প্রাচীন এথেন্সের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিচার বিভাগ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। এই ব্যবস্থার মূলে ছিলেন ডাইকাস্ট (গ্রিক: δικαστής, বহুবচনে: δικασταί) বা বিশেষ বিচারকবৃন্দ। ডাইকাস্ট ছিল প্রাচীন এথেন্স নগর-রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদের নাম। একে আধুনিক জুরি ব্যবস্থা বা বিচারক পদের সমতুল্য মনে করা যায়। প্রতি বছর এথেন্সের পূর্ণ নাগরিকদের মধ্য থেকে (যাঁরা দাস নন কিংবা ঋণের দায়ে নাগরিকত্ব হারাননি) লটারির বা নির্বাচনের মাধ্যমে ৬,০০০ বিচারকের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হতো। এই ডাইকাস্টগণ রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন ও বিধানের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন এবং বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনার বিচারকার্য পরিচালনা করতেন।
ডাইকাস্ট নির্বাচনের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়া
সাধারণ নাগরিকদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে বিচারকার্য পরিচালনার এই পদ্ধতিটি অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক ইংরেজ বা আমেরিকান ‘জুরি’ ব্যবস্থার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এই প্রতিনিধিরা জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নিরপেক্ষতা ও সততার সাথে দায়িত্ব পালনের শপথ নিতেন। তবে কাঠামোগত এই মিল থাকলেও, প্রাচীন এথেন্সের ‘অ্যাটিক ডিকাস্টেরিয়ন’ (আদালত) এবং আধুনিক জুরি ব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ছিল ব্যাপক।
এথেন্সে ডাইকাস্ট হওয়ার প্রধান শর্ত ছিল—ব্যক্তিকে অবশ্যই স্বাধীন নাগরিক হতে হবে, তার পূর্ণ ভোটাধিকার বা ‘এপিটিমিয়া’ (ἐπιτιμία) থাকতে হবে এবং বয়স হতে হবে অন্তত ত্রিশ বছর। প্রতি বছর এই যোগ্যতাসম্পন্ন নাগরিকদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে ৬,০০০ জনকে বিচারক হিসেবে নির্বাচিত করা হতো। তাদের নিয়োগের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা থাকলেও ঐতিহাসিকদের মতে, এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটি নয়জন ‘আর্খন’ (উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা) এবং তাদের সরকারি লিপিকারদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। দশজন আর্খন লটারির মাধ্যমে নিজ নিজ গোত্র বা ‘ফাইল’ থেকে ৬০০ জন করে প্রতিনিধি নির্বাচন করতেন। এভাবে নির্বাচিত ৬,০০০ জনকে পুনরায় লটারির মাধ্যমে ৫০০ জন করে মোট ১০টি বিভাগে বিভক্ত করা হতো। এছাড়া ১,০০০ জনের একটি অতিরিক্ত প্যানেল রাখা হতো, যাতে কোনো বিভাগে সদস্যের ঘাটতি দেখা দিলে সেখান থেকে তা পূরণ করা যায়।[১]
পিনাকিয়ন ও নিয়োগের সনদ
ডাইকাস্টদের দশটি বিভাগের প্রত্যেকটির জন্য গ্রিক বর্ণমালার প্রথম দশটি অক্ষরের একটিকে স্বতন্ত্র চিহ্ন হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। প্রত্যেক ডাইকাস্টকে তার নিয়োগের সনদ হিসেবে ‘পিনাকিয়ন’ (πινάκιον) নামক একটি ক্ষুদ্র ব্রোঞ্জ ফলক প্রদান করা হতো, যেখানে তার নাম এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের অক্ষরটি খোদাই করা থাকত। প্রত্নতাত্ত্বিক এডওয়ার্ড ডডওয়েল তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে পিরিয়াসে প্রাপ্ত এমন তিনটি ব্রোঞ্জ ফলকের বর্ণনা দিয়েছেন, যা এই উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হতো বলে ধারণা করা হয়।
এই ফলকগুলোতে খোদাই করা লিপিগুলো ছিল অনেকটা এরকম: Δ. ΔΙΟΔΩΡΟΣ ΦΡΕΑ, Ε. ΔΕΙΝΙΑΣ ΑΛΑΙΕΥΣ এবং Β. ΑΝΤআইΧΑΡΜΟΣ ΛΑМП। এছাড়া এই ফলকগুলোতে পেঁচা, গর্গনের মাথা এবং অ্যাটিক জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রতীকী চিহ্ন খোদাই করা থাকত। বাকি এক হাজার অতিরিক্ত বিচারকের জন্য সম্ভবত ভিন্ন কোনো প্রতীক বা চিহ্ন ব্যবহার করা হতো, তবে এ বিষয়ে ঐতিহাসিকদের কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
শপথ গ্রহণ ও ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ
ডাইকাস্ট হিসেবে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে তাদের একটি আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ করতে হতো। প্রাচীনকালে এথেন্সের উপকণ্ঠে ইলিসোস নদীর তীরে ‘আর্ডেটাস’ নামক স্থানে এই শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হতো; তবে পরবর্তী সময়ে এটি অন্য কোনো স্থানে স্থানান্তরিত হয়, যার সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায় না।
বাগ্মী ডেমোস্থেনিসের সময়কালীন তথ্যমতে, এই শপথ ছিল একজন ডাইকাস্টের যোগ্যতা ও সততার এক গম্ভীর অঙ্গীকার। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বস্তভাবে এবং যেকোনো প্রকার দুর্নীতিমুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিতেন। বিশেষ করে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের ক্ষেত্রে ডাইকাস্টদের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ ছিল; কারণ আদালতের অনুমোদন বা ‘ডোসিমাসিয়া’ (Docimasia) সম্পন্ন করা ছাড়া খুব কম লোকই রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে আসীন হতে পারতেন। এছাড়া এই শপথে বিদ্যমান সংবিধানকে সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে কেউ যদি সংবিধান উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতো, তবে ডাইকাস্টগণ বিচারিক ক্ষমতায় তাকে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত করার এখতিয়ার রাখতেন।
বিচারকার্য পরিচালনা ও শনাক্তকরণ পদ্ধতি
এটি স্পষ্ট যে, প্রতিদিনের জন্য ডাইকাস্টদের নির্দিষ্ট আদালতে নিয়োগ বা আসন বণ্টনের প্রক্রিয়াটি হাটবাজারের (অ্যাগোরা) উন্মুক্ত স্থানে সম্পন্ন হতো। সাধারণত ‘থেস্মোথেটাই’ (Thesmothetae) নামক বিচারিক কর্মকর্তারা এই দায়িত্ব পালন করতেন। তবে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ছিল—যখন কোনো ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মকর্তা তাদের মেয়াদ শেষে কাজের হিসাব দিতেন এবং দুর্নীতি বা অনৈতিক আচরণের (ইউথাইন/Euthyne) অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করতেন, তখন ‘লজিস্টাই’ (Logistae) নামক নিরীক্ষকগণ এই প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করতেন।
আসন বণ্টন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই প্রত্যেক ডাইকাস্টকে একটি করে লাঠি (Staff) দেওয়া হতো। এই লাঠির ওপর সংশ্লিষ্ট আদালতের নির্দিষ্ট অক্ষর এবং রঙ আঁকা থাকত। এটি কেবল আদালতে প্রবেশের অনুমতিপত্র বা ‘টিকিট’ হিসেবেই কাজ করত না, বরং অধিবেশন চলাকালে কোনো অননুমোদিত ব্যক্তি বা অলস কৌতূহলী জনতার ভিড় থেকে প্রকৃত বিচারকদের আলাদা করতেও ব্যবহৃত হতো।
বেতন প্রবর্তন ও রাজনৈতিক প্রভাব
প্রাথমিক পর্যায়ে ডাইকাস্টদের জন্য কোনো পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা ছিল না। তবে পেরিক্লিস (খ্রি.পূর্ব ৪৯০-৪২৯) বিচারকদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এথেন্সের এই বিচারব্যবস্থা বা আদালতকে এক অর্থে ‘জনতার আদালত’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। তবে এই ব্যবস্থা প্রায়শই সমকালীন রাজনৈতিক দলাদলি ও রেষারেষি দ্বারা প্রভাবিত হতো। নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে ডাইকাস্ট সদস্যগণ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং আবেগ দ্বারা পরিচালিত হতেন। এথেন্সের বিচারব্যবস্থার এই দুর্নীতি ও সীমাবদ্ধতাকে উপজীব্য করে গ্রিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনিস তাঁর বিখ্যাত ব্যঙ্গাত্মক নাটক ‘দ্য ওয়াসপস’ (The Wasps) বা ‘বোলতা’ রচনা করেছিলেন।[২]
আরো পড়ুন
- প্রাচীন এথেন্সের বিচারব্যবস্থা: ডাইকাস্ট ও জনতার আদালতের আদ্যোপান্ত
- স্নায়ুযুদ্ধের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ: বিশ্ব রাজনীতির এক জটিল ইতিহাস
- ইউরোপের স্নায়ুযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক ইতিহাস: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন
- ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তি: দেশগুলোর বিশাল শিল্প সাফল্য ও বৈশ্বিক প্রভাব
- মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো: প্রাচীন রোমের সর্বশ্রেষ্ঠ বাগ্মী ও প্রজাতন্ত্রের শেষ বীর
- জুলিয়াস সিজার হত্যাকাণ্ড: রোমান প্রজাতন্ত্রের পতন ও এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র
- রেনেসাঁ বা নবজাগরণ: ইউরোপীয় আধুনিকতার উদয় ও বৌদ্ধিক রূপান্তর
- মার্টিন লুথার ও প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার: সামন্তবাদী ইউরোপ থেকে আধুনিকতার উত্তরণ
- সাইপ্রাসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সমাবেশে ব্রিটিশ ও মার্কিন ঘাঁটি বন্ধের আহ্বান
- ইউরোপের ইতিহাস: গ্রিক ও রোমান ঐতিহ্য, সামন্তযুগের ধর্মবাদ ও শিল্প বিপ্লবের আখ্যান
- আধুনিকতা হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক সময়কাল ও নবজাগরণের পরে উদ্ভূত সংস্কৃতি
- বেনিতো মুসোলিনি ছিলেন ইতালির ফ্যাসিবাদী রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক
- সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে লেনিনবাদী বলশেভিক পার্টির ভূমিকা
- সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘর — পল রবসন
- সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্রের ইউনিয়ন
- আলোকায়নের বা আলোকিত যুগ ছিল ইউরোপ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার একটি সময়কাল
- ফেবিয়ানবাদ বা ফেবিয়ান সমিতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী সমিতি
- চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
- ইউরোসাম্যবাদ বা ইউরোকমিউনিজম: পশ্চিম ইউরোপে মার্কসবাদের বিবর্তন ও আদর্শিক বিচ্যুতি
- প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন: আধুনিক ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
- ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বা পুনর্জাগরণ আন্দোলনের প্রভাব
তথ্যসূত্র
১. প্রবন্ধটির প্রধান অংশটি ইংরেজি উইকিপিডিয়া থেকে অনুবাদ করে নেয়া হয়েছে।
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৩৬।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।