দাস সমাজ হচ্ছে শোষণমূলক সমাজ পদ্ধতির একটি প্রাক-পুঁজিবাদী রূপ

দাস সমাজ বা দাস-মালিকদের সমাজ বা দাসত্ব (ইংরেজি: Slavery) হচ্ছে শোষণমূলক সমাজ পদ্ধতির একটি প্রাক-পুঁজিবাদী রূপ। আদিম সাম্যবাদী সমাজের অবক্ষয়ের সাথে সমাজে শোষক ও শোষিতের বিভক্তি দেখা দেয়। এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটে যারা অন্যের শ্রমের ফল ভোগ করে বেঁচে থাকে। এক শ্রেণি কর্তৃক অপর শ্রেণির উপর শোষণ – এটাই শ্রেণি-বিভক্ত সমাজের বিকাশের বিভিন্ন স্তরকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে। কিন্তু, বিকাশের বিভিন্ন স্তরে, শোষণের রূপ-সমূহ, অর্থাৎ যে পদ্ধতির সাহায্যে এক শ্রেণির শ্রমের ফল ভোগ করে অন্য শ্রেণি বেঁচে থাকে, তা বদলে যায়।[১]

“ক্রীতদাস-প্রথা, যা সভ্যতার আমলে সর্বোচ্চ বিকাশ লাভ করে, প্রবর্তন করে সমাজের মধ্যে শোষক ও শোষিত শ্রেণিতে সমাজের প্রথম বড় বিভক্তি। সভ্যতার গোটা কালে এই বিভক্তি অব্যাহত থাকে। সুপ্রাচীন জগতের বৈশিষ্ট্যসূচক শোষণের প্রথম রূপ হলো ক্রীতদাস-প্রথা। তারপর মধ্যযুগে এর অনুগামী হয়ে আসে ভূমিদাস-প্রথা, আর সাম্প্রতিককালে মজুরী-দাসত্ব। এগুলোই হলো সভ্যতার তিনটি বড় বড় যুগের বৈশিষ্ট্যসূচক দাসত্বের তিনটি বড় বড় রূপ। এই রূপগুলোর অপরিবর্তনীয় চিহ্ন হলো হয় নগ্ন, না-হয়, আধুনিক যুগের ছদ্মাবরণকৃত দাসত্ব।”[২]

আমরা পূর্বেই দেখেছি যে, কোন নির্দিষ্ট সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায়, উৎপাদন-যন্ত্রের সাথে তাদের সম্পর্ক অনুসারেই শ্রেণিসমূহের অবস্থানের ভিন্নতা হয়। ক্রীতদাস-প্রথা, ভূমিদাস-প্রথা ও পুঁজিবাদী-প্রথা – শোষণের উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজের এই তিন মূল রূপের প্রত্যেকটিরই, এই দিক দিয়ে, তাদের নিজ নিজ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সামাজিক উৎপাদনের নিজস্ব গঠন-কাঠামো, উৎপাদন-সম্পর্কের নিজস্ব ধরণ দ্বারাই শোষণমূলক সমাজের এইসব রূপের প্রত্যেকটির পার্থক্য নির্ধারিত হয়। 

মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে বিভিন্নমুখী যুগেও ক্রীতদাস-প্রথার দেখা পাওয়া যায়। ক্রীতদাস-প্রথা হলো শোষণের সবচেয়ে প্রাচীন রূপ। মানব সমাজের লিখিত ইতিহাসের ঠিক সূচনাকালেই এর সাক্ষাৎ মেলে।

আরো পড়ুন:  সরল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক বানানো একটি শব্দ

দাস সমাজ ও দাস-প্রথায় শোষিত শ্রেণি হলো শোষক দাস-মালিকদের সম্পত্তি। ঘর-বাড়ী, জমিজমা, পশু-পাখির মতোই, ক্রীতদাসদের মালিক হলো দাসপ্রভু। যে প্রাচীন রোমে দাস-প্রথার সমৃদ্ধি ঘটেছিল, সেখানে ‘নির্বাক যন্ত্র’ ও ‘আধা-নির্বাক যন্ত্র’ (গবাদি পশু) থেকে পার্থক্য করার জন্য দাসদের বলা হতো সবাক যন্ত্র। দাসদের মনে করা হতো তার প্রভুর মালিকানাধীন অস্থাবর সম্পত্তি, আর দাসকে হত্যা করার জন্য দাস-প্রভুকে কোনো কৈফিয়ত দিতে হতো না। দাস-মালিক তার সম্পত্তির অংশ হিসেবেই দাসদের বিবেচনা করতো, আর তার মালিকানাধীন ক্রীতদাসদের সংখ্যা দ্বারাই সম্পত্তির পরিমাপ করা হতো। দাস-মালিক তার ক্রীতদাসদের কাজ করতে বাধ্য করতো। জোর-জবরদস্তির অধীনে, দৈহিক শাস্তির ভয়-ভীতির অধীনে সম্পাদিত শ্রমই হলো দাস-শ্রম। নিম্ন উৎপাদনী-ক্ষমতা ছিল দাস-শ্রমের বৈশিষ্ট্য। দাসপ্রথার অবস্থাধীনে কারিগরি অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত শ্লথগতি সম্পন্ন। দাস-শ্রম দ্বারা নির্মিত সুবিশাল সৌধগুলো ক্রীতদাসদের বিশাল বাহিনীর পেশী-শক্তির প্রচেষ্টার জোরেই নির্মাণ করা হয়েছিল, যারা সবচেয়ে মামুলি ধরনের হাতিয়ার-পাতি দিয়েই কাজ করতো। দাস-মালিকদের পক্ষে ক্রীতদাসদের শ্রমকে লঘু করার ব্যবস্থা নেয়ার কোনো কারণ ছিল না।

দাস-প্রথায় শোষণের পরিসীমা কি ছিল? দাস-প্রথায় হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতিই কেবল নয়, বরং খোদ দাস-শ্রমিকদের মালিকও ছিল দাসপ্রভু। ক্রীতদাসরা ছিল তাদের প্রভুর সম্পত্তি। দাস-মালিক তার ক্রীতদাসদের খাওয়াতো-পরাতো ও রক্ষণাবেক্ষণ করতো, কারণ একটি বিশেষ দাসের মুত্যু ছিল তার জন্য ক্ষতির বিষয়, তার সম্পত্তির কমতি স্বরূপ। উৎপাদিত-দ্রব্যের বিনিময় যে পর্যন্ত অনগ্রসর ছিল, সে পর্যন্ত শুধু তার নিজ রাজ্যের অভ্যন্তরে যেসব জিনিসের চাহিদা রয়েছে সেসব জিনিস উৎপাদন করতেই দাস-মালিক তার ক্রীতদাসদের বাধ্য করতো। দাস-প্রথায় শাসক শ্রেণির জীবনের বৈশিষ্ট্য ছিল অযৌক্তিক ভোগ-বিলাস ও অপব্যয় । কিন্তু ভোগ-বিলাস যত বেশীই হোক না কেন, দাস-শ্রমের একটা সীমা ছিল, কারণ একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশী বাড়তি উৎপন্ন-দ্রব্য ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। দাসত্ব প্রথায় ধন-সম্পদের বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এটাই দাস-প্রথায় কারিগরী উন্নতির স্বল্পতার কারণ হিসেবে কাজ করে।

আরো পড়ুন:  হেগেলের সুশীল সমাজ সংক্রান্ত ধারণা মার্কস ও অন্যান্যদের প্রভাবিত করে

শ্রেণি-আধিপত্যের সাথে একত্রেই বলপ্রয়োগের যন্ত্র হিসেবে রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে, শোষক সংখ্যালঘিষ্ঠের জন্যে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠদের খেটে মরতে তা বাধ্য করে। প্রাচীন যুগের দাস-মালিক সমাজে রাষ্ট্র ছিল বর্তমান কালের চেয়ে সংকীর্ণ পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। যোগাযোগ ব্যবস্থা তখনও ছিল অনগ্রসর, পাহাড়-পর্বত ও সাগর-মহাসাগর যে বাধা উপস্থিত করে তা অতিক্রম করা ছিল দুঃসাধ্য। রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র প্রভৃতি রাষ্ট্রের বিভিন্ন রূপ পূর্ব থেকেই দাস-প্রথায় বিরাজমান ছিল। তথাপি, রাষ্ট্রের রূপ যাই থাক না কেন, দাস-মালিকদের প্রভুত্বের এক যন্ত্র হিসেবেই তা বিদ্যমান ছিল। সাধারণভাবে সমাজের সদস্য হিসেবে ক্রীতদাসদের বিবেচনা করা হতো না।

বিশেষ করে প্রাচীন গ্রীস ও প্রাচীন রোমে, দাস-মালিক সমাজ বৈজ্ঞানিক ও শৈল্পিক অগ্রগতির এক উচ্চ স্তরে আরোহণ করে। কিন্তু, তা ছিল এমন এক সংস্কৃতি যা অগণিত সংখ্যক দাসের কঙ্কাল-স্তুপের উপরই গড়ে উঠেছিল।

ঘন ঘন যুদ্ধ-বিগ্রহের আমলে দাসে পরিণত হওয়া লোকের সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে যায়। ক্রীতদাসদের জীবন ছিল অতি মাত্রায় সস্তা আর শোষক শ্রেণি তাদের জীবনের অবস্থাকে করে তুলেছিল পুরোপুরিভাবেই অসহনীয়। দাস-যুগের ইতিহাস হলো শোষক ও শোষিতের মধ্যেকার রক্তাক্ত সংগ্রামের ইতিহাস। দাস-মালিকদের বিরুদ্ধে দাসদের অভ্যুত্থানগুলো নির্দয় নিষ্ঠুরতার সাথেই দমন করা হতো। 

বিশেষ করে দাস-সমাজের টিকে থাকার শেষ যুগে দাস-বিদ্রোহসমূহ দাস-মালিক সমাজের খোদ ভিত্তিমূলই কাঁপিয়ে তোলে। যখন রোমানদের নিকট পরিচিত দুনিয়ার সবচেয়ে দূরবর্তী অঞ্চলে একের পর এক দেশ জয় করে রোমান সাম্রাজ্য বিপুল ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, তখন সে সময়ের সমাজের গোটা সৌধ-কাঠামোকে যেসব দ্বন্দ্ব ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল তার আঘাতে তা আরো টলমল করে উঠে। স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে রোমে যে দাস-বিদ্রোহ দেখা দেয় তা হলো বিশেষ ভাবে খ্যাতিসম্পন্ন, যে স্পার্টাকাস দাস-মালিকদের শাসনের বিরুদ্ধে এক বিশাল বাহিনীর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। দাসদের বিদ্রোহ শোষিতদের জয়ী করতে পারেনি, পারেনি সাধারণভাবে শোষণের অবসান ঘটাতে। সুস্পষ্ট উপলব্ধি সম্পন্ন লক্ষ্যে নিজেদের নিয়োজিত করার মতো অবস্থায় দাসেরা ছিল না। নিজেদের সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয়ার মতো একটা শক্তিশালী সংগঠন তারা গড়ে তুলতে পারেনি। প্রায়শঃই দাসেরা হয়ে পড়তো নিজেদের মধ্যে লড়াইরত শোষক শ্রেণির বিভিন্ন দলের হাতের পুতুল। তা সত্ত্বেও, গৃহযুদ্ধ ও দাস-বিদ্রোহগুলো দাসমালিক ব্যবস্থার সমাজকে কঠোর আঘাত হানে, এবং তার ধ্বংসের ভিত্তি ভূমি তৈরী করে।

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্রের ইতিহাস কয়েক শতাব্দীব্যাপী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক লড়াই

তথ্যসূত্র

১. এ লিয়নতিয়েভ, মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র, সেরাজুল আনোয়ার অনূদিত, গণপ্রকাশন, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃষ্ঠা ২৩-২৪।

২. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, “পরিবারের উৎস”, পৃঃ ২১৪

Leave a Comment

error: Content is protected !!