আমাদের দেশের চলচ্চিত্র জগতে ‘চুম্বনের’ ব্যাপারটা একটি বিরাট প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। এই বিষয়ে নানান ধরনের আলােড়ন-আলােচনা ইত্যাদি চলেছে। যারাই এই প্রসঙ্গটা উত্থাপন করেছে তাদের বিরুদ্ধে যেভাবে একদল বিশেষ ধরনের চিত্রনির্মাতা দল বেঁধেছে, সেভাবেই দেশের নৈতিক চরিত্রের অভিভাবকরাও আমাদের সমাজকে কলুষমুক্ত এবং বিশুদ্ধ করতে গিয়ে কোমর বেঁধে লেগেছে।
এই প্রসঙ্গ অবতারণা করার উদ্দেশ্য হলো এই যে এইসব লেখালেখি এবং চেঁচামেচির মধ্য দিয়ে আমাদের সাধারণ সমাজের নৈতিক অন্তঃসারশূন্যতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। সেইসঙ্গে কর্দমতা এবং উত্তেজক রসেরও আমদানি হয়েছে তলে তলে। নীতির দোহাই দেয় যারা তাদের চোখের সামনেই দেখতে পাই কুৎসিততম কদর্য দৃশ্যাবলী-জড়িত চলচ্চিত্র সেন্সর বাের্ডের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষক্রিয়া ছড়াচ্ছে।
আসল কথা হল, যতটাই গােপনীয়তা রক্ষার চেষ্টা হয়, যতটাই ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়, এই বিষক্রিয়া ততটাই প্রকট হয়ে উঠে। পৃথিবীতে এমন বহু দেশ আছে যেখানে সেন্সরের কাঁচির কোনাে বালাই নেই। সেইসব দেশে যা-ইচ্ছে নির্বিবাদে দেখানাে হয়। স্বাভাবিকভাবেই নগ্ন নারীমুর্তির বিভিন্ন রূপ মুখ্য ধর্ম হিসেবে সেইসব দেশের চিত্রনির্মাতারা প্রাথমিক স্তরে গ্রহণ করে নিয়েছিল। লক্ষণীয় এই যে এইসব চিত্রনির্মাতাদের কাছে নগ্ন পুরুষ দেহ কোনাে দিন পণ্য হিসেবে বিবেচিত হয় নি। এই রীতি অনুসরণ করে তারা কী পেয়েছে?
উদাহরণ স্বরূপ ধরা যাক, সুইডেনের কথা। সুইডেনে সেন্সর শাসনের কোনাে নামগন্ধ নেই। প্রথমে তারা নগ্ন নারীদেহ প্রদর্শনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু হিসেব করে দেখা যায় যে ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের লােকরাই এইসব ছবি দেখতে ভালােবাসে। তথাকথিত যুবকদেরকে এইসব ছবি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হল না। এ থেকে দুটো জিনিস প্রমাণিত হয়ে গেল। প্রথমত, যে নবীন তরুণ সমাজের নৈতিক শক্তি অটুট রাখার জন্য আমাদের অভিভাবকরা উঠে পড়ে লেগেছিল সেই নবীন তরুণ সমাজের চরিত্রের মধ্যে এমন একটি বিল্ট ইন মেকানিজম আছে যা তাদের এই ধরনের যৌন উত্তেজক ছবি থেকে দূরে রাখে। আর যারা অর্থ উপার্জনের জন্যে এই ধরনের ছবি নির্মাণের শক্তি ক্ষয় করে তাদের তা বিফলে যায়। কারণ চলচ্চিত্র দর্শকদের মধ্যে নবীনদেরই ভিড় বেশি। অবশ্য দু-একদিন ভিড় হয়তাে হবে, কিন্তু সেটা সাময়িক, কেননা যৌন বিষয়ক ব্যাপারটা আর নিষিদ্ধ রইল না। তখন অন্য কিছুর জন্যে মানুষের মন উন্মুখ হয়ে পড়ে।
এই রীতি গ্রহণ করার ফলে হয়তাে সাময়িকভাবে একটি বিকৃতিই দেখা দেবে। কিন্তু মুখখামুখি দাঁড়িয়ে প্রত্যক্ষ করলে তা বর্তমানের কদর্য বিকৃতি থেকে অনেক কমই হবে। কিছু শর্তাধীন এ-ধরনের উদারনীতির ফলে, আমার ধারণা ভবিষ্যৎ ফলাফল বােধ হয় ভালাে হবে।
কিন্তু বিচার্য বিষয় হল : কোনটা শ্লীল, কোনটা অশ্লীল, সেই বিষয়ে বিচার করা এবং বিচার করে একটি স্বচ্ছ ধারণায় উপনীত হওয়া।
পৃথিবীতে কোনাে জিনিস স্থান-কাল-পাত্র নিরপেক্ষ হতে পারে না। সব জিনিসেরই একটা বাতাবরণ আছে। দেশে দেশে যুগে যুগে শ্লীলতার ধারণা বিভিন্ন আকার ধারণ করেছে। যে দেশে খাজুরাহাে কোনারকের ফ্রিজগুলাে মন্দিরের রূপ বৃদ্ধি করেছে সে দেশে মাত্র চুম্বনের প্রসঙ্গেই ঝড় উঠেছে।
শ্লীলতার প্রশ্নের সঙ্গে সৌন্দর্যবােধের প্রশ্ন জড়িত একদিক থেকে।
দেখতে গেলে যা সৎ, যা মানুষের অগ্রগতির সহায়ক এবং বা যা জীবনীশক্তি স্ফুরণে আকাশী- সেটাই হচ্ছে শ্লীল। চুম্বন, নগ্ন নারীদেহের প্রদর্শনী অথবা সংগমরত নারী পুরুষের দৃশ্য সংবলিত ছবি দেখানাের চেয়েও অনেক বেশি অশ্লীল হচ্ছে যেখানে আংশিক আব্রু রেখে বিকৃত মনের কুৎসিত প্রকাশের আভাস দেওয়া হয়। শিল্পে, বিশেষ করে চিত্রশিল্পে এই শেষােক্ত দলের মানুষের ভিড় বড়াে বেশি।
শ্লীলতা আর অশ্লীলতাকে স্কেল দিয়ে মাপা যায় না। প্রকৃতপক্ষে এই ধরনের ঘটনাকে ধরাটা বুদ্ধিমান এবং সংবেদনশীল দর্শকের পক্ষে মােটেই জটিল নয়। পয়সা কামানাের জন্যে বা নিজের অবরুদ্ধ যৌন কামনার প্রকাশের ইচ্ছেয় যখন একজন শিল্পী নিজেকে পরিচালিত করে, তখনই ধরা পড়ে যায়।
প্রকৃতপক্ষে, অশ্লীল হচ্ছে সেটাই যা মিথ্যের আশ্রয় গ্রহণ করে। শিল্পের প্রেরণায় জন্মগ্রহণ না করে যখন অশিল্পী-সুলভ কোনাে প্রেরণার বশবর্তী হয়ে সৃষ্টি পরিচালিত হয় তখন অশ্লীলতা ঘটে।
সেইহেতু আমার কাছে অশ্লীলতার প্রশ্নটা ব্যাপক। যা যৌন-সম্পর্কিত হবে সেটাই অশ্লীল হবে-তার কোনাে অর্থ নেই। জীবনের অন্যান্য দিকগুলােকেও যখন বিকৃতভাবে দেখানোর প্রয়াস হয় তখন সেটা আমার কাছে অশ্লীল হয়ে ওঠে।
আমি অশ্লীলতাকে ঘৃণা করি।
আরো পড়ুন
- আমাদের দৃষ্টিতে বাস্তববাদী ধারা
- নগ্নতা এবং চলচ্চিত্র
- চলচ্চিত্রের স্বরূপ কী?
- ‘কোমল গান্ধার’ প্রসঙ্গে
- দুই বাংলায় আমার দেখা মানুষ
- শিল্প ও সততা
- ডকুমেন্টারি ফিল্ম
- ছবিতে বাংলাদেশ
- শিল্প, ছবি ও ভবিষ্যৎ
- ছবিতে ডায়লেকটিকস
- চলচ্চিত্র সাহিত্য ও আমার ছবি
- আমার কথা
- চার্লি চ্যাপলিন ফ্যাসিবাদ ও পুঁজিবাদবিরোধি এক মহান চলচ্চিত্রকার
- সুবর্ণরেখা বাঙালির অস্তিত্বের লড়ায়: অতীত, বর্তমান ও ভবিষৎতের প্রতিচ্ছবি
- যুক্তি তক্কো আর গপ্পো: ঋত্বিক সমাজের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক ফুটিয়ে তুলেছেন
- বাড়ি থেকে পালিয়ে: কলকাতার ভঙ্গুর অর্থনীতি ও উদ্বাস্তুর করুণ চিত্রের প্রতিফলন
- নাগরিক: যুদ্ধোত্তর ও বাংলাভাগ পরবর্তী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মধ্যবিত্তের জীবন চিত্র
- তিতাস একটি নদীর নাম: সামন্তীয় চিন্তার ভাঙ্গন, নগরায়ন ও অন্যান্য
- কোমল গান্ধার চলচ্চিত্র দুই বাংলার সাংকৃতিক মেলবন্ধনের আকুতি
- মেঘে ঢাকা তারা: কলকাতার অর্থনীতি ও উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি
- অযান্ত্রিক চলচ্চিত্র মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে দ্বান্দিক সম্পর্কের প্রকাশ
টিকা:
১. ঋত্বিক ঘটক রচিত বর্তমান লেখাটি তাঁর চলচ্চিত্র মানুষ এবং আরো কিছু, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা; পুনর্মুদ্রণ নভেম্বর ২০১৫; পৃষ্ঠা ২০১-২০৩ থেকে সংকলিত। এর আগে লেখাটি ২৮ অক্টোবর ২০২০ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে হুবহু প্রকাশ করা হলো।

ঋত্বিক ঘটক (জন্ম: ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ – মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুবার বহুভাবে উচ্চারিত। তিনি পরিচালনা করেছেন নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্র।