বিংশ শতাব্দীর আধ্যাত্মিক জগতের এক প্রদীপ্ত নক্ষত্র ছিলেন অখিলানন্দ স্বামী। তিনি একাধারে ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ ধর্মপ্রচারক, বাগ্মী সুবক্তা এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী এক কালজয়ী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা এবং ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা বহু মানুষকে সত্যের পথে অনুপ্রাণিত করেছে।
জন্ম ও শৈশব পরিচয়:
এই মহান সাধকের জন্ম ১৮৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশের) নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নওপাড়া গ্রামে। এক রক্ষণশীল অথচ জ্ঞানচর্চাকারী ব্রাহ্মণ পরিবারে তাঁর জন্ম। সংসার জীবনে প্রবেশের আগে তাঁর পারিবারিক নাম ছিল নিরোদ চন্দ্র চক্রবর্তী। তাঁর পিতা অমরচন্দ্র চক্রবর্তী ছিলেন একজন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি, যাঁর আদর্শে নিরোদ চন্দ্রের শৈশব ও চারিত্রিক ভিত্তি গঠিত হয়েছিল।
সন্ন্যাস গ্রহণ ও রামকৃষ্ণ মিশনে যোগদান
অখিলানন্দ স্বামীর অন্তরে আধ্যাত্মিকতার বীজ বপন হয়েছিল তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই। জাগতিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি জীবনের প্রকৃত অর্থের সন্ধানে ব্যাকুল ছিলেন। এই প্রবল বৈরাগ্য থেকেই তিনি ছাত্রাবস্থায় সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। ১৯১৯ সালে, মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রামকৃষ্ণ মিশনে যোগদান করেন এবং আধ্যাত্মিক নাম হিসেবে ‘স্বামী অখিলানন্দ’ নাম ধারণ করেন।
গুরুদীক্ষা ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি
আধ্যাত্মিক জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় পাওনা ছিল শ্রী রামকৃষ্ণের সরাসরি শিষ্য এবং রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দের (যিনি রাখাল মহারাজ নামেও পরিচিত) সান্নিধ্য। স্বামী ব্রহ্মানন্দের কাছ থেকেই তিনি পবিত্র দীক্ষা লাভ করেন। তাঁর হাত ধরেই অখিলানন্দ স্বামী বেদান্তের গূঢ় রহস্য এবং সেবার আদর্শে দীক্ষিত হন, যা পরবর্তী জীবনে তাঁকে বিশ্বজুড়ে ধর্মপ্রচারে সহায়তা করে।
পাশ্চাত্যে পাড়ি ও বোস্টনে ধর্মপ্রচার
স্বামী অখিলানন্দের মেধা ও বক্তৃতার দক্ষতা রামকৃষ্ণ মিশনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯২৬ সালের নভেম্বরে রামকৃষ্ণ মিশনের নির্দেশে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি স্বামী পরমানন্দকে তাঁর ধর্মপ্রচার এবং সাংগঠনিক কাজে সহায়তা করতে বোস্টনে অবস্থান করেন। পাশ্চাত্যের মানুষের কাছে অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় হিন্দু দর্শনের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
সাংগঠনিক সাফল্য ও প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর
পাশ্চাত্যে বেদান্ত দর্শনের একটি স্থায়ী ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তাঁর হাত ধরে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়:
- বেদান্ত সোসাইটি অফ প্রোভিডেন্স (১৯২৮): রোড আইল্যান্ডে বেদান্তের বাণী পৌঁছে দিতে তিনি এই সংস্থাটি প্রতিষ্ঠা করেন।
- রামকৃষ্ণ বেদান্ত সোসাইটি অফ বোস্টন (১৯৪১): স্বামী পরমানন্দের মহাপ্রয়াণের পর বোস্টনে বেদান্ত প্রচারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে আসে এবং তিনি ১৯৪১ সালে এই সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন।
আমৃত্যু তিনি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং পাশ্চাত্যে ভারতীয় দর্শনের এক বিশ্বস্ত আলোকবর্তিকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পাশ্চাত্যের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রভাব: সাহিত্যকর্ম ও মনস্তত্ত্ব

স্বামী অখিলানন্দ কেবল একজন ধর্মপ্রচারকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শনের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী এক অনন্য লেখক। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘হিন্দু সাইকোলজি: ইটস মিনিং ফর দ্য ওয়েস্ট’ (Hindu Psychology: Its Meaning for the West)। এই কালজয়ী গ্রন্থে তিনি সুনিপুণভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে প্রাচীন ভারতীয় মনস্তত্ত্ব আধুনিক পাশ্চাত্যের মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
আন্তঃধর্মীয় সংলাপে বইটির প্রভাব
তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী মহল এবং ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে বইটি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এটি সেই সময়ের ‘ইন্টারফেইথ ডায়ালগ’ বা আন্তঃধর্মীয় সংলাপে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। হিন্দু দর্শনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগুলো পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান ধর্মতাত্ত্বিকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল।
সেওয়ার্ড হিল্টনারের মূল্যায়ন
বিখ্যাত মার্কিন ধর্মতাত্ত্বিক ও মনস্তত্ত্ববিদ সেওয়ার্ড হিল্টনার (Seward Hiltner) অখিলানন্দ স্বামীর এই বইটির একটি গভীর ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা করেন। তিনি বইটিতে বর্ণিত পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে অত্যন্ত ইতিবাচক মন্তব্য করেন। হিল্টনারের মতে:
“এই বইয়ের মূল ধারণাগুলো মূলত মানুষের নিম্নতর প্রবৃত্তি বা আদিম আবেগগুলোকে কীভাবে উচ্চতর গুণাবলি ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়, তা নিয়ে আবর্তিত হয়েছে।”
তবে খ্রিস্টান দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এর বৈসাদৃশ্য নিয়েও হিল্টনার সতর্ক করেছিলেন। তিনি তাঁর পর্যালোচনার শেষে বলেন:
“এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং চমৎকার বই। তবে আমাদের মনে রাখা উচিত যে, এই বইটির মূল দর্শন বা মৌলিক অনুমানগুলো জীবনের সর্বোত্তম খ্রিস্টীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাথে কিছুটা সাংঘর্ষিক হতে পারে। এই বৈচিত্র্যকে উপেক্ষা করা আমাদের ঠিক হবে না।”
আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি: যীশু ও হিন্দু দর্শনের মেলবন্ধন
স্বামী অখিলানন্দ কেবল হিন্দু ধর্মই নয়, বরং বিভিন্ন ধর্মের মধ্যকার আধ্যাত্মিক যোগসূত্র নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ‘হিন্দু ভিউ অব ক্রাইস্ট’ (Hindu View of Christ)। এই বইটিতে তিনি বেদান্তের দৃষ্টিকোণ থেকে যীশু খ্রিস্টের শিক্ষাকে ব্যাখ্যা করেছেন, যা তৎকালীন খ্রিস্টান সমাজে যীশুকে নতুনভাবে বোঝার এক নতুন দুয়ার খুলে দেয়। বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক জান জঙ্গেনিল অখিলানন্দের এই কাজকে বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন, যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ধর্মীয় দর্শনের এক অপূর্ব মিলন ঘটেছে।
বিখ্যাত দার্শনিকদের সাথে সখ্য ও পাণ্ডিত্য
স্বামী অখিলানন্দের পাণ্ডিত্য কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি আমেরিকার বিশিষ্ট দার্শনিক ও মেথডিস্ট ধর্মতাত্ত্বিক এডগার এস. ব্রাইটম্যান এবং ওয়াল্টার জর্জ মুয়েলডারের সাথে দীর্ঘদিনের গভীর বন্ধুত্ব বজায় রেখেছিলেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধুত্ব প্রমাণ করে যে, তিনি ভিন্ন মতাদর্শের মানুষের কাছেও কতটা গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধেয় ছিলেন।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী
ধর্ম ও দর্শনের ওপর তাঁর গভীর জ্ঞান আরও ফুটে ওঠে তাঁর অন্যান্য বইগুলোতে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু বই হলো:
- মডার্ন প্রবলেমস অ্যান্ড রিলিজিয়ন (Modern Problems and Religion): আধুনিক জীবনের সংকটে ধর্মের ভূমিকা।
- টাইম অ্যান্ড ইটার্নিটি: এ বেদান্তিক পারসপেক্টিভ (Time and Eternity: A Vedantic Perspective): সময় ও অনন্তকাল নিয়ে বৈদান্তিক বিশ্লেষণ।
মহাপ্রয়াণ ও চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার
সুদীর্ঘকাল ধরে জ্ঞান ও শান্তির বাণী প্রচার শেষে এই মহান সাধক ১৯৬২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইহলোক ত্যাগ করেন। যদিও তিনি আমেরিকার বোস্টনে তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন, কিন্তু তাঁর শেকড় ছিল বাংলার মাটিতে। নেত্রকোণার নওপাড়া থেকে বিশ্বমঞ্চে তাঁর এই যাত্রা আজও আমাদের গর্বিত করে।
আরো পড়ুন
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ২১।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।