঘুটি হিসেবে কাজে লাগিয়েছে।
আরো পড়ুন
- নিকোলাই বুখারিন ছিলেন একজন রুশ বিপ্লবী ও সোভিয়েত রাজনীতিবিদ
- গঙ্গাধর মোরেশ্বর অধিকারী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক নেতা
- কার্ল কাউটস্কি ছিলেন চেক-অস্ট্রিয়ান দার্শনিক, সাংবাদিক এবং মার্কসবাদী তাত্ত্বিক
- দেং জিয়াওপিং ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের একজন প্রতিবিপ্লবী কুচক্রী রাজনীতিবিদ
- কার্ল মার্কস বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ মহান বিপ্লবী ও দার্শনিক
- ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের পথিকৃৎ মহান বিপ্লবী ও দার্শনিক
- জোসেফ স্তালিন সোভিয়েত রাষ্ট্রনায়ক এবং মানবেতিহাসের মহত্তম নেতা
- মাও সেতুং ছিলেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সাম্যবাদী বিপ্লবী
- লেনিন ছিলেন বিশ শতকের ইউরোপের মহত্তম মানব এবং মার্কসবাদের উত্তরসূরি
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ৭ মে ২০১৯; রোদ্দুরে.কম, “নিকোলাই বুখারিন রুশ বিপ্লবের একজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/nikolai-ivanovich-bukharin/
২. ইংরেজি উইকিপিডিয়া, সংগ্রহের তারিখ ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৯৬।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।
লেখাটি একদম আলাদা ধরনের এবং খুব ভালো হয়েছে। আরো লিখবেন আশা করি।