মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ

মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে, মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে—কালজয়ী এই গানটি গীতিকার প্রণব রায়ের এক অনন্য সৃষ্টি। ১১ লাইনের এই নাতিদীর্ঘ আধুনিক বাংলা গানটি মূলত মায়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও মমত্বের এক সুরেলা বহিঃপ্রকাশ। গানটির আদি সংস্করণে সুরারোপ ও কণ্ঠদান করেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী সুধীরলাল চক্রবর্তী। পরবর্তীতে অনুপ ঘোষাল, কুমার শানু, আরতি মুখোপাধ্যায়, সাদি মহম্মদসহ অনেক গুণী শিল্পী গানটি নতুন করে গেয়েছেন। মাতৃত্বের মহিমা ও প্রশস্তি চমৎকারভাবে ফুটে ওঠায় গানটি যুগে যুগে প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান করে নিয়েছে এবং হয়ে উঠেছে এক চিরন্তন ধ্রুপদী সৃষ্টি।

গানটির কাব্যিক বিশ্লেষণ

মহাজাগতিক ও নৈসর্গিক রূপক

এই চরণে মা কেবল একজন রক্ত-মাংসের মানুষ নন, তিনি প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর হাসিকে চাঁদের স্নিগ্ধতার সাথে তুলনা করে লেখক এক অপার্থিব সৌন্দর্যের অবতারণা করেছেন। মায়ের উপস্থিতি কেবল গৃহকোণে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তিনি সন্ধ্যায় রাতের তারা হয়ে সারা আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছেন। এই মহাজাগতিক রূপকটি বুঝিয়ে দেয় যে, সন্তানের কাছে মায়ের স্মৃতি ও অস্তিত্ব মহাবিশ্বের মতোই বিশাল এবং চিরন্তন।

সজল আঁখি ও মমতার গভীরতা

“সজল বীথি” বা সজল দিঠি শব্দবন্ধটির মাধ্যমে মায়ের অন্তহীন মায়ার কথা বলা হয়েছে। এখানে জলভরা চোখ কেবল দুঃখের প্রতীক নয়, বরং তা সন্তানের প্রতি মায়ের গভীর বাৎসল্য ও সহমর্মিতার বহিঃপ্রকাশ। এই মায়া কখনো হারিয়ে যায় না; বরং সন্তানের জীবনের প্রতিটি মোড়ে তা ছায়ার মতো লেগে থাকে। মা ও সন্তানের এই যে আত্মিক টান, লেখক তাকে এক হারানো সুরের মতো আবিলতাহীন ও শাশ্বত রূপ দিয়েছেন।

দিব্য জ্যোতি ও পবিত্রতা

মায়ের ললাটের সিঁদুরকে ভোরের উদীয়মান সূর্যের (রবি) সাথে তুলনা করে কবি মাতৃত্বকে এক দিব্য ও পবিত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সূর্যের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে পৃথিবীকে জাগিয়ে তোলে, মায়ের সিঁদুর বা তাঁর আশীর্বাদও তেমনি সন্তানের জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। আবার মায়ের আলতা রাঙা পায়ের ছোঁয়ায় ‘রক্ত কমল’ বা লাল পদ্ম ফোটার কল্পনাটি অত্যন্ত উচ্চমার্গের কাব্যিক অলংকার। এটি মায়ের চরণে সন্তানের অগাধ ভক্তি ও মায়ের পবিত্রতারই এক সার্থক প্রতিচ্ছবি।

নিঃস্বার্থ সেবা ও অতুলনীয় সত্তা

দুঃখের দিনে বা অসুস্থতায় মায়ের ভূমিকা এখানে ‘প্রদীপ’ হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। শিয়রে প্রদীপ হয়ে জেগে থাকা মানে হলো সন্তানের বিপদে মায়ের বিনিদ্র রজনী যাপন এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনা। পুরো অনুচ্ছেদটিতে বারবার “বিশ্ব ভুবন মাঝে তাহার নেইকো তুলনা” বাক্যটির ব্যবহার এটিই প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের চেয়েও মায়ের ভালোবাসা শ্রেষ্ঠ। মা এখানে ত্যাগের এক জীবন্ত বিগ্রহ, যাঁর কোনো বিকল্প এই সৃষ্টিজগতে নেই।

গানের কথা

মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে,
মাকে মনে পড়ে, আমার মাকে মনে পড়ে।।

তার মায়ায় ভরা সজল বীথি সেকি কভু হারায়?
সে যে জড়িয়ে আছে ছড়িয়ে আছে সন্ধ্যা রাতের তারায়,
সেই যে আমার মা!
বিশ্ব ভূবন মাঝে তাহার নেইকো তুলনা।।

তার ললাটের সিঁদুর নিয়ে ভোরের রবি উঠে,
আলতা পড়া পায়ের ছোয়ায় রক্ত কমল ফোটে।

প্রদীপ হয়ে মোর শিয়রে কে জেগে রয় দুখের ঘরে
সেই যে আমার মা।।
বিশ্ব ভূবন মাঝে তাহার নেই কো তুলনা।।

আরো পড়ুন

গানটি সাদি মহম্মদের কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে

তথ্যসূত্র ও নোট

১. লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১২৯ থেকে নেয়া হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!