‘যদি জানতে গো তুমি জানতে’ গানটি বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক কালজয়ী মহাকাব্য। ১৯৬১-৬২ সালের দিকে রেকর্ড করা এই গানটির কথা ও সুরের জাদুকর ছিলেন কিংবদন্তি সলিল চৌধুরী। প্রথিতযশা শিল্পী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভরাট এবং আবেগঘন কণ্ঠ গানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে নাড়া দেয়।
সঙ্গীত পরিচালনার ক্ষেত্রে এই গানে সলিল চৌধুরীর অনন্য সিগনেচার স্টাইল স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি অত্যন্ত নিপুণতায় পাশ্চাত্য হারমোনির সাথে বাঙালির চিরচেনা ধ্রুপদী ঢঙের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন। সলিল চৌধুরীর এই জটিল অথচ শ্রুতিমধুর সুরের সাথে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য গায়কি গানটিকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দিয়েছে, যা আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়।
গানটি ইউটিউব থেকে শুনুন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে
গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
গীতিধর্মী এই গানের মূল উপজীব্য হলো বিচ্ছেদ, না-বলা কথা আর না-পাওয়ার এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। গানটিতে বিষাদ, হারানো প্রেম এবং তীব্র অভিমান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে কবি নিজেকে সুরহীন ও পথভোলা এক পথিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বসন্তের ঝরা ফুলের রূপকে তিনি অতৃপ্তি ও বিচ্ছেদের এক করুণ আখ্যান রচনা করেছেন, যেখানে জীবনের সব মায়া ত্যাগ করে নিঃশব্দে প্রস্থান করার আর্তিই শেষ কথা।
- ছন্দপতন ও সুর হারানো: গানের শুরুতে “ছন্দবিহীন ছন্দে” গেয়ে যাওয়ার কথা বলে কবি মনের এক চরম বিশৃঙ্খলার কথা বুঝিয়েছেন। প্রিয়তমার চোখে চেয়ে সুর হারানোর অর্থ হলো—প্রেমে এতটাই নিমগ্ন হওয়া যে নিজের অস্তিত্ব বা শিল্প সত্তা সেখানে বিলীন হয়ে গেছে। শিল্পী এখানে নিজেকে একজন “পথভোলা পান্থ” বা পথিক হিসেবে দেখিয়েছেন, যে গন্তব্যে পৌঁছানোর বদলে এক “দুস্তর প্রান্তে” বা দুর্গম সীমানায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
- বসন্ত ও জীবন দিগন্তের রূপক: কবি এখানে “জীবন দিগন্ত” বলতে বার্ধক্য বা জীবনের শেষ সময়কে বুঝিয়েছেন। বসন্ত সাধারণত যৌবন ও মিলনের প্রতীক, কিন্তু কবির কাছে সেই বসন্ত এসেছে “ঝরা ফুলে”র বিষাদ নিয়ে। অর্থাৎ, যখন পাওয়ার সময় ছিল, তখন তিনি কেবল রিক্ততাই পেয়েছেন। “জীবন বনান্তে” বা জীবনের অরণ্যের শেষে এসে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে তাঁর অর্জনের ঝুলি শূন্য।
- চূড়ান্ত অভিমান ও নির্লিপ্তি: গানের শেষাংশে এক গভীর অভিমানী সুর ফুটে উঠেছে। “আর ডেকো না মোরে” বলে তিনি চিরতরে বিদায় নিতে চাইছেন। তিনি অনুরোধ করছেন তাঁর গানগুলো যেন কেউ মনে না রাখে, কারণ সেই সুরগুলো এখন কেবলই যন্ত্রণার স্মারক। “প্রেমেরই একান্তে” ফিরে না যাওয়ার সংকল্পটি দেখায় যে, তিনি মায়া এবং মোহ থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করে এক নিঃসঙ্গ কিন্তু শান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
- শব্দের কারুকার্য: পুরো কবিতায় ‘অজান্তে’, ‘প্রান্তে’, ‘দিগন্তে’, ‘বসন্তে’, ‘বনান্তে’ এবং ‘একান্তে’—এই অন্ত্যমিলগুলো গানের বাণীতে এক ধরণের বিষণ্ণ গাম্ভীর্য তৈরি করেছে। সলিল চৌধুরী এখানে বিরহকে কেবল চোখের জল হিসেবে না দেখিয়ে এক ধরণের মহৎ রিক্ততা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
গানের কথা
যদি জানতে গো তুমি জানতে
কেন এই মন আমার ছন্দবিহীন ছন্দে গেয়ে যায়
হারালো সুর সে যে তোমার চোখে চেয়ে কখন মনের অজান্তে
পান্থ আমি তোমার পথে যেতে পথ ভোলা দুস্তর প্রান্তে।
তুমি জান কি আমি এলাম জীবন দিগন্তে?
সান্ত্বনা মোর এই শুধু আমি পাড়ি দিয়েছি বসন্তে
ঝরা ফুলে ফুলে গেছে ছেয়ে এই জীবন বনান্তে।
আর ডেকো না মোরে ডেকো না সকরুণ সুরেতে ডেকো না
যা কিছু মোর গান ছিল সুরে সুরে মনেতে রেখো না
ফিরে যাব না যাব না আমি আর প্রেমেরি একান্তে।।
আরো পড়ুন
- যদি কিছু আমারে শুধাও: সলিল চৌধুরীর সুরের জাদুতে এক অব্যক্ত অনুভূতির গল্প
- যদি জানতে গো তুমি জানতে: সলিল-মানবেন্দ্র জুটির এক কালজয়ী মহাকাব্য
- আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা: সলিল চৌধুরীর এক অমর সৃষ্টির নেপথ্য কাহিনী ও লিরিক্স
- ও মোর ময়না গো: লতা মঙ্গেশকর ও সলিল চৌধুরীর সেই কালজয়ী বিরহের গানের গল্প ও লিরিক্স
- ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে: সলিল চৌধুরীর কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাস ও লিরিক্স
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম: সলিল চৌধুরীর এক অনবদ্য আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. লেখাটি ২০ মার্চ ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚