কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা (ইংরেজি: Poetry of Kazi Nazrul Islam) মূলত অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, দেশপ্রেম এবং মানবতার জয়গানে মুখর, যার কারণে তিনি বিদ্রোহী কবি হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর রচনায় একইসাথে সাম্যবাদী চেতনা এবং প্রাণের আবেগময় গভীরতা ফুটে ওঠে, যা বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য বিপ্লবের সূচনা করেছে।
কাজী নজরুল ইসলাম নিঃসন্দেহে এক ক্ষমতাশালী ও কৃতি কবি, যাঁর সৃষ্টির মূলে কাজ করেছে এক প্রখর ও তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টি। তিনি জগতকে দেখেছেন শোষক আর শোষিতের দ্বন্দ্বে—যেখানে তাঁর দৃষ্টি ছিল শাণিত তলোয়ারের মতো বিদ্ধকারী। তবে সমালোচকদের দৃষ্টিতে, নজরুলের কবিতায় অনেক ক্ষেত্রে হয়তো দার্শনিক জিজ্ঞাসার সেই ধ্রুপদী গভীরতা কিংবা নিস্পৃহ যুক্তির পারম্পর্য ততোটা প্রকট নয়, যতটা তীব্র তাঁর আবেগের বিচ্ছুরণ। তিনি যুক্তি দিয়ে জগতকে ব্যাখ্যা করার চেয়ে, হৃদয়ের অদম্য আর্তি দিয়ে জগতকে ওলটপালট করতে বেশি সচেষ্ট ছিলেন।
কিন্তু এই ‘জিজ্ঞাসার অভাব’ বা ‘যৌক্তিক পরম্পরার’ অনুপস্থিতিই নজরুলের কবিতার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটাই তাঁর স্বকীয়তা। তিনি মননশীলতার চেয়ে জীবন-সংগ্রামের উত্তাপকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর কবিতায় যুক্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। যেখানে গভীর দার্শনিকতা অনেক সময় মানুষকে নিস্পৃহ বা কর্মবিমুখ করে তোলে, সেখানে নজরুলের তীক্ষ্ণ ও প্রত্যক্ষ সংঘাতের ভাষা নিপীড়িত মানুষকে তাৎক্ষণিক আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলে, তাঁর দৃষ্টির এই প্রখরতা ও আবেগের অকৃত্রিমতাই তাঁকে গণমানুষের হৃদয়ে এক অজেয় স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কবিতার বইসমূহ
কাজী নজরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য কবিতার বইয়ের মধ্যে অগ্নি-বীণা (১৯২২), বিষের বাঁশি (১৯২৪), দোলনচাঁপা (১৯২৩), সাম্যবাদী (১৯২৫), সর্বহারা (১৯২৬), ভাঙার গান (১৯২৪) এবং ফণি-মনসা (১৯২৭) অন্যতম । তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রতিবাদ, প্রেম, সাম্য ও মানবতার জয়গান ফুটে উঠেছে। তাঁর ছায়ানট (১৯২৫) প্রকৃতি ও প্রেম বিষয়ক কাব্য। ছোটদের জন্য তাঁর কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে ঝিঙে ফুল, সিন্ধু-হিল্লোল, চক্রবাক, প্রলয়-শিখা, ইত্যাদি।
কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে (কার্তিক ১৩২৯ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের প্রচ্ছদপট এঁকেছিলেন শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গ্রন্থটি বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এতে মোট ১২টি কবিতা সংকলিত হয়েছে, যার মধ্যে ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘কামাল পাশা’ এবং ‘আনোয়ার পাশা’ উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি পঙক্তিতে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র দ্রোহ ফুটে উঠেছে। নজরুলের তেজোদীপ্ত ভাষা, নতুন ছন্দ এবং আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক প্রয়োগ অগ্নিবীণাকে সমকালীন সাহিত্যের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত হয় এবং কবি নিজেই এর প্রকাশক ছিলেন। অগ্নিবীণার পর এটি ছিল কবির এক বিশেষ সৃষ্টি, যা প্রকাশের মাত্র দুই মাস পর ১৯২৪ সালের ২২ অক্টোবর ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। নজরুলের নিষিদ্ধ হওয়া পাঁচটি গ্রন্থের মধ্যে এটি অন্যতম।
বিষের বাঁশি কাব্যগ্রন্থে মোট ২৭টি কবিতা ও গান সংকলিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু কবিতার মধ্যে রয়েছে—‘সেবক’, ‘জাগৃহি’, ‘বোধন’, ‘উদ্বোধন’ এবং ‘তূর্য নিনাদ’। এই কাব্যগ্রন্থের মূলভাব হচ্ছে প্রেম, দ্রোহ ও শোষিতের আর্তনাদের পাশাপাশি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও গণজাগরণের আহ্বান। প্রথিতযশা পত্রিকা ‘প্রবাসী’ এই কাব্যগ্রন্থের প্রশংসা করে একে আগ্নেয়গিরি, প্লাবন ও ঝড়ের রুদ্ররূপের সাথে তুলনা করেছিল। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন ‘কল্লোল’ সম্পাদক দীনেশরঞ্জন দাশ। নজরুল এটি সমাজসেবী মিসেস এম. রহমানকে (মাসুদা খাতুন) উৎসর্গ করেছিলেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কবি ভূমিকায় উল্লেখ করেছিলেন যে, এটি মূলত ‘অগ্নিবীণা ২য় খণ্ড’ হিসেবে প্রকাশের পরিকল্পনা থাকলেও পরবর্তীতে বিশেষ কারণে নাম পরিবর্তন করে ‘বিষের বাঁশি’ রাখা হয়।
সাহিত্যের এক কঠোর সত্য এই যে, কেবল অভিজ্ঞতা বা তাৎক্ষণিক আবেগ কাব্যগুণ লাভের জন্য যথেষ্ট নয়। কোনো অনুভূতি যখন ভাবনার পরিপক্বতায় এবং স্থির উপলব্ধিতে প্রশান্ত ও ঘনীভূত হয়, তখনই তা প্রকৃত কাব্যের মর্যাদা পায়। নজরুলের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তাঁর সৃষ্টির একটি বিশাল অংশ ছিল সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। সেই উত্তাল সময়ে দেশের গণমানুষের বিক্ষোভ আর আবেগকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ভাষা দিয়েছিলেন। ফলে তাঁর অনেক কবিতা, প্রবন্ধ ও পুস্তক তখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করলেও, মহাকালের বিচারে তার সব কটি টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি।
সেদিন যা ছিল রণহুঙ্কার বা সাময়িক উত্তেজনার খোরাক, আজ স্থিতধী পাঠকের কাছে তা হয়তো শুধুই ঐতিহাসিক দলিল বা ‘বকেয়ার তালিকা’ মাত্র। আবেগের আতিশয্যে যখন শিল্পের পরিমিতিবোধ ও শৈল্পিক প্রশান্তি হারায়, তখন সেই সৃষ্টি দীর্ঘস্থায়ী সাহিত্যের আসনটি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। নজরুলের অনেক সৃষ্টিই ছিল সময়ের প্রয়োজনে জন্ম নেওয়া ‘সাময়িকী’ সাহিত্য। জনপ্রিয়তার হাটে সে সময় সেগুলোর আকাশচুম্বী দাম থাকলেও, ভাবনার গভীরতা ও প্রসন্ন উপলব্ধির অভাবে সেগুলোর অনেকগুলোই আজ তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। তবে এই সীমাবদ্ধতার মাঝেই তাঁর যে সৃষ্টিগুলো শাশ্বত মানবিক বোধকে স্পর্শ করেছে, সেগুলোই আজও নজরুলকে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় টিকিয়ে রেখেছে।
ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের নিরিখে বিচার করলে নজরুলের বিদ্রোহে সুশৃঙ্খল কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা কাঠামোগত বিপ্লবের রূপরেখা হয়তো পাওয়া যায় না। তাঁর বিদ্রোহ ছিল মূলত ভাব ও ছন্দের এক আবেগময় জলোচ্ছ্বাস, যা যুক্তির শৃঙ্খল ভেঙে প্রাণের প্রবল বন্যায় চারপাশকে প্লাবিত করতে চেয়েছিল। আজকের সমাজ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তাঁর সেই ‘বিদ্রোহ’ হয়তো অনেক ক্ষেত্রে নিছক রোমান্টিক উচ্ছ্বাস বলে মনে হতে পারে। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, তৎকালীন ঔপনিবেশিক ভারতের স্থবির ও রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে বৈজ্ঞানিক সমাজ-বিপ্লবের চেয়েও বড় প্রয়োজন ছিল মানুষের সুপ্ত চেতনাকে প্রবলভাবে নাড়া দেওয়া।
নজরুল সেই কাজটিই করেছিলেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। তাঁর কবিতায় হয়তো আধুনিক বিদ্রোহের সূক্ষ্ম তাত্ত্বিক বিন্যাস নেই, কিন্তু প্রচলিত রাষ্ট্রশাসন, ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা আর অন্ধ সংস্কারের মূলে যে কুঠারাঘাত তিনি করেছিলেন, তা ছিল অপ্রতিম। অন্যায়ের প্রতি তাঁর এই যে দৃপ্ত বিরুদ্ধাচারণ এবং আপসহীন অবস্থান, তা-ই তাঁকে ‘প্রগতির কবি’ হিসেবে অভিষিক্ত করেছে। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ, যা তৎকালীন স্থবির সমাজকে প্রচণ্ড এক ধাক্কায় জাগিয়ে তুলেছিল। তাই তাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ভাষা দেওয়ার কারণেই তিনি আজ অবধি জনপ্রিয়তার শিখরে আসীন এবং প্রগতিশীল চেতনার এক অনিভাজ্য অংশ। নজরুলকে মূল্যায়ন করে আজহার উদ্দীন খান লিখেছেন,
গল্প-উপন্যাস-নাটকে তিনি ব্যর্থ, কবিতায় তিনি সার্থক, গানে সার্থকতর— ‘গ্রন্থ যাবে গড়াগড়ি গানে হয়েছেন মত্ত’। কেন না তাঁর কোন কোন কবিতা অনাবশ্যক রকমের দীর্ঘ অসহ্য পুরাবৃত্তিতে ভরা। আনন্দের আতিশয্যে নির্বিচার উৎসাহ নিয়ে তিনি বহুতর নূতন আবর্জনাকে কবিতায় স্থান দিয়াছেন। কিন্তু বিষয়গুলো সেখানে আনকোরা কাঁচা বিষয় হয়ে রয়েছে, কাব্যের আলোয় তা ভাষায় রূপান্তর লাভ করেনি।[১]
কাজী নজরুল ইসলাম কেবল সাম্যের কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন অনিয়মের বিরুদ্ধে এক মূর্ত প্রতীক। তিনি যে অদম্য ও দুর্বার যৌবনের জয়গান গেয়েছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে সেই সুর কখনো স্তিমিত হয়নি। নজরুলের কবিতা ও গান ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার অব্যর্থ মন্ত্র। শোষিত, লাঞ্ছিত এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের অন্তহীন বেদনা কবিকে কেবল ব্যথিতই করেনি, বরং তাঁর লেখনীকে করেছিল অগ্নিগর্ভ। তাঁর সেই অবিনাশী আহ্বান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে আজ অবধি প্রতিটি নায্য দাবি আদায়ের মিছিলে প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।
বর্তমান বাংলাদেশে নজরুলের সেই বিদ্রোহী চেতনার প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্ট। কবি যে নিপীড়িত মানুষের জয়ধ্বনি শুনতে চেয়েছিলেন, তারা আজ আত্মমর্যাদা ও অধিকার সচেতনতায় বলীয়ান। যে জীর্ণ সমাজব্যবস্থা ও শোষণের দেয়াল কবিকে বিচলিত করেছিল, আধুনিক বাংলাদেশের জাগ্রত জনতা আজ সেই দেয়াল চূর্ণবিচূর্ণ করে সামনে এগিয়ে চলেছে। কৃষকের লাঙল থেকে শ্রমিকের হাতুড়ি—সবখানেই আজ অধিকার আদায়ের সোচ্চার কণ্ঠস্বর। কবির কাঙ্ক্ষিত সেই সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নসাধ আজ আর কেবল অলীক কল্পনা নয়, বরং তা বাস্তবায়নের পথে ধাবমান এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা এবং কাব্য-দর্শন আজ বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তরে শোষিত মানুষের বিজয়ে সার্থক হয়ে উঠেছে।
আরো পড়ুন
- জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া
- কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ হচ্ছে দেশপ্রেম ও উপনিবেশবাদ বিরোধিতার জ্বলন্ত দলিল
- কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা মূলত বিদ্রোহ, দেশপ্রেম ও মানবতার জয়গানে মুখর
- বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই ঘনায় নয়নে অন্ধকার
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- নজরুল গীতি হচ্ছে দেশপ্রেম, প্রেম, ধর্মসংগীতসহ রাগ ধারার গান
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
তথ্যসূত্র
১. আজহার উদ্দীন খান, মাহবুবুল আলম সম্পাদিত, সমালোচনা সংগ্রহ, খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ২০০১, পৃষ্ঠা ৯৯২।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।