পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি: সলিল-হেমন্ত জুটির এক অমর সৃষ্টি

বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে ‘পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি’ গানটি একটি কালজয়ী সৃষ্টি। কিংবদন্তি সংগীতকার সলিল চৌধুরীর অনবদ্য কথা ও সুরে গানটি এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। ১৯৫৮ সালে ‘অপরাজিত’ চলচ্চিত্রের ব্যাপক সাফল্যের পর, সলিল চৌধুরীর নিরীক্ষাধর্মী সংগীত যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, ঠিক তখনই গানটি একক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

এই অবিস্মরণীয় গানে কণ্ঠ দিয়েছেন প্রখ্যাত গায়ক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সলিল চৌধুরীর জটিল সুরবিন্যাস আর হেমন্তের ভরাট কণ্ঠের জাদুকরী মিশ্রণ গানটিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। মূলত এক গন্তব্যহীন যাত্রার আনন্দ এবং ভবঘুরে মানসিকতা গানটির মূল উপজীব্য, যা আজও শ্রোতাদের মনে এক গভীর রোমান্টিক এবং উদাসীন আবহের সৃষ্টি করে।

সাংস্কৃতিক গুরুত্বের বিচারে ‘পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি’ গানটি আজও সর্বজনীন এবং চিরসবুজ। এটি কেবল একটি সাধারণ সংগীত নয়, বরং ঘরছাড়া মানুষের বাউন্ডুলেপনা ও মুক্তিপিয়াসী মনের এক প্রতীকী সুর। দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও এই গানের জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। বরং বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীরা বারবার গানটি নতুন আঙ্গিকে গেয়ে সলিল চৌধুরীর অমর সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চলেছেন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া সর্বকালের সেরা বাংলা গানগুলোর তালিকা করলে এই গানটি সবসময় প্রথম সারিতেই থাকবে। অজানাকে জানার কৌতূহল এবং গন্তব্যহীন পথ চলার যে অনাবিল আনন্দ এখানে ফুটে উঠেছে, তা প্রতিটি সংগীতপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

🎥 হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানটি শুনুন

গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ

গানটির সংগীত কাঠামো মূলত সলিল চৌধুরীর নিজস্ব ধারার এক সার্থক প্রতিফলন, যেখানে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের ‘হারমোনি’ এবং ভারতীয় রাগপ্রধান সংগীতের এক অনন্য মেলবন্ধন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে বাঁশি এবং স্ট্রিং সেকশনের সুনিপুণ ব্যবহার গানটিকে এক চমৎকার সিনেমাটিক বা চলচ্চিত্রের আবহ দান করেছে।

গানের কথাগুলো শুনতে সহজ মনে হলেও এর দার্শনিক গভীরতা অত্যন্ত ব্যাপক। এখানে ‘পথ হারানো’ মানে কেবল উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং গতানুগতিক জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার এক তীব্র ব্যাকুলতা। সলিল চৌধুরী এই গানে প্রচলিত সুরের কাঠামো ভেঙে ছন্দ ও তালের যে বৈচিত্র্য দেখিয়েছেন, তা তৎকালীন বাংলা গানের ধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। নিচে এর কাব্যিক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

১. চেনা পথের মায়া বনাম অচেনার ডাক

গানের শুরুতে কবি বলছেন, তিনি পথ হারাবার উদ্দেশ্যেই পথে নেমেছেন। এর অর্থ হলো— চেনা পথ বা গৎবাঁধা জীবন আমাদের অভ্যাসের জালে বন্দি করে ফেলে। এই ‘চেনা পথের ধাঁধা’ থেকে মুক্তি পেতে তিনি অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়িয়েছেন। এটি আসলে আধ্যাত্মিক সাধনার সেই স্তর, যেখানে মানুষ পুরনো সব পরিচয় মুছে নিজেকে নতুন করে চিনতে চায়।

২. নিষেধের আগল ভাঙা

“নিষেধের পাহারাতে ছিলেম রেখে ঢেকে”—এখানে সামাজিক বিধি-নিষেধ বা মনের জড়তার কথা বলা হয়েছে। কবি অনুধাবন করেছেন যে, যার ভয়ে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলেন, সেই ‘নিষেধ’ আসলে তাঁর অন্তরাত্মাকেই ডাক দিচ্ছিল। ভয় কাটিয়ে সেই অজানার আহ্বানে সাড়া দেওয়াই এখন তাঁর লক্ষ্য।

৩. দৃষ্টির অন্তর্মুখিতা

“এই নয়নে পাবো বলেই নয়ন মেদেছি” লাইনটি অত্যন্ত গভীর। বাইরের চোখের দেখা প্রায়ই বিভ্রান্তিকর হয়। তাই বাইরের চোখ বন্ধ করে (নয়ন মেদে) কবি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে পরম সত্তাকে বা নিজের প্রকৃত রূপকে অনুভব করতে চাইছেন। পাওয়ার তীব্র বাসনা যখন অশ্রু হয়ে ঝরে যায়, তখনই অন্তরের চোখ খোলে।

৪. হারানো সুরের সন্ধান

গানের শেষে কবি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য (Paradox) ব্যবহার করেছেন— “সুর হারাবো বলেই সেতার সুরে বেঁধেছি”।

  • সাধারণত আমরা সুর বাঁধি গান গাওয়ার জন্য।
  • কিন্তু এখানে কবি বলতে চাইছেন, যান্ত্রিক বা ব্যাকরণগত সুরের ঊর্ধ্বে যে ‘অনাহত নাদ’ বা নৈশব্দের সুর আছে, তাকে ধরার জন্য তিনি সেতার বাঁধছেন।
  • বাইরের সুর যখন হারিয়ে যায় বা থেমে যায়, তখনই হৃদয়ের গভীরে অসীমের সুর বেজে ওঠে।

গানের কথা

পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি।
চেনা-পথের ধাঁধায় আমি অনেক ধেঁধেছি।।

নিষেধের পাহারাতে ছিলেম রেখে ঢেকে
সে কখন গেছে ফিরে আমায় ডেকে ডেকে।

নয়ন মেলে পাবার আশায় অনেক কেঁদেছি
এই নয়নে পাবো বলেই নয়ন মেদেছি।।

চেনা-শোনা-জানার মাঝে কিছুই চিনি নি যে
অচেনায় হারায়ে তাই আবার খুঁজি নিজে

সে যে গান শুনিয়েছিল হয়নি সেদিন শোনা
সে গানের পরশ লেগে হৃদয় হল সোনা।

রাগের ঘাটে ঘাটে তারে মিছেই সেধেছি
সুর হারাবো বলেই সেতার সুরে বেঁধেছি।

🏁 উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ‘পথ হারাবো বলেই এবার পথে নেমেছি’ গানটি কেবল সুর আর বাণীর সমষ্টি নয়, এটি এক পরম স্বাধীনতার অনুভূতি। সলিল চৌধুরীর আধুনিক সুরচেতনা এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দরাজ কণ্ঠের এই মহামিলন বাংলা গানের ইতিহাসে এক ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। বর্তমানের দ্রুতগতির জীবনেও গানটি আমাদের শেখায় গন্তব্যের চেয়ে পথের আনন্দ অনেক বেশি মূল্যবান। সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে এই গানটি চিরকাল তারুণ্য ও বাউন্ডুলেপনার এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বেঁচে থাকবে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ৪২১-৪২২ পৃষ্ঠা এবং সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১৫৬ থেকে।

Leave a Comment