একদিন মৃত্যুর মিছিলে

হঠাৎ বুঝতে পারে সে, ও পথেই তার শেষ আছে যদিও পথটি বৃহৎ এবং শাখা প্রশাখা পূর্ণ ও সংশয়াকূল; ভয় নেই সে পথে, আছে ডেকে এনে পথে নামানো, পথের উপর ক্রমাগত হেঁটে চলা। এ রকম একদিন তারা ক’জন এবং আমরা হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পথের ধারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই; তারপর আবার হাঁটতে থাকি। পথে হাজারো জনের সাথে দেখা হয়, অনেকের কথা আজো মনে আছে, অনেককে তখনই ভুলে গেছি, অনেকে আবার এ খনো একসাথে হাঁটছি, তারা অনেকে আমাদের পথের বাধা সরিয়ে দেয়, আমাদের সকলের হাতগুলো একত্রে ধরে রাখে হাতগুলো ক্রমাগত বদল হয় এবং হাতে পেয়ে যায় মধুরতা বা বিষের পেয়ালা। অনেক হাতের মাঝে বুঝতে পারে সে, তার হাত এখনো শক্ত হয়নি এবং আমার কচি শরীর কেবল ষোল বছরের, সেই যুবক আমি একদিন আকাশ ছুঁয়ে দেখি, বাতাসকে কুচি কুচি করে কেটে দেখি, টেবিলে সাজিয়ে রাখি। সেসময় ষোল বছরের অশান্ত সে, আমার সাথে থাকে, কেনো থাকে এমন প্রশ্নের উত্তর সে জানে না, কতোদিন তাড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি, সে প্রভুভক্ত কুত্তার মতো আমার পাশে থেকেছে অথচ আমি তার প্রভূ ছিলাম এরকম কথা মনে পড়ে না। সে ক্রমান্বয়ে আমাকে ডাকতে শুরু করে অমুক দাদা কিংবা অমুক ভাই বলে এবং তারা কয়েকজন বুঝতে পারে এই অমুক আর কিছুই না, সে অন্য অমুকের ভাববাহী পশু যাকে খাঁটি বাংলায় বলে গাধা। এই গাধারাই একদিন মানুষ হয় এবং মানুষগুলো মিছিলে চলে আর একদিন গুলি খেয়ে মরে যায়; মরার পর পচে যায় এবং পচে গিয়ে বদলায়।

কিন্তু জীবিতকালে তারা সামান্যই বদলায়, ষাঁড়ের মতো ভোঁশ ভোঁশ আওয়াজ তুলে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে। এমনি এক বাঁকে আমি তাকে পেয়েছিলাম সেও আমাকে পেয়েছিলো, আমরা দুঃজন পরস্পরকে আবিষ্কার করেছিলাম এবং এই আবিষ্কারে আপনার আমার কারো হাত ছিলো না, শুধু দু’টো হাত পাশাপাশি ছিলো। আমরা বুঝেছিলাম আমরা কোথায় যাচ্ছি, আমরা জেনেছিলাম আমরা কোথায় যায়নি, আমরা কোথায় যাবো না, আমরা কেনো যাবো না; এবং বুঝেছিলাম বলেই আমরা যাইনি। তদুপরি একদিন আমার অনিচ্ছায় ও তার ইচ্ছায় আমরা দু’জন নদী দেখতে গিয়েছিলাম; ঢেউ এবং নৌকার পালে হাওয়া দেখেছিলাম।

অনেকক্ষণ চুপচাপ প্রকৃতি দেখার পর সে বলেছিলো, এখানে এতোকিছু দেখা যায়, তোমাকে নিয়ে আমি অনেক কিছু দেখবো: সমূদ্র তীর, চা বাগান, সুপারি বন, বাবলা বন, জোনাকীর আলো ইত্যাদি। অনেক বড় তালিকা সে আমার কানকে শুনিয়েছিলো; আমি মনযোগ দিতে পারিনি। আমার আশা ছিলো আমি তাকে দেখাতে পারবো ধান ক্ষেত, শিবলিঙ্গ, বেহুলার বাসরঘর, বাঁশের বাঁশি, দুর্বা গজানো হাড়, টাঙ্গনের জল, কালো চোখে সুরমা, কিন্তু আমি তাকে কিছুই দেখাতে পারিনি, তাকে খাওয়াতে পারিনি তাজা ভাপাপিঠা, তাকে পড়াতে পারিনি বিবি রাসেলের তাঁতের শাড়ি, শোনাতে পারিনি গ্রামীণ ফোনের রাতের আলাপ।

তাই সে একদিন জেনে ফেললো, আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি আরো কত কিছু, শব্দময় দুপুরে লোকাল ট্রেনের হুইসেল, ভ্যানে চড়ে পুরোনো ভাঙ্গা বাড়ি দেখতে যাওয়া, হাজার লোকের জনসভায় পেছন ফিরে হাজার হাজার মাথা দেখা এবং ভালোবাসি তাকে, কী সহজে আমার কথা সে জেনে যায়, অথচ নির্বাক বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে, আমাকে নৈঃশব্দের জালে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে, ক্ষণে ক্ষণে হাসে কথা বলে, হঠাৎ উধাও হয়ে যায়, মাসখানেক পর আবার উদয় হয়, পরিচিতের ন্যায় কথা বলে, বন্ধুত্ব গাঢ় হয়, হঠাৎ কোনোদিন বন্ধুত্বের সুতোয় টান পড়ে, সেও আমায় ছেড়ে লতার মতো অন্য কারো দিকে কোনো অসুখী সময়ে হেলে পড়ে। দুটো একটি অভিমানী প্রশ্ন করি, কোনোটির উত্তর দেয়, কোনোটিতে কৌতুক বোধ করে, কোনোটির ক্ষেত্রে বুঝিয়ে দেয় কী প্রয়োজন জীবনকে এতো জটিল করে ভাবার। আমার অস্বস্তি কাটে না, আমি ডুবে যেতে থাকি শব্দের ঘোলা জলে, আমি হারিয়ে যেতে থাকি নিরর্থক দৈনন্দিন অবোধগম্যতায়, আমি ছুঁড়ে ফেলতে চাই আমার রক্ত, জিহ্বা, হৃদপিন্ড। আমি ক্ষয়ে যেতে চাই, তার সাথে নিশ্চুপ থাকি একটানা পাঁচ-সাত দিন, পৃথিবীর পথ হতে সরে যাই এবং পারি না অন্ধকারে কবুতরের খোপে শতিনিদ্রা যেতে; আবার আড়মোড়া ভেঙ্গে উঠি — তার ডাক শুনতে পাই ‘আমাকে নিয়ে চলো’। আমি বুঝতে পারি না কোথায় যেতে হবে? তদুপরি নিঃসংশয়ে জানিয়ে দিই, ‘আমি আছি আজীবন পাশাপাশি’। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতেই বুঝতে পারি সব শব্দই হারিয়ে গেছে বাতাসে, সব সম্পর্কই পুড়ে গেছে আগুনে।

প্রথম যেদিন সে আমার নজরে আসে সেদিন দেখি সে অবিরত হাসতে জানে, সে প্রথম একটি ব্যাপার বুঝেছিলো যে সেদিন হতে তার পাশে সুন্দর সুন্দর ছেলেরা এসে বসতে পারে এবং তাদের প্রত্যেকের একটা করে জিনিস আছে — এ কথা মনে পড়া মাত্রই সে হাসতে শুরু করতো সেই হাসিতে আমি ভেসে গিয়েছিলাম, সেই হাসিতে আমি মনে মনে হাজার বার সাঁতার কেটেছি, ডুব দিয়ে মুক্তো কুড়িয়ে এনেছি এবং হৃদয়ের বুক পকেটে জমা রেখেছি।

আমি বুঝতে পারিনি হাসির কি মানে; আমি তাকে, তার বান্ধবীদের আরো অনেক কিছু বুঝিনি যেমন, স্মৃতিকাতরতা, অর্থহীন শব্দ তৈরি, এক হাতে অন্য হাত রাখা, অন্য কারো হাত ধরে টানাটানি; আমি বুঝতে পারিনি গলার মালা ও গলার ফাঁসের পার্থক্য তবে সেবার বুঝেছিলাম কীভাবে সোনালী আঁশ আমাদের গলার ফাঁস হয়েছিলো এবং সেবারই আমি ও সে প্রথম মিছিল দেখেছিলাম; জ্বালা ও উপজ্বালায় অভিযোগ ভরা গোলযোগপূর্ণ মিছিল, রাজহাঁসের গানের মিছিলে ভাগ্য গণনাকারী টিয়াপাখিদের দুর্ভাগ্যের মিছিল, কচি ফুল পচে যাওয়ার মিছিল এবং নিজের মাথা অন্যের দখলে চলে যাওয়ার মিছিল।

সেই সব টালমাটাল দিনগুলোতে আমরা এক দুর্ভাগা বুড়োর কাছে হাত দেখিয়েছিলাম এবং সে আমাদের ইয়ে করে ইয়ে হবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলো যাতে আমি ভয় পেয়ে যাই এবং মাঝে মাঝে আবার ইয়ে করার সাধ জাগে, বুঝতে পারি অপরপাড় সাড়া দেবে কিন্তু আমি তখন অথর্ব, বেকার ও নিরুপায়। তদুপরি একদিন বুকে সাহস করে তাকে বলেই ফেলি সেই কথাটি এবং তার পরদিন থেকেই আমাদের উড়ুউডু ভাব বেড়ে যায়; আমরা উড়তে থাকি, আমাদের দেখাদেখি আরো ক’জন দুঃসাহসী হয়ে উঠে, তারাও প্রচলিত প্রজাপতির পাখায় ভর করে উড়তে শুরু করে এবং পৃথিবীতে স্বর্গ রচনার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে, মাগার সেখানে প্রস্তরের অভাবে কাজ করা হয় না। আমি এরপর ভাবতে থাকি আমরা পরস্পরকে কিভাবে মেরে ফেলবো, আমাদের হাড় রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাটির নিচে প্রস্তরে পরিনত হবে কিভাবে? আমিও হব প্রস্তরফলক। কিছু শব্দ খোঁড়া হবে আমার গায়ে এবং সেই শব্দগুলো নড়ে-চড়ে বসবে সবার বুকের উপর। সেখানে কোন আপেক্ষিকতা বা মতের অমিল থাকবে না, সবকিছু নিরেট সত্য ও জাজল্যমান, কেউ মাথা দুদিকে নাড়াবে না, সবাই আমরা একাত্মা, এক জমানার পালের পথিক।

শুধু আমার সাথে যে থাকে, আপনারা যার নাম এখনো শোনেননি এবং কোনদিন শুনবেনও না, হয়তো সেই অজানা নারী ধরা যাক তার নাম অপরিচিতা। সেই নারী আমাকে অর্থাৎ আরক্তিম সেতুকে শুনিয়েছিল আমাদের নামে পৃথিবীতে মহত্তম বাগান তৈরি করে দিতে চাই। এজন্য আসো আমরা বর্তমান জঙ্গলকে কেটে ফেলি, উপড়ে ফেলি, ছিঁড়ে ফেলি শিকল এবং আমরা বুঝলাম কিছুক্ষণ পর সে আরো অনেকের মতো গুলি খেয়ে মরে যাবে। একদিন সে খুব ক্ষুধার্ত ছিলো। আমরা তাকে চিনতাম। আপনিও তাকে চেনেন। তুইও তাকে চিনিস। সব কুত্তার বাচ্চার সব শালারাই তাকে চেনে। সে তারই পড়শি ছিল। আপনি তারই পড়শি ছিলেন এবং একই কারনে আপনারা একদিন তার সাথে একই মিছিলে হেঁটেছিলেন পারস্যে, গ্রীসে, ভারতবর্ষে এবং দেখেছিলেন আপনার পড়শি কিভাবে ব্যর্থ হয়ে যায়, কেন আমার বান্ধবীটি মা না হয়েই মারা যায়, কেন আপনি আপনার হাতটা অন্ধকারে প্রবেশ করান এবং কেন আপনার হাত মিলে গিয়েছিল আপনার সেই বাম হাতে এবং সেদিন হতেই সকলেই বুঝতে পারে কেন হাতগুলো উপরে উঠে এবং নিচে নামে। পরদিন থেকে আমরা শুধু বকবক শুনি ‘চাঁদ-কাস্তে-হাতুড়ি-বাঁশি-পাটের শীষ-লাঙল-নাও’ সবই একই বস্তুতে তৈরি; অন্যান্য জিনিসের মতো হৃদয় তাই হতে উৎপন্ন যা প্রচারণার জন্য নয় অথচ আমাদের ক্ষেত্রে প্রচারিত হতে বেশি সময় লাগেনি এবং একদিন অন্ধকারে তাকে যখন আমরা ক’জন নির্ধারিত জায়গায় ঘাড়ে করে ফেলে দিয়ে এলাম তখনও আমার খারাপ লাগেনি কারন আমরা জানতাম প্রচারণা ও জনমত পরস্পর নির্ভরশীল হলেও আমরা দু’জন স্বতন্ত্র ছিলাম এবং স্বতন্ত্র পথ ছিল না বলেই একই পথে এসেছিলাম অথচ সে কি সহজে আমাদের ঘাড়ে চড়ে শেষবার হেঁটে গেলো শুন্যের পথে এবং আমি কিছুদিন মনমরা থাকলেও পুনরায় খুশি হতে বেশি সময় লাগেনি কারন নতুন কেউ তার জায়গায় এসে যাবে।

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: গল্পটির রচনার স্থান গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। গল্পটি ছাপা আকারে প্রথম অধ্যাপক শফিকুল কাদির সম্পাদিত ছোটকাগজ অর্ঘ্য এপ্রিল ২০০৮ সংখ্যার ১৫-১৭ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে হুবহু প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!