নাইবা ঘুমালে প্রিয়, রজনী এখনো বাকি, প্রদীপ নিভিয়া যায়, শুধু জেগে থাক্ তব আঁখি—এটি প্রখ্যাত গীতিকার প্রণব রায়ের লেখা একটি কালজয়ী আধুনিক বাংলা গান। প্রায় ১০ লাইনের এই নাতিদীর্ঘ প্রেমের গানটিতে সুরারোপ করেছিলেন প্রথিতযশা সুরকার সুবল দাশগুপ্ত। গানটি প্রথম রেকর্ডিংয়ে কণ্ঠ দিয়েছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী কে এল সায়গল। পরবর্তীতে শিল্পী অনুপ ঘোষাল, কুমার শানু, অমিত পাল, কালিদাস কবিরাজ এবং বিমান মুখোপাধ্যায়সহ অনেক জনপ্রিয় শিল্পী বিভিন্ন সময়ে গানটি নতুন করে গেয়েছেন, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অম্লান।
গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ:
- নিবিড় সাহচর্যের আকুতি: গানের শুরুতেই “রজনী এখনো বাকি” বলে কবি প্রিয়তমাকে অনুরোধ করছেন জেগে থাকার জন্য। প্রদীপ নিভে আসা মানে বাইরের জগতের আলো বা কোলাহল কমে যাওয়া, কিন্তু প্রিয়তমার চোখের দৃষ্টি যেন সেই শূন্যতা পূরণ করে। এখানে ‘জেগে থাকা’ কেবল শারীরিক জাগরণ নয়, বরং একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগের একটি ব্যাকুলতা।
- প্রকৃতির সাথে হৃদয়ের মেলবন্ধন: দ্বিতীয় অংশে হেনার সুগন্ধ এবং সাথীহারা পাখির ডাকের মাধ্যমে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। “পিয়া পিয়া” বলে পাখির ডাক বিরহের আভাস দিলেও, কবির কাছে তা মিলনের এই মুহূর্তকে আরও গভীর করে তোলে। প্রকৃতি এখানে প্রেমের সাক্ষী হিসেবে কাজ করছে।
- সৌন্দর্য ও তুলনার চিরন্তন দ্বন্দ্ব: “আকাশের বুকে চাঁদ, মোর বুকে তব মুখ জাগে”—এখানে কবি আকাশের চাঁদের চেয়েও প্রিয়তমার মুখকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কার রূপ বেশি সুন্দর, সেই অমীমাংসিত প্রশ্নটি প্রেমের এক চিরায়ত মধুর দ্বিধা যা গানটিকে আরও রোমান্টিক করে তুলেছে।
- চিরস্থায়ী বন্ধনের আকাঙ্ক্ষা: শেষ অংশে “একটি প্রেমের রাখি” দিয়ে দুটি হৃদয়কে বেঁধে ফেলার কথা বলা হয়েছে। মধুময় এই মাধবী রাতে দুজনে মিলে জেগে থাকা এবং হৃদয়ের এই মিলন যেন সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, সেই প্রার্থনাই ফুটে উঠেছে শেষ চরণে।
গানের কথা
নাইবা ঘুমালে প্রিয়, রজনী এখনো বাকি,
প্রদীপ নিভিয়া যায়,
শুধু জেগে থাক্ তব আঁখি।।
এখনো দুয়ার পাশে, হেনার সুরভী আসে,
পিয়া পিয়া বলে ডাকে, সাথীহারা কোন পাখি।।
রজনী এখনো বাকি।।
আকাশের বুকে চাঁদ, মোর বুকে তব মুখ জাগে
আমি চেয়ে চেয়ে দেখি, কারে সুন্দরতর লাগে।।
এ মধু মাধবী রাতে,জেগে রব দু’জনাতে।।
জড়াক দুটি হৃদয় একটি প্রেমের রাখি।
রজনী এখনো বাকি।
আরো পড়ুন
- কতদিন দেখিনি তোমায়: প্রণব রায় রচিত বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক কাব্যিক আখ্যান
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- বাস্তববাদী গান হচ্ছে বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উদ্ভূত হয়েছে
- প্রেমের গান ভালোবাসা, প্রেমে পড়ার আনন্দ ও বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে রচিত হয়
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
গানটি বিমান মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে
তথ্যসূত্র ও নোট
১. লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১২৯ থেকে নেয়া হয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।