জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল হচ্ছে প্রণব রায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান। গানটির প্রথম রেকর্ডিং-এ সুরকার ছিলেন শৈলেশ দাশগুপ্ত এবং শিল্পী ছিলেন সন্তোষ সেনগুপ্ত। প্রণব রায়ের কালজয়ী এই গানটি কেবল প্রেমের ব্যর্থতার গান নয়, এটি সময়ের চাকা ঘুরে যাওয়া এক চরম সত্যের বহিঃপ্রকাশ। গানটির প্রতিটি ছত্রে লুকিয়ে আছে অপ্রাপ্তির বেদনা এবং শেষ মুহূর্তের অসময়ে আসা সমবেদনার প্রতি এক সূক্ষ্ম অভিমান।
গানের মূলভাব ও বিশ্লেষণ
এই গানের মূল উপজীব্য হলো ‘অসময়ের দান’। যখন ভালোবাসার মানুষটি পাশে থাকার কথা ছিল, যখন তাঁর সান্নিধ্য ও স্বীকৃতির (মালা) সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন তিনি ছিলেন অনুপস্থিত। কিন্তু জীবনের সব চাওয়া-পাওয়ার অবসান যখন মৃত্যুতে ঘটে, তখন সেই মানুষের ফিরে আসা এবং শ্রদ্ধার্ঘ্য (ফুল) নিবেদন করাকে শিল্পী এক ধরণের করুণ পরিহাস হিসেবে দেখিয়েছেন।
- বিপরীত বৈপরীত্য: ‘মালা’ এবং ‘ফুল’—দুটিই সৌন্দর্যের প্রতীক হলেও গানে মালা জীবনের সজীবতা ও স্বীকৃতির এবং ফুল মৃত্যুর নীরবতা ও বিচ্ছেদের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
- আবেগীয় গভীরতা: সন্তোষ সেনগুপ্তের কণ্ঠে গানটি যে বিষাদময় আবহ তৈরি করে, তা বিরহী হৃদয়ের গুমরে মরা কান্নাকে স্পর্শ করে। এটি এমন এক অনুভূতির কথা বলে যেখানে অভিমান এতটাই প্রবল যে, পরপারের যাত্রী হয়েও শিল্পী সেই বিলম্বে আসা ভালোবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে দ্বিধা করেননি।
কালের আবর্তে গানের রিমেক ও কালজয়ী কণ্ঠস্বর
সন্তোষ সেনগুপ্তের সেই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংয়ের পর গানটি বাংলার সঙ্গীত আকাশে এক অনন্য স্থান করে নেয়। পরবর্তী সময়ে আধুনিক বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী কুমার শানু তাঁর দরদী কণ্ঠে এই গানটিকে এক নতুন মাত্রা দান করেন। এছাড়াও অনুপ ঘোষাল, কালিদাস কবিরাজ এবং বর্তমান প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী সামিনা চৌধুরী থেকে শুরু করে অনেকেই নিজ নিজ শৈলীতে গানটি নতুন করে গেয়েছেন। প্রতিটি রিমেক বা কভার ভার্সনে শিল্পীগণ বিরহের সেই চিরন্তন হাহাকারকে ভিন্ন ভিন্ন আবেগ ও সুরের মূর্ছনায় ফুটিয়ে তুলেছেন। এই বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনাগুলোই প্রমাণ করে যে, প্রণব রায়ের কালজয়ী কথা আর শৈলেশ দাশগুপ্তের সুর আজও কতটা প্রাসঙ্গিক এবং নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের হৃদয়েও সমভাবে নাড়া দিতে সক্ষম।
গানের কথা
তুমি জীবনে যারে দাওনি মালা,
মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল?
মুখপানে যার কভু চাওনি ফিরে,
কেন তারি লাগি আঁখি অশ্রু আকুল।।
চিরদিন যারে তুমি করেছ হেলা
হৃদয় লয়ে শুধু খেলেছো খেলা;
বিরহে তারি আজি বলো গো কেন—
শূন্য লাগে এই ধরণী বিপুল।।
আমি তো ছিলাম প্রিয় তোমারই কাছে,
সেই বকুল তলে সেই চাঁদিনী রাতে,—
সেদিন কেন দিলে নাকো হায়
যে মালাখানি ছিল তোমারই হাতে।
মোর যত প্রেম, মোর যত গান,
চাইনি তো কভু কোনো প্রতিদান—
চিরতরে হায় যবে নিলাম বিদায়,
তুমি বুঝিলে কি গো তব হৃদয়ের ভুল।।
আরো পড়ুন
- কতদিন দেখিনি তোমায়: প্রণব রায় রচিত বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক কাব্যিক আখ্যান
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- বাস্তববাদী গান হচ্ছে বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উদ্ভূত হয়েছে
- প্রেমের গান ভালোবাসা, প্রেমে পড়ার আনন্দ ও বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে রচিত হয়
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
কালিদাস কবিরাজের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে
তথ্যসূত্র
১. লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ৩৫৩ পৃষ্ঠা থেকে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।