মুক্ত জ্ঞানের মহাযজ্ঞ: কেন আমি উইকিমিডিয়া আন্দোলনে যুক্ত আছি

উইকিমিডিয়া আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণ একেক জনের কাছে একেক রকম হলেও, আমার কাছে এটি এক গভীর আত্মতৃপ্তির জায়গা। প্রতিদিনের ব্যস্ত ও একঘেয়ে রুটিন কাজ শেষ করে যখন আমি উইকিপিডিয়ার পাতায় লিখতে বসি, তখন আমার ক্লান্ত মন এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি পায়। আমার মনে হয়, উইকিপিডিয়ার কোনো নিবন্ধে আমার যোগ করা নতুন তথ্য বা এই ক্ষুদ্র অবদান হয়তো পৃথিবীর কোনো প্রান্তের একজন মানুষের জীবন বা কাজকে আরও একটু সহজ করে তুলছে।

পেশাগত জীবনে বাংলাদেশে একজন নিবেদিত পরিবেশকর্মী হিসেবে বিগত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রক্ষায় মাঠপর্যায়ে কাজ করেছি। প্রকৃতির প্রতি সেই ভালোবাসা থেকেই আমি বাংলা উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশের নদ-নদী এবং এর জীববৈচিত্র্য নিয়ে নিয়মিত নিবন্ধ লিখতে শুরু করি। অবশেষে যেদিন আমি নদী সম্পর্কিত সমস্ত নিবন্ধ তৈরির কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম, সেটি ছিল আমার উইকি-জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং আনন্দের একটি মুহূর্ত।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিহীন কাজ: ১ কোটিরও বেশি ভিউয়ের মাইলফলক

যখন আমার মনে এই ভাবনাটি আসে যে, ইন্টারনেটে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ নানা বিষয়ে অনুসন্ধান করছে এবং আমার তৈরি করা কনটেন্ট তাদের সঠিক তথ্য পেতে সাহায্য করছে, তখন আমি উইকিমিডিয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিহীনভাবে কাজ করার শক্তি পাই। একজন উইকিমিডিয়ানের কাছে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। আমার দীর্ঘদিনের এই পথচলায় সবচেয়ে বড় সার্থকতা ও মানসিক সন্তুষ্টি পেয়েছি তখন, যখন জানতে পেরেছি যে আমার নিজ হাতে তৈরি করা ১৭০০টিরও বেশি তথ্যসমৃদ্ধ নিবন্ধ এ পর্যন্ত পাঠকেরা ১ কোটির (১,০০,০০,০০০) বেশি বার দেখেছেন। পাঠকদের এই বিশাল সাড়া এবং ভালোবাসাই আমাকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো কিছু করার এবং নতুন তথ্য যুক্ত করার অনুপ্রেরণা জোগায়।

উইকিম্যানিয়ার মূলভাব: আমার দৃষ্টিতে “উন্মুক্ত সহযোগিতা”

উইকিম্যানিয়া ২০২৪-এর মূল প্রতিপাদ্য বা মূলভাব ছিল “উন্মুক্ত সহযোগিতা” (Collaboration of the Open)। আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, এই ‘উন্মুক্ত সহযোগিতা’ হলো এমন একটি দলগত কাজ বা টিমওয়ার্ক, যেখানে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং বৈষম্যহীনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেন। এর সহজ অর্থ হলো, যেকোনো ব্যক্তি এই বিশ্বব্যাপী উইকিমিডিয়া আন্দোলনে যেকোনো গঠনমূলক উপায়ে নিজের সুবিধা অনুযায়ী যুক্ত হতে পারবেন। এখানে স্বেচ্ছাসেবকদের ভৌগোলিক অবস্থান, জাতি বা পরিচয়ের ওপর কোনো বাধা কিংবা বৈষম্য আরোপ করা হয় না। এই মহৎ প্ল্যাটফর্মে উইকিমিডিয়া আন্দোলনের সকল অংশগ্রহণকারী অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ উপায়ে একে অপরকে সহযোগিতা করতে সর্বদা প্রস্তুত। আমার কাছে “উন্মুক্ত সহযোগিতা”-এর প্রকৃত অর্থ হলো বয়স, সংস্কৃতি, ধর্ম কিংবা অভ্যাস নির্বিশেষে বিভিন্ন জাতি ও ভাষার অসংখ্য ব্যবহারকারীর সক্রিয় উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এই ধরণের সহযোগিতা এমন এক দলগত কাজকে নির্দেশ করে, যা অজস্র কাজের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবন তৈরি করে।

নিঃস্বার্থ স্বেচ্ছাসেবা এবং বহুসংস্কৃতির উইকিমিডিয়ানদের সাথে অভিজ্ঞতা

উইকিমিডিয়া আন্দোলনের মূল ভিত্তি যেহেতু সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবী কাজ, তাই এখানে যুক্ত সকল উইকিমিডিয়ানেরই উচিত কোনো ব্যক্তিগত বা অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ইচ্ছা ছাড়াই নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া। এখানকার “উন্মুক্ত সহযোগিতা” মূলত সাধারণ পাঠকদের জন্য কাজ, নতুন ব্যবহারকারীদের সাহায্য করা এবং উইকিপিডিয়ার সার্বিক মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যেই নিবেদিত। বিগত ১৩ বছরের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় আমি ভারতীয় এবং নেপালিদের মতো বিভিন্ন দেশের ও জাতির উইকিমিডিয়ানদের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে কাজ করার চমৎকার সুযোগ পেয়েছি। এমনকি আমার নিজ দেশে, মূলধারার বাংলা উইকিমিডিয়ানদের পাশাপাশি আদিবাসী সাঁওতালি উইকিমিডিয়ানদের সাথেও বিভিন্ন জ্ঞানভিত্তিক প্রজেক্টে আমার কাজ করার এক দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা আমার চিন্তাভাবনাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: দক্ষিণ এশিয়ার জাদুঘর প্রকল্প এবং সবার প্রতি আহ্বান

উইকিপিডিয়ায় কাজের সুবাদে আমার মনের খোলামেলা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে GLAM (Galleries, Libraries, Archives, and Museums) বা গ্যালারি, লাইব্রেরি, আর্কাইভস এবং জাদুঘর নিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রজেক্ট শুরু করতে গভীরভাবে উৎসাহিত করেছে। এই বিশেষ প্রকল্পটির নাম হচ্ছে “দক্ষিণ এশিয়ার জাদুঘর প্রকল্প”। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমি ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের উইকি-ব্যবহারকারী ও গবেষকদের সাথে একসাথে কাজ করার একটি বৃহৎ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। ইতোমধ্যে আমি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের বিভিন্ন ভাষার দক্ষ উইকিমিডিয়ানদের সাথে প্রাথমিক কাজ শুরুও করে দিয়েছি। আপনারা যারা মুক্ত জ্ঞান ছড়াতে এবং মানবকল্যাণে অবদান রাখতে ভালোবাসেন, তারা যে কেউ উইকিমিডিয়া আন্দোলনের সাথে যুক্ত হতে পারেন এবং আমার মতো এমন বহুমুখী ও বৈশ্বিক কাজের অংশীদার হয়ে উঠতে পারেন।

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও টিকা:

বর্তমান প্রকাশ: লেখাটি সর্বপ্রথম ১৮ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে ফুলকিবাজ.কম-এ প্রকাশ করা হয়েছিল। সম্পূর্ণ কন্টেন্টটি নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক আজ ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে পুনরায় হালনাগাদ করে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment