ইউরোপের স্নায়ুযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন

স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা যুদ্ধ বা ঠান্ডা লড়াই বা শীতল যুদ্ধ (ইংরেজি: Cold war) হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর প্রায় দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে চালিত এক অঘোষিত ব্যঙ্গ যুদ্ধ (ইংরেজি: Mock-war)। এই স্নায়ুযুদ্ধ নামটিও সাম্রাজ্যবাদী বুদ্ধিজীবীদের প্রদত্ত এবং তারাই জনপ্রিয় করে। সত্যবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাপদ্ধতিতে এটি একটি বহুল আলোচিত বিষয়।

স্নায়ুযুদ্ধটিকে আমরা বলছি ব্যঙ্গ যুদ্ধ বা ভেংচির যুদ্ধ কারণ এই দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে সেই সময় সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাত ঘটেনি। সোভিয়েতের ইউনিয়নের মহান নেতা জোসেফ স্তালিনের মৃত্যুর পরে রাশিয়া সংশোধনবাদী-পুঁজিবাদী পথ গ্রহণ করলে মূলত সারবস্তুতে দুদেশ একই আদর্শের অনুসারী হয়ে যাওয়ায় দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধের কোনো বাস্তব সম্ভাবনাও ছিলো না।[১]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রণাঙ্গনে কোন যুদ্ধ না হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ আরেকটি যুদ্ধ ঘটার আশঙ্কায় তটস্থ ছিল পুরাে বিশ্বের মানুষ। এক অর্থে তখনকার তৎকালীন বিশ্ব দুটি পরাশক্তি সােভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রায় দুভাগ হয়ে গিয়েছিল।[২] গোড়ার দিকে এই লড়াই মূলত দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও কালক্রমে এটি পর্যবসিত হয় পুঁজিবাদ বনাম সমাজতান্ত্রিক শক্তিজোটের এক দীর্ঘ, অঘোষিত যুদ্ধে।

গোড়া থেকেই এই ধারণাটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলো সকল রকমের স্বাধীনতার শত্রু ও সাম্রাজ্যবাদী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে পূর্ব ইউরোপ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় সাম্যবাদ বা কমিউনিজম অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং সাম্রাজ্যবাদ কথিত এই লাল আতঙ্ক বা ‘লাল জুজু’কে রুখে দেওয়ার জন্য তৎপর ও উদ্যোগী হয় গোটা দুনিয়ার জনগণের শত্রু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যানের নির্দেশে চালিত কমিউনিজমের গতি রোধ করার এই নীতি ইতিহাসে ‘ট্রুম্যান নীতি’ নামে পরিচিত এবং এভাবেই সূত্রপাত হয় ঠাণ্ডা যুদ্ধের।[৩]

দুই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ও ইতালী, এই ৪টি ইউরোপীয় দেশ দ্বারাই মুলতঃ বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল। তার পরে অস্ট্রিয়া ও জারশাসিত রাশিয়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলো। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পরে সোভিয়েত রাশিয়া পুঁজিবাদী জগতে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়ে, এবং নিজের নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের কাজেই বিশেষ ভাবে ব্যস্ত থাকে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিবাদী শক্তিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অসাধারণ ভূমিকার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুদ্ধোত্তর বিশ্ব রাজনীতিতে এক অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। পূর্ব ইউরোপের দেশগলিতে সমাজতন্ত্র প্রসারিত হওয়ার ফলে এবং পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলির অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েতের গুরুত্ব অনেকখানি বৃদ্ধি পায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমকক্ষ কোনো দেশ ইউরোপে আর ছিলো না। সেই অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতিতে সোভিয়েতের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা দেয়। এই দুই শক্তির মধ্যে প্রবল প্রতিযোগিতা আরম্ভ হয়, এবং সেই প্রতিযোগিতাই ঠাণ্ডা লড়াই বা cold war নামে পরিচিত। এই ঠাণ্ডা লড়াই-ই হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল শক্তি।[৪]

১৯৪৭ সালে মার্কিন কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে মার্কিন ধনকুবের ও রাষ্ট্রপতির এক পরামর্শদাতা, বারনার্ড বারুচ প্রথম ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ কথাটি ব্যবহার করেন। ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে সফল হয় এবং এর ফলে একদিকে যেমন দুই বৃহৎ শক্তি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় সামরিক ভারসাম্য, অপরদিকে শুরু হয় কমিউনিজমের প্রসার ও কমিউনিজমকে রোখার এক দীর্ঘস্থায়ী অঘোষিত যুদ্ধ, যা ১৯৪৯ সালে চিন বিপ্লবের পর আরো এক নতুন মাত্রা অর্জন করে। এই যুদ্ধ তীব্রতম আকার ধারণ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এবং নব্বই দশকের প্রারম্ভে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান হয়।[৫]

কার্যকরভাবে ঠাণ্ডা যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৪৮ সালে, যখন পশ্চিম ইউরোপে কমিউনিজমকে রোখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মার্শাল প্লানের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত পশ্চিমি দেশগুলিকে মার্কিন অর্থ সাহায্য প্রদান করে যুদ্ধোত্তর ইউরোপীয় অর্থনীতিতে তার নিয়ন্ত্রণকে কায়েম করে। এই বিপুল আর্থিক সাহায্যের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো পশ্চিম ইউরোপের ভেঙে যাওয়া পুঁজিবাদী অর্থনীতির দ্রুত পুনর্গঠন, যাতে বিধ্বস্ত আর্থিক অবস্থার সুযোগ নিয়ে এই সব দেশে কমিউনিজম মাথা চাড়া না দিতে পারে। এক বছর পরে ১৯৪৯ সালে গঠিত হয় কমিউনিজমের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপের প্রধান কয়েকটি দেশকে নিয়ে ন্যাটো বা উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা নামের সামরিক জোট। শুধুমাত্র ইউরোপে নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে সচেষ্ট হয় লাতিন আমেরিকা ও মধ্য আমেরিকার দেশগুলিতেও কমিউনিজমের অগ্রগতিকে রোখার জন্য যে কোনো ধরনের গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী সরকারকে উচ্ছেদ করতে। এইভাবে ১৯৫৪ সালে গুয়াতেমালায়, ১৯৬৫ সালে কিউবার বিপ্লবের পরে ডমিনিকান রিপাবলিকে ও ১৯৭৩ সালে চিলিতে প্রগতিশীল সরকারকে কখনো সরাসরি সাময়িক হস্তক্ষেপ ঘটিয়ে কিংবা পরোক্ষভাবে সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনকে মদত যুগিয়ে উচ্ছেদ করা হয়।

১৯৫৫ সালে ‘ন্যাটো’র জবাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিকে নিয়ে গড়ে তোলা হয় ওয়ারশ চুক্তির নামে পালটা সাময়িক জোট। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে এবং ১৯৬৮ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ায় প্রত্যক্ষভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপে নতুন শক্তিজোটকে ভেঙে দেওয়া হয় এই যুক্তিতে যে সমাজতন্ত্রের গণতন্ত্রীকরণের নামে নতুন যে কোনো শক্তির উত্থান আসলে কমিউনিজমের বিরুদ্ধে মার্কিন মদতপুষ্ট সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। এই যুক্তিকে সামনে রেখেই ১৯৬৮ সালে চেকোশ্লোভাকিয়ায় ওয়ারশ জোটের সাময়িক হস্তক্ষেপের পরে ঘোষিত হয় ব্রেজনেভ নীতি, যার মর্মার্থ হলো যে পূর্ব ইউরোপের যে কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত সমাজতন্ত্র বিপন্ন হলে সেই দেশকে পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত করার অধিকার ওয়ারশ জোটভুক্ত দেশগুলির থাকবে। এইভাবে ইউরোপের দেশগুলিকে কেন্দ্র করে ঠাণ্ডা যুদ্ধ তীব্র হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে অবশ্যই যুক্ত হয় সংস্কৃতি ও মতাদর্শগত স্তরে দুই বৃহৎ শক্তির পারস্পরিক আক্রমণ ও বিদ্বেষ। ঠাণ্ডা যুদ্ধ কোনো সময়েই প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘর্ষের রূপ নেয়নি, তবে ১৯৬২ সালে কিউবাতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাঁটি প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রায় সরাসরি সংঘাতের মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে মিখাইল গর্বাচভের নেতৃত্বে যে সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, তার পরিণতিতেই শেষ পর্যন্ত ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান ঘটে। ১৯৮৯ সালে ওয়ারশ জোটভুক্ত দেশগুলির পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের এক সম্মেলন থেকে প্রথম ঘোষণা করা হয় যে এই দেশগুলি তাদের নিজেদের ভবিষ্যত স্থির করে নেওয়ার পক্ষে কোনো বাধার সম্মুখীন হবে না। ১৯৯০ সালে ঘটে দুই জার্মানির পুনর্মিলন। ২১শে নভেম্বর ১৯৯০ সালের পরেই ইউরোপের ৩৪টি দেশ প্যারিস সম্মেলনে ঘোষণা করে যে ইউরোপের দীর্ঘদিনের সংঘর্ষের পরিসমাপ্তি ঘটল। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে ওয়ারশ জোটের ও ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঠাণ্ডা যুদ্ধের অবসান হয়।

ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মহাদেশটির রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আয়তনে যেমন বিশালতা রয়েছে, তেমনি ভ্যাটিকান সিটি বা সান মারিনোর মতো বেশ কিছু রাষ্ট্র অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকৃতির। এসব দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা ঐতিহাসিকভাবে সবসময় অভিন্ন ছিল না। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় ৬০ শতাংশেরও বেশি অঞ্চল, বিশেষ করে মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউরোপীয় অংশের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিদ্যমান আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করার লক্ষ্যে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর একচেটিয়া অর্থনৈতিক চক্র এক নতুন সমন্বিত ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ করে। মূলত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংহতি বা সমাবন্ধনই ছিল এই উদ্যোগের মূল ভিত্তি। এই প্রচেষ্টারই অন্যতম সার্থক রূপ হলো ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইউরোপীয় অর্থনৈতিক গোষ্ঠী’ (European Economic Community) বা তৎকালীন ‘সাধারণ বাজার’। শুরুতে এই গোষ্ঠীতে ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ—এই ছয়টি প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরবর্তী দশকগুলোতে এই সাধারণ বাজারের পরিধি আরও বিস্তৃত হয় এবং এতে ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড ও গ্রিস পর্যায়ক্রমে যোগদান করে। এর ফলে একদিকে যেমন ইউরোপীয় অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত মজবুত ও সুসংহত হয়, তেমনি অন্যদিকে এটি কৌশলগত ও আক্রমণাত্মক ‘ন্যাটো’ (NATO) জোটের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত করতে সহায়তা করে। তবে এই অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সমান্তরালে সাধারণ বাজারভুক্ত প্রভাবশালী দেশগুলো, বিশেষ করে ইংল্যান্ড, পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যেকার অভ্যন্তরীণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতাও মাঝেমধ্যে বেশ তীব্রতর ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যা মহাদেশীয় রাজনীতিতে এক পরাধীনতার মাত্রা যোগ করে।

তৎকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এবং জাতিসমূহের নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে, সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ইউরোপে একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করত। মৈত্রী, নিবিড় সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তিতে গঠিত ‘ওয়ারশ চুক্তি’ (Warsaw Pact) ভুক্ত দেশগুলো সেই সময় থেকেই প্রতিপক্ষ ‘ন্যাটো’ (NATO) জোটের সঙ্গে একটি কার্যকর ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ সম্পাদনের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিকভাবে ইউরোপসহ সমগ্র বিশ্বে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার এই দূরদর্শী নীতিটি তৎকালীন সকল প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি এবং বৃহত্তর সাধারণ জনমানসে ব্যাপক সমর্থন ও সমাদর লাভ করেছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর এই উদ্যোগটি সেসময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, যা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতো।

১৯৭৫ সালে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের মিত্রশক্তিগুলোর বিশেষ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও সহযোগিতা’ বিষয়ক এক ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনে সারা ইউরোপের রাষ্ট্রসমূহ একত্রিত হয়েছিল। এই অধিবেশনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ফলাফলগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘শক্তি প্রয়োগের নীতি’ এবং তৎকালীন উত্তপ্ত ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ বা কোল্ড ওয়ার-এর তীব্র নিন্দা জানানো হয়। এই যুগান্তকারী অধিবেশনের প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে ইউরোপীয় মহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি রক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুদৃঢ়করণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। পাশাপাশি অর্থনীতি, বিজ্ঞান, আধুনিক প্রযুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোতে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মৈত্রী প্রসারের ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব ও উজ্জ্বল সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে, যা বর্তমানেও মহাদেশীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।[৬]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ৯ জুন, ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, ঢাকা; “স্নায়ুযুদ্ধ বা ঠাণ্ডা লড়াই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন চালিত ব্যঙ্গ যুদ্ধ”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/politics/cold-war/
২. সালিম মো. আদনান আরিফ, (Jan. 2019). আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস [Pdf]. (মুস্তাফিজ সানজিদা, & কর্মকার সুমা. Ed.). পৃষ্ঠা ৯৬; Retrieved from http://www.ebookbou.edu.bd/wp/OS/hsc4_2.php#hsc2855
৩. শোভনলাল দত্তগুপ্ত, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা  ১৯৩-১৯৪।
৪. গৌরীপদ ভট্টাচার্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা, পঞ্চম সংস্করণ ডিসেম্বর ১৯৯১, পৃষ্ঠা ২৩৫।
৫. শোভনলাল দত্তগুপ্ত, পূর্বোক্ত।
৬. কনস্তানতিন স্পিদচেঙ্কো, অনুবাদ: দ্বিজেন শর্মা: বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূগোল, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, বাংলা অনুবাদ ১৯৮২, পৃ: ১৮-২০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!