সড়ক

মাঝখানে রাস্তা, দু-পাশে ফুটপাথ। রাস্তার কালো পীচের মসৃণ সুডৌল পিঠ, তার ওপর ঝলসাচ্ছে সূর্যের আলো। গাছের পাতায় ছায়ারা জাফরি কেটেছে সারা পথময়। বেলা দুপুর। ভাঙা বাড়িগুলোর সামনে ফুটপাথের কোল ঘেঁষে দু-পাশেই দুটো বড় বড় কৃষ্ণচূড়া গাছ। প্রকাণ্ড গাছ দুটো দু-ধার থেকে এসে পরম স্নেহের আলিঙ্গনে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরেছে, বিশাল একটা তোরণ তৈরি হয়েছে। আগুনের ছোপ-ধরা, কচি পাতার চোখজুড়ানো সবুজে ভরা তোরণটা হাওয়ার ইশারায় নাচে। তারি সঙ্গে ছন্দ জাগছে সারা পথের আলো-আঁধারির জাফরিতে। সর্ সর্ সর্ সর্ করে ভারী মিষ্টি একটা শব্দ হয়।—সহনশীল পিঠ পেতে রাজপথ পড়ে আছে চুপ করে। 

ওপাশের ফুটে কালি-লাগা, ধসে-পড়া, হা-হা করা ফাঁকা বাড়ি-দোকানঘর, ঐতিহ্য চুরমার হয়ে যাওয়া ভগ্নস্তূপ সব। অপরিচিত একটা বস্তি ছিল ওখানে। রাস্তাটা একদম ফাঁকা, মাঝে মাঝে শুধু অস্ফুট শব্দ শোনা যায় কাদের। ঐ নিঃস্বতার পটভূমিতে থেকে থেকে মানুষের মৃদু কণ্ঠস্বর পাতলা হাওয়ায় ছোট হয়ে কানে এসে লাগে। 

আজ যখন হঠাৎ দুপুরে ছুটি মিলে গেল, তখন কেন যে আমরা দুজনা এইখানে ফুটের ধারে এসে বসলাম, কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার বন্ধু একেবারে চুপ হয়ে পাশে বসে আছে। আমি যখন বললাম—“ঐ বস্তিরই একটা ঘরে থাকত আমাদের পরমপ্রিয় ইসরাইল, এতদূর যখন এলাম তখন চল দেখে আসি তার অবস্থাখানা এখন কী” —ও ভয়ানক চটে উঠল। আমি বলে অত্যন্ত বাজে বকি। 

আমি বুঝি। আমার বন্ধুকে আমি জানি। ঐ নরম মনের জন্যেই তার মাথায় চেপে এসেছে দুঃখের ভার। সীমান্ত পার হয়ে যারা দলে দলে চলে এসে আমাদের শহর আর তার আশপাশ ছেয়ে ফেলেছে, তাদের চোখের জলে আবার যে আমাদের দেশ চাপা আগ্নেয়গিরি হয়ে উঠছে, একথা তাকে কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না। আমাদেরই চোখের সামনে আমরা যে দেখছি এ এক আগুন-ফসলের বীজধান বোনা চলেছে, একথা বললেই ও চটে যায়। 

ওখালি দুঃখই দেখে, আমার এই বন্ধু। 

আজ নিয়ে এল এই পথের ধারে। ইসরাইল থাকতে কতদিন এসেছি। তার ছেলে এমদাদ, কী ছেলে! বাচ্চাটার ছবি আঁকার কী দুরন্ত শখই না ছিল। আর সে শখের জোগানদার ছিল আমার বন্ধু। রঙিন খড়ি কিনে এনে দিত এমদাদকে, সেই ছেলে পরম উৎসাহে দেওয়াল এবং মেঝেতে দাগ কাটত তাই দিয়ে। এই নিয়ে কতবার মার খেয়েছে ইসরাইলের হাতে তার ঠিক ঠিকানা নেই। একবার তো আমার বন্ধুর সঙ্গেই কাজিয়া বেধে গেল প্রায়, এই সব কুকর্মের উৎসাহদাতা বলে। কিন্তু হাত ছিল বটে ছেলেটির। হয়তো কত কী-ই হতে পারত, কে তোয়াক্কা রাখে! 

চেনা সেই সব মুখগুলোকে কোথাও দেখছি না। ইসরাইল তার পরিবার নিয়ে কোথায় ছিটকে চলে গেছে খোঁজ রাখি না। আজ দেখি, তাদের সবার ভেঙে যাওয়া ঘরে নতুন এক দল এসে উঠেছে। কারা যেন এদের এনে উঠিয়েছে। এদের রাগকে ভুল পথে চালিত করে সুবিধে যাদের, তারাই হবে। কিন্তু তারা জানে না, এদের পেট বড় শিক্ষক। যত জ্বলে মরবে, তত এরা জ্বলার জন্যে তৈরি হবে। 

কথাটা শুনে আমার বন্ধু একেবারে খেঁকিয়ে উঠল—“এত বাজে বক মাইরি। তোমার কথা শুনে মনে হয়, তুমি বুঝি এদের দুঃখে খুশি হয়েছ! যে তোমাকে জানে না, সে ঠিক তাই ভাববে।” 

এর উদ্ভট পাগলামির সঙ্গে তাল রেখে আর কত চলব? উঠতে যাচ্ছি একটা আশ্চর্য কাণ্ড হলো। 

ইসরাইলকে দেখলাম। দুজনেই একসঙ্গে। স্বপ্নেও ভাবি নি ওকে ঠিক আজকেই এখানে পাওয়া যাবে। ও কিন্তু অবাকই হলো না আমাদের দেখে, শুধু কাছে চলে এল। চোখের তলায় ওর কালি পড়েছে, চুলগুলো সোনালি মতো হয়ে গেছে, আর অত বড় পাট্টা জোয়ানের গাল দুটো ভেঙে তুবড়ে গেছে। বস্তির ঘরগুলোর দিকে জ্বলন্ত চোখে চেয়ে আছে। বন্ধু বলে—“কী, তুমি এখনো যাও নি?” 

ইসরাইলের নজর কিন্তু সেই ঘরগুলোর দিকে গাঁথা। সে দাঁতের ভেতর থেকে জবাব দেয়—“ঐ ঘরটায় আমি থাকতাম। বুঝলে, ষোল বরস আমার ঐ ঘরে কেটেছে।” 

আমার বন্ধু আবার বলে—“কী, যাও নি কেন?” 

“এবার যাব। ভেবেছিলাম কোথায় যাব, সে দেশে কাউকে চিনি না। পার্ক সার্কাসে গিয়েছিলাম। কিন্তু এবার যাব।” 

ও একটা নিশ্বাস আটকে চুপ করে থাকে খানিক। আমরা দুজনেই নীরব। মাথার ওপর গাছের পাতার ঝালর দোলে। ওপাশে দু-একটা লোক বস্তি থেকে বেরিয়ে যায় এক আধজন ঢোকে। ওদের মুখগুলো এক একটা ইতিহাস বুঝি।… 

আবার ইসরাইল কথা বলে—“আমার বেটাকে মনে আছে তোমাদের, এমদাদকে?” 

আছে। এমদাদের সেই একগাদা চুল আর একগাদা দুষ্টুমি ভরা হাসি কী কখনও ভুলতে পারব? একবার বন্ধুর দিকে তাকাই, সে মাটির দিকে মুখ করে ধুলোতে ঝরাকাঠি দিয়ে আঁচড় কাটছে। ইসরাইল বলে—“কাল রাতে সে খতম হয়েছে। … বুঝলে, আমার বেটা এমদাদ, তোমাদের দোস্ত-কাল রাত অনেক ঘড়িতে ওলাওঠা হয়ে মারা গেছে পার্ক সার্কাসের রিফিউজি ক্যাম্পে।” 

চোখের কোণগুলো অল্প লালচে, সে চেয়ে আছে আমাদের দিকে।—“কেন মরল ও বলতে পারো? পারো না।” 

কঠিন হয়ে খানিকক্ষণ সে আমাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কেঁপে কেঁপে ওঠে। মুখটা নেমে যায়। আমার বন্ধু কী রকম যেন বিব্রত হয়ে পড়ে। অস্থিরভাবে বার কয়েক নড়ে বলে—“ইয়ে, ইসরাইল, তুমি ক-দিন, মানে—” 

“খামোশ্।” ইসরাইল গর্জে ওঠে—“ওসব নাকি কান্নায় আমায় ভোলাতে পারবে না। কী ভেবেছ তোমরা আমাকে? জানো, আমি কে?” 

বড় বড় চোখ করে খানিক আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে সে এক ঝটকায় ঘুরে যায়। দৃঢ়ভাবে কয় ধাপ এগিয়ে তারপর হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে আবার। আমি কাছে গেলাম। পেছন থেকে বললাম—“তোমার খাওয়া হয়েছে? সারাদিন খেয়েছ কিছু?” 

ধুলোবালি লাগা সোনালি চুল সমেত মাথাটা ঝাঁকায় সে। 

আবার বলি—“খাবে?” 

ও ঘুরল। টল্টল করছে চোখে জল! —“আমার মাথার মধ্যেটা কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে ওস্তাদ।” 

গায়ে হাত দিলাম। হাতটাকে নামিয়ে ওর মুঠোর মধ্যে নিল। দু-বার চাপ দিল। তারপর আমার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সলজ্জ একটু হাসল। বৃষ্টিতে ধোয়া আকাশের মতো হাসি। 

মোড়ের হালুইকরের দোকানে বসে তিনজন খেয়ে নিলাম। যন্ত্রের মতো ইসরাইল খেয়ে যাচ্ছে, একটা কথাও না বলে। আমার বন্ধু বারবার খাবারের গ্রাস হাতে করে ওকে দেখছে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। খাওয়া শেষে ইসরাইল যখন হাত ধুতে উঠল, সন্ত্রস্ত হয়ে আমার বন্ধু চেয়ারটা সরিয়ে ওর যাবার জায়গা করে দেয়। মেঝেতে চেয়ারের পায়া ঘষার একটা বিশ্রী শব্দ হয়। ইসরাইল উঠে দাঁড়ায়। আমাদের দুজনের দিকে অদ্ভুতভাবে দেখে। ঠোঁটটা অতি অল্প ফাঁক হয়ে যায়। “দোস্ত!”

আমার বন্ধু যেন নিজের মনেই খুশি হয়ে ওঠে। চোখ দিয়ে ইসরাইলকে একবার আদর করে নেয়।… আমরা পয়সা দিয়ে বেরিয়ে এলাম। 

সেই ফুটপাথ আর গাছের তোরণ। ঝাঁ-ঝাঁ দুপুরে গাছের পাতায় দোলানি একেবারে নেই। ভ্যাপসা গরম। আকাশ তামাটে, সূক্ষ্ম ধোঁয়ার আবরণে যেন পোড়া আকাশটা ঢাকা। 

কে একজন লোক ওধারে থামের ওপর কাত হয়ে শুয়ে আছে, তার পেছনটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা এধারে এসে বসার আগেই সে নির্লিপ্ত বেসুরো গলায় গেয়ে উঠল— 

“মনপবনের নাওরে, মনপবনের নাও,
রাঙ্গাবরণ কন্যা যেথায় সেই দেশেতে যাও॥”

সুর শুনলেই আমার বন্ধুর মেজাজটা ভালো হয়ে যায়। আনন্দিত মনে বলে উঠল—“বাঙালদের এইটেই আমার ভালো লাগে। এত সুন্দর গান করে।” 

ইসরাইল আবর কেমন গুম হয়ে গিয়েছিল। বস্তির ঘরগুলোর দিকে তেমনি করে বারবার চাইছিল। এবার বলে বসে, —“দেখ বাবু, সত্যি কথা বলি। ঐ শালা আমার ঘর ছিল। ঐ ঘরে এতদিন কেটেছে। আজ কে এসে আমার সেই ঘরটাকে বেদখল করে বসে আছে। আচ্ছা বলত, রাগ হবে না আমার? মনে হবে না শালাদের শেষ করে ফেলি? … কিন্তু জানি, এখানে বিচার নেই। তাই পাকিস্তানে যাব। এই ঘর, এই রাস্তা, এই তোমরা, আর এই সব, ছেড়ে যেতে শিনা দুখাবে না? দুখাবে। কিন্তু ঘর আমার চাই। তাই যাই।” 

আমার বন্ধু জিজ্ঞাসা করে—“কে আছেরে ওঘরে এখন?” 

“কী জানি! তবে যেই থাক, তাকে ছিড়ে দু-টুকরো করতে, পারলে তবে শান্তি। সে আমার দুশমন। গোটা দেশটাই দুশমন।” 

আমার বন্ধু হঠাৎ বিজ্ঞের মতো। বলে—“কে যে দুশমন, সেইটেই তো কথা—“ওদের গম্ভীর কথার ফাঁকে ফাঁকে অল্প বেসুরো গানটা টানা-টানা সুরে কান্নার মতো ভেসে আসছিল, আমার বন্ধু কথা থামিয়ে চুপ করে শোনে। ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে—“সত্যি, গানগুলো ভালো। মনটা উদাস মেরে যায় শুনলে।” 

ইসরাইল হাঁটুতে চাপড় দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কোন কথা না বলেই কয় পা হেঁটে চলে যায়। ঘুরে আমরা তাকিয়ে আছি দেখে দাঁড়ায়। নিজের মনেই যেন কোন প্রশ্নের উত্তর দেয়— “না, এমদাদ। তসবির খিঁচতে খুব দড় ছিল। মহা দড়। তো, সব ভেঙেচুরে নিয়ে গেছে, কিন্তু, দেওয়াল থেকে তার দস্তখত নিয়ে যেতে পারে নি। মাটির দেওয়ালে আঁকা তার নানীজানের ছবিটি। আর সেইবার যে মার দিয়েছিলাম আর একটা এঁকেছিল বলে, একটা রেলের গাড়ি এঁকেছিল, লাল আর সবুজ আর হলুদ খড়ি দিয়ে।… তোমার তো ভারী দোস্ত ছিল।” 

একটু হাঁ করে ও আমাদের দিকে চেয়ে আছে। চোখের কোলে সলজ্জ হাসির আভাস। আমার বন্ধু একটু একটু করে বলে—“এমদাদ ভালো ছবি আঁকত।” 

ইসরাইলের মুখের ভাবটা ধীরে বদলে যায়। অন্যমনস্কভাবে শুধু চোখের মণি ঘুরিয়ে আমার বন্ধুর দিকে দেখে। তারপর তাকায় আবার বস্তিটার দিকে। ওর চোখের মধ্যে স্বপ্ন-স্বপ্ন ভাবনার ছায়া নেমে আসে। আমাদের অস্তিত্ব যেন ও ভুলে গেছে, ধীরে ঘুরে চলে গেল। 

গাইয়ে লোকটা ওধারে গাছের ছায়ায় সটান শুয়ে পড়েছে, আর গান করছে না। সূর্য চলে এসেছে পশ্চিমে, বেলা গড়িয়ে দুপুর উৎরে যাচ্ছে।… আমি বললাম—“সে তো হলো। কিন্তু এলাম কেন এখানে, বসেই বা আছি কেন, কিছুই বুঝছি না।” 

আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে বন্ধু, তারপর উবু হয়ে বসে অল্প দুলতে দুলতে মাটিতে নখ দিয়ে নকশা কাটে। লেখে—“ইসরাইল”-ল-এর পর দাঁড়িটা জোরে কেটে নখ তুলে নেয়। তারপর বলে—“অনেক দিন পরে ইসরাইলকে দেখতে ভারী ইচ্ছে করছিল। তার পাড়াটা অন্তত। কতদিন এদিকে আসি নি বলত? নানান ধান্দায় ওর কথা একবারও মনে হয় নি।” 

আমার বিশ্রী লাগতে থাকে। এভাবে বসে সারা দুপুরটা কাটানোর কোনো মানেই পাচ্ছি না। মাথা ধরে যাবে ভ্যাপসা গরমে। হঠাৎ আমার বন্ধু আবার বলে—“একটা কথা ওস্তাদ।”

“বল।” 

“ওর বেটা এমদাদকে তোমার কেমন লাগত?” 

“ভোলা যায় না। একদিন একটা বড় আকিয়ে হত।” 

“হত, না?” আমার বন্ধু প্রশ্নভরা চোখে আমার দিকে তাকায়—“হত না। … ওকে বিড়ি বাঁধতে হতো। কিংবা ঐরকমই একটা কিছু।” 

….“আচ্ছা ওস্তাদ!” ঘাড়টা একটু হেলিয়ে ভুরু কুঁচকে আকাশের দিকে তাকায় ও। 

“কী? বল।” 

“এমদাদ তো মরে গেল! কফিনের মধ্যে করে ওকে কবরচাপা দেবে। একেবারে শেষ হয়ে গেল ছেলেটা। আর কিছু বাকি নেই ওর, না?” 

চুপ করে চেয়ে থাকি ওর দিকে। ও আবার বলে—“আর ও খড়ি চাইবে না আমার কাছে। কারো কাছে কিছু চাইবে না। ওর চাহিদা ফুরিয়ে গেছে। আচ্ছা, সবারই তো ফুরোবে। আমারও। কোনো একদিন।” 

“হ্যাঁ, তাতে কী?” জিজ্ঞাসা করি ওর দিকে চেয়ে। 

“না।… আমি ঐ গাইয়েটার কথা ভাবছিলাম। ঐ যে গান করছিল এখানে বসে, শুয়ে আছে। ওর তো একটা চেনা পাড়া ছিল তো। সেখানকার লোক আর ওর গান শুনবে না। এমন একটা দিন আসবে, যেদিন কেউ শুনবে না। ওর গানের কথার চাহিদাও চুকে যাবে।” 

কী বলতে চায় ও, কিছুই বুঝতে পারি না। ও কিন্তু নিজের মনে বলে চলে—“তার মানে মরলেই সব চাহিদা ঢুকে যায়। পেটের, মাথার, সব কিছুর। আচ্ছা, এই কথাটা যদি বলি, কেমন হয় ভেবে দেখতো—চাহিদা মেটানোর ভার যাদের, তারা যদি মেটাতে না চায়, তবে তারা কী চাইবে? মরি, এই চাইবে। সবাই মিলে, সব ছবি আর সব গান নিয়ে মরে যাই। বালাই থাকবে না। কী বল।”

আমার বন্ধুর যুক্তিজাল খুব দামী সুতোয় গাঁথা, আমার তা মনে হলো না। চুপ করে চেয়ে রইলাম। ও বলল—“আজ তো সবাই মরছি, মরবই। তার মানে, কেউ চাইছে আমরা মরি। কারা? যারা চাহিদা মেটাবে। কেমন কিনা। এই কথাটা-আরে!” 

চমকে তাকালাম ওর কথা শুনে। আকাশটাকে দেখছে ও দাঁড়িয়ে উঠে—আমিও চাইলাম। পশ্চিমের এক কোণে অল্প অল্প কালো মেঘ চুপচাপ হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে। নজর তার সূক্ষ্ম ধোঁয়ায় ভরা তামাটে সারা আকাশের দিকে। থেকে থেকে তার পাঁজর ঘেঁষে সাদা হয়ে উঠছে, বাজের আলো। দূর থেকে চাপা গমগমে আওয়াজ ভেসে আসছে, লাফ দিয়ে পড়ার আগেরকার বাঘের ডাকের মতো। ঐ দিকে তাকিয়েই আমার যেন চোখ জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। স্নিগ্ধ বৃষ্টির নিশানা আসছে।.. 

আমার বন্ধু গুম হয়ে খানিক চেয়ে থাকে সেদিকে, ওকে যেন হতাশায় ছেয়ে ফেলেছে। আমার মনটা কেমন দমে আসে ওর ভাবসাব দেখে। হঠাৎ আমার বাহু ধরে হ্যাঁচকা টান মারে। চোখ দুটো চকচক করছে চাপা উত্তেজনায়।—“ওস্তাদ।” 

“কী”? 

ষড়যন্ত্র করার ভঙ্গিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, তারপর বলে—“এমদাদের হাতের কাজগুলো দেখবে? চল।” আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই আমাকে টেনে নিয়ে চলল। 

সেই চেনা বস্তির ঘর। গলিটা একদম ফাঁকা। মোড় ঘুরতেই অল্প গলার আওয়াজ পেলাম। তাকালাম। আমার বন্ধুর অবাক চোখ বড় বড় হয়ে আসে। আমরা আর এগোই না। 

ওরা আমাদের দেখতে পায় নি। ইসরাইল আর একটা বুড়ি। বুড়িই বটে, পাকা আমের কুঁচকে যাওয়া পরিপূর্ণতা ওর বলিরেখাঙ্কিত মুখে। চোখদুটোতে আমি বুঝি হঠাৎ অনেকখানি বড় পদ্মা নদী আর উধাও হু-হু বাতাসের আভাস পেলাম। ছেঁড়া নোংরা শাড়ির প্রান্ত দিয়ে বারবার নাক মোছে, এয়োতির লক্ষণ লাল পাড় শাড়ি! কপালেও আবছা সিঁদুরের দাগ। 

ইসরাইলের সেই ঘর। এমদাদের হাতের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে যার দেওয়ালে। ইসরাইল তার নিজেরই ঘরটা ঝাঁট দিয়ে ধুলোগুলো একটা কাগজে জমা করছে এখন, আর বুড়ি চৌকাঠের গায়ে পা দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

ইসরাইল বলে—“তোমার তোরঙ্গ-প্যাটরা সবই তো গুছিয়ে দিলাম বুড়ি, ঘরও সাফা করে দিলাম। তো ঘরে ঢোক এবার, আর বসে কেন ?” 

বুড়ি আমতা আমতা করে বলে—“না, উগার যা কইরলা বাবা, তা ত। মাজাটা ভাঙা। কাজ করনের শক্তি নাই। এই আমিই কিন্তু আছিলাম এককালে, সাতখান গাঁয়ে সাফল্ল্যার জগত বামনীর নাম করতে চিনত। তোমারগা পূজায় বল, পাব্বনে বল, ব্যাপারের বাড়িত বল, এই আমি। লোকে কইত জগত বামনী দশভুজা। তা—” 

ইসরাইল চট করে বলে ওঠে—“তা তোমার ঘরটা তো এক রকম হলো, এবার আমি যাই।”

বুড়ি ওর দিকে কেমন করে যেন তাকায়, তারপর হেসে ফেলে মাথা নামায়—“কী হইয়া গেছি অভাবের তাড়নে।” মুখ তোলে—“খাওয়াইবা কইলা না বাপ, ক্ষুধা যে বড়।” 

“ও-হ্যাঁ।” ইসরাইল লজ্জিত হয়ে পড়ে—“মানে, আমার কাছে আর পয়সা নেই।—তা, যাবে আমার সঙ্গে বাইরে? আমার বন্ধুরা বসে আছে রাস্তায়, ওদের কাছ থেকে পয়সা নিতে হবে।” 

“চল। না খাইলে আর পারি না। চাউল নাই, পয়সা নাই। লাতিটা বারাইছে, ঘুরতেছে কিসের ব্যাভ্রমে। গান পাগলা ছাওয়াল।”

বুড়ি উঠে আসে। ইসরাইল দরজা বন্ধ করছিল, বারণ করে। 

—“ও আউজাইয়া আর কী হইব? ব্যাঙের আধুলি। কীইবা আছে আর।” 

দরজা বন্ধ করে শিকল তুলে দিতে গিয়ে দরজার পাল্লার ওপর বিবর্ণ কয়টা দাগ দেখেছিল ইসরাইল। তাদের ওপর দিয়ে আলগোছে আঙুলের ডগাগুলো বোলায়, কবে খড়ি দিয়ে একটা মানুষ আকার চেষ্টা হয়েছিল। ও ঘোরে—“তাহলেও তোমার ঘরটা তো খুলে রেখে যাওয়া যায় না।” অদ্ভুত ওর চোখদুটোর ভাব, আমি এতদূর থেকেও দেখতে পেলাম। 

বুড়ির মুখ বেঁকে আসে—“ম্যাগো, কী আমার ঘর! —তোমারে তো কইছিই বাবা, এই ঘর আমার পছন্দ না। কেমুন বা বেশ পদ্মনকশা করা দরজাখান আছিল, কেমুন বা আঙ্গনাখান, মানে, বোঝাই কেমনে আমার ঘরের বেত্তান্ত, আর বোবোই বা কেডা—” 

“আচ্ছা, আচ্ছা চল।” ইসরাইল সন্তর্পণে ওকে ধরে নিয়ে এগোয়। বুড়ি এক পা গিয়েই মুখ উঁচু করে তাকায় ওর দিকে। “বাবা, তোমারে দেইখা আমার বা কার জানি কথা মনে জাগে। কে জানি ধইরত ঠিক এমনি কইরাই। কে—”

“বেশ, বেশ, চল এখন।” তাড়া লাগায় ইসরাইল। বুড়িটার দিকে আর যেন ও তাকাতে পারছে না। কিন্তু সামনে তাকাতেই আমাদের দুজনের সঙ্গে ওর মুখোমুখি হয়ে গেল। 

লজ্জায় মুহূর্তের মধ্যে অতবড় জোয়ানটা কুঁকড়ে কতটুকু হয়ে যায়। বুড়ির কাঁধ থেকে ওর হাত অজান্তে সরে যেতেই সেও তাকায় আমাদের দিকে, তারপর সভয়ে তার চওড়া বুকের কাছ ঘেঁষে যায়। শঙ্কাভরা চোখ তুলে তাকায়। ইসরাইল অভয় দেয়—“আমার বন্ধু ওরা।—ইয়ে, কীবে, এখানে?” 

আমার বন্ধু এগিয়ে গিয়ে বলল—“ওর কাছে পয়সা আছে, নাও।” 

ইসরাইল আমার দিকে এগিয়ে আসে। আমার বন্ধু ভালো করে দেখে ফিক করে হেসে দিল। বুড়িরও ফোক্কা মুখে একগাল হাসি জাগে। ভ্যাপ্সা গরম হতাশার মধ্যে যেন এক ঝলক হাওয়া ঝিলিক দিয়ে গেল।… আমার বন্ধু বন্ধুত্ব পাতাতে ভারী পটু। 

রাস্তায় পড়ে ইসরাইল চাপা গলায় আমাকে বলে, আর আমার বন্ধু বুড়িকে নিয়ে একটু পেছনে আসে। “মাপ করো একটু দোস্ত। বলেছিলাম না, আমার ঘরে যে আছে তাকে ছিড়ে দু-টুকরো করতে না পারলে আমার সোয়াস্তি নেই, তখন জানতাম না এই শালী বুড়ি ওখানে আছে।” 

বড় রাস্তা দিয়ে আমরা তোরণটার কাছে এসে পড়লাম। ইসরাইল বলে—“বুড়ির এক লাতি আছে, ষোল বছরের জোয়ান লাতি। … আঠারো জনের সংসার খান খান হয়ে গেছে। কতক মরেছে, কতক কোথায় পালিয়েছে কেউ খোঁজ রাখে না। খালি এই দুটো এখানে এসে ঠেকেছে। … এখানে এরা কিন্তু থাকতে চায় না, পদ্মার কিনারে কোথায় ঘর, সেইটে—” 

কথা থামিয়ে ও ঘুরে তাকায়। ওর চোখে দরদ এত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে ভারী সুন্দর লাগছে ওকে দেখতে। দুনিয়ার যত রূপ ওর মুখে চোখে ছড়িয়ে পড়েছে। ও ভালোবেসেছে। 

দূর থেকে মৃদু স্বর শুনে তাকিয়ে দেখি সেই গাইয়ে লোকটি শুয়ে শুয়েই গানটা আবার ধরেছে—“ও মনপবনের নাও …” 

আমার বন্ধু বুড়িকে নিয়ে পৌঁছে গেল, ভারী বন্ধুত্ব হয়ে গেছে তাদের। সে প্রশ্ন করে—“কোথায় বাড়ি তোমার মাগো ?” 

“আরে বাপরে, ইসে, সেইডাই প্রশ্ন। প্রশ্ন তো সেইখানে। কনে বাড়ি মোর, কইবার পার? … পার না। গোলকধাঁধার বাবা ধাঁধা ইডা। ই হলো স্যান্—” 

কথা অসম্পূর্ণ রেখেই বুড়ি ফিক্ ফিক্ করে হাসে। অপর চোখটা কুঁচকে একটু বলে—“পদ্মা নদীর বিলাতিপানার ঘর কনে? কোহান্ লিয়ে যায় সেখানে?”

ইসরাইল আর আমার বন্ধু একবার চোখাচোখি করে। তারপর ইসরাইল বলে—“তোমার লাতি করে কী?” 

“গান।” বুড়ি চোখ বোজে। “বড় ভালো। কত গান গাইত কত্ত গান … শুইন্‌ন্জনি? ঐ।” 

আমরা কান পাতি সবাই। তরুণ কণ্ঠে গানটা যেন এখন জীবন্ত হয়ে ওঠে। দূর থেকে ভেসে এলেও তার তেজ পরিষ্কার বোঝা যায়। সে গাইল— …

“রাঙ্গা সূর্যি উঠে সেথায় রাঙ্গায় তামান পানি, 
রাঙ্গা আকাশ তলে তাহার রাঙ্গা মরমখানি।
 —রাঙ্গা নদীর পথ ধইরা সেই মোহনায় বাও, 
ও মন পবনের নাও॥”

ঘুরে ফিরে গায়কটি গানের প্রথম কলি গাইছে, মুছে পড়ছে নতুন বুকের সরখানি জমাট প্রেম। … লাল ছটায় ভরা আকাশের তলায় রাঙিয়ে রাঙিয়ে ওঠা মহান পদ্মা নদীর সবখানি উদারতা, স্যানি বিশালতা ঐ গানের পথ বেয়ে বেয়ে আমাদের মাঝখানে চলে এল। … 

বুড়ি বলে ওঠে—“বাবা সকল, আসল কথাখাই যে বড় ভুইলতে আছ? খাবার কই?” 

“হ্যাঁ, হ্যাঁ।” ইসরাইল দম চাপে “পয়সা দাও ওস্তাদ।” 

পকেট হাতড়ে কয় আনা বের করে দিলাম। ইসরাইল চলে গেল খাবারের দোকানটার দিকে। আমার বন্ধু আর বুড়ি পাশাপাশি বসে, আমি চেয়ে চেয়ে দেখি। 

এত কথাও বলতে পারে বুড়ি, একধার থেকে বলে। আমার বন্ধু বসে বসে পা চুলকোয়, আমি শুনি। বুড়ির কথায় কথায় সেই কোন এক গাঁয়ের ছবি ফুটে ওঠে। নিজেই সৃষ্টি করে রস, নিজেই হাসে, নিজেই ছলছল চোখ করে চুপ করে থাকে। এরই এক ফাঁকে ইসরাইল শালপাতার ঠোঙায় করে-কিছু খাবার নিয়ে এল। খানিক খেয়ে বুড়ি আঁচলে বেঁধে রেখে দিল, গাইয়ে নাতির জন্যেই বোধ করি। তারপর নিশ্চিন্দি হয়ে পা ছড়িয়ে বসে পায়ে দু-হাত বুলোয়। তার নেশাটি ঠিক আছে আজও, খুঁট থেকে আলপাতা বের করে মুখে দেয়। তারপর আবার ধরে কথা। ক্লান্তি নেই, বিরক্তি নেই, বলেই চলেছে ভিটের বৃত্তান্ত। আর ওর নাতিটির বোধ হয় পদ্মা নদীর গান গাইতে সমান উৎসাহ। 

… সেই কতদূর, আমরা সে সব দেশে যাই নি, ওর ভিটেটা ছিল। যেখানে রোজ সাঁঝ-বাতি জ্বালত সেই লেপা আঙ্গিনায় তুলসীতলা ছিল। আর সবার ওপরে ছিল এক চালতা গাছ। চালতা গাছের কথা বলতে বলতে বুড়ি প্রায় পাগল হয়ে উঠল। বাড়ির এক কোণে বাঁশঝাড়ের ধারে, যেখানে গেলেই সোঁদা-সোঁদা পচা পাতার গন্ধ নাকে এসে ঠেকত, চাঁদনী রাতের নিশিতে পাওয়া আধার যেখানে পুঞ্জ পুঞ্জ হয়ে জমে থাকত, আম-জাম-কাঁঠালের ছায়া দিয়ে ঘেরা জায়গাটুকু, সেইখানেই ছিল তার কত সাধের চালতা গাছ। আহা, কী চালতা গাছখানের। … এখন হয়তো কত চালতা সেখানে ধরে আছে, দিনমান ঝুলে থাকে, কেউ দেখারও নেই, কেউ শোনারও নেই। মাঝরাতে নিশাচর পাখিরা হয়তো ডানা ঝাপটায় সেখানে বসে, আর ঝুপঝাপ করে চালতা পড়ে। নিথর রাতের সেই শব্দ আমি পরিষ্কার অনুভব করলাম। এখন চালতাগুলো হয়, আর পড়ে। হয়, আর ঝরে ঝরে পড়ে। কলকাতায় চালতার কত দাম! 

হঠাৎ বুড়ি আকাশের দিকে চায়। বিকালের পড়ন্ত রোদের আকাশ প্রায় ঢেকে এনেছে কালো কালো আকারহীন মেঘ। সীমানাগুলো তার মোটেই পরিষ্কার তীক্ষ্ণ নয়, কেমন যেন মিলিয়ে যাওয়া। বিশাল সেনা বাহিনীর মতো মেঘের পর মেঘ এগিয়ে আসছে। যুদ্ধের বাজনা বাজছে সারা আকাশময়। সারা আকাশময় বিদ্যুৎ খেলে বেড়াচ্ছে এখানে সেখানে, বিজলির আলোয় মেঘের কোলকে জ্বালিয়ে তুলে। 

বুড়ি গালে হাত দেয়।—“ও মা কালবোশেখি যে ঘনঘটা কইরা আইল। ও বাবা, দে নারে আমারে ঘরে তুইলা। দে বাবা!”

ইসরাইল ওঠে; ওর হাত ধরে যায় খানিক দূর, তারপরে ঘরে বুঁদ হয়ে বসে থাকা বন্ধুর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যায়। থমকায়। আবার ঘুরে বুড়িকে নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল।—বুড়ির নাতির গানটা টেনে টেনে চলতেই থাকে।

আমি বললাম—“ওঠো। ঝড়বৃষ্টি এসে গেল, আর বসে কী হবে?” 

“উ” — অন্যমনস্ক ভাবে ও তাকায়—“নাঃ। চল।” 

উঠে দাঁড়াল আমার বন্ধু। বজ্রমুঠিতে আমার হাত চেপে ধরল। উত্তেজিত গলায় বলল—“ব্যস। ঠিক আছে। এক কাজ করি। আমার যত বন্ধু আছে সবার বাড়িতে বাড়িতে যাই। তা হবে কম না আমার বন্ধু। বুঝলে, সবাইকে এককাট্টা করে ফেলি এই সবের মধ্যে দিয়েই ও চিন্তিত হয়ে পড়ে—“মানে, এই সব কিছুর মধ্যে দিয়ে হদিশটা বেরিয়ে যাবে। যাবেই।—ঠিক দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু পথ হয়তো আছে।”

নিজের মনেই যেন ও ওজন খুঁজে পায় না নিজের কথার। দু-বার মাথা চুলকে নেয়। 

তারপর আবার বলে—“মাথায় শালা পোকা বের হয়ে গেল ভেবে ভেবে। কিন্তু সব চাহিদা মেটানোর একটা রাস্তা—নাঃ ওস্তাদ, কী জানি।” 

মনমরা হয়ে গেল ও। আমি কিন্তু খুশি হয়ে উঠেছি। রাজ্যের হাওয়া এতক্ষণ কোথায় বসে পরামর্শ করছিল, এবার ছুটে এসে আমাদের চুমু খেয়ে গেছে। একরাশ জোলো হাওয়া।—

গানটির সুর তখনও ঘুরে ফিরে বাজছে। দু-পাশের ইতিহাসে ভরা ফুটপাথ ছেড়ে আমরা রাস্তার সুডৌল পিঠে এসে দাঁড়ালাম। তেতে আগুন হয়ে আছে রাস্তা। গাছের তোরণের আওতা ছেড়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। দিনের আলো নিষ্প্রভ হয়ে গেছে আকাশের নিচু হয়ে আসা মেঘের ঘোমটার তলে। চাপা একটা জ্যোতিতে যেন ভরে গেছে আশপাশ। খুব ভালো করে মাজা কাঁসার বাসনের গায়ের চাকচিক্চক্যের মত চাপা জ্যোতি। 

তারপর বৃষ্টি নামল। 

ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। সে আওয়াজের তলায় কোথায় তলিয়ে গেল একলা তরুণ কণ্ঠের গান, অনুভব করলাম হাজার কণ্ঠে কারা যেন গানটা ধরে নিয়েছে। … 

আমার বন্ধুর ঘামে-গরমে হাঁপিয়ে ওঠা শরীরের ওপর বৃষ্টি পড়তেই ও ভারী খুশি হয়ে উঠল। হঠাৎ নাক চোখ মুখ বেয়ে জল গড়াতে থাকে, ও তলের ঠোঁটটা একটু এগিয়ে দিয়ে শব্দ করে মুখে জল টেনে নিতে থাকল। আকাশে বাজনা জোর হয়ে উঠল, মাটিতে বাজনা তার দোঁহার হল। ও পেছনে দেখে, বলে—“দেখ, দেখ!” 

কী দেখব? ঘুরলাম। কৃষ্ণচূড়া গাছের তোরণ পাতায় পাতায় নেচে উঠছে, ফুলে ফুলে নেচে উঠছে। বৃষ্টির সাদা পর্দার আড়ালে কত মানুষের কত দুঃখ বীরত্ব হয়ে উঠছে। 

আমার বন্ধু মহানন্দে মাথার ওপর হাত চালিয়ে চুলগুলোকে লেপ্টে সামনে করে দিল। খানিকটা জল চুঁইয়ে পড়ে গেল। ও বলল—“দেখছ না? … শুনছ না? রাস্তায় কান পাতো।” 

ও নিজেই হাঁটু গেড়ে বসে রাস্তায় কান পাতল। মুখ বেঁকিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল—“দেখ, মনে হচ্ছে কত মানুষ কঠিন পায়ে হেঁটে আসছে, হাসছ? কান পাতো, নিজে কান পাতো। বড় বাজে বক তুমি।” 

বৃষ্টির মোটা মোটা ছাঁট মসৃণ রাজপথের উপর পড়ে ছিটকে যাচ্ছে। তাদেরই সঙ্গী হয়ে আমি মাটিতে কান পাতলাম।

গুম্ গুম্ গুম্ গুম্, গুম্ গুম্ গুম্ গুম, গুম্ গুম্ 

একতালে এগোচ্ছে কত মানুষ৷৷ 

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: গল্পটি ছাপা হয়নতুন সাহিত্য পত্রিকার প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, জ্যৈাষ্ঠ ১৩৫৭ সময়ে। এখানে ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট প্রকাশিত ঋত্বিক ঘটকের গল্প সংগ্রহ, ৪ নভেম্বর ১৯৮৭, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১১১-১২১ থেকে নেয়া হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!