ইউরোপের অর্থনৈতিক শক্তি: দেশগুলোর বিশাল শিল্প সাফল্য ও বৈশ্বিক প্রভাব

পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র এক-পঞ্চমাংশেরও কম মানুষ ইউরোপ মহাদেশে বসবাস করা সত্ত্বেও, ইউরোপ একাই সারা বিশ্বের মোট শিল্পপণ্যের প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি উৎপাদন করে আসছে। উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবহার করে বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদনে এই আধিপত্য বজায় রাখা ইউরোপের অর্থনৈতিক সক্ষমতার এক অনন্য উদাহরণ।

জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইউরোপ মহাদেশটি অত্যন্ত নগরসমৃদ্ধ, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ বর্তমানে শহর অঞ্চলে বসবাস করেন। আধুনিক নগরায়নের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে এই মহাদেশে লন্ডন, মস্কো, প্যারিস, মাদ্রিদ, বার্লিন এবং বুদাপেস্টের মতো বিশ্বখ্যাত মহানগরীগুলো অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘লেনিনগ্রাদ’ শহরটি বর্তমানে ‘সেন্ট পিটার্সবার্গ’ (Saint Petersburg) নামে পরিচিত, যা আজও ইউরোপের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র। বর্তমানে ইউরোপে ১০ লক্ষাধিক বা তার বেশি জনবসতিপূর্ণ প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টিরও বেশি বৃহৎ শহর রয়েছে। এই ইউরোপীয় শহরগুলি মূলত প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে, যেখানে একটি বিশাল অংশ জুড়ে অত্যন্ত দক্ষ ও পরিশ্রমী শ্রমিক শ্রেণীর বসবাস মহাদেশটির উৎপাদনশীলতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ইউরোপীয় ভূখণ্ডের প্রায় তিন-পঞ্চমাংশের অধিকারী এই বিশাল অঞ্চলে মহাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশেরও বেশি মানুষ বসবাস করত এবং এখানেই ইউরোপের সামগ্রিক শিল্পপণ্যের অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদিত হতো। তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক ইউরোপ ছিল বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিক হার, কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন এবং শিল্পোৎপাদনের গুণগত মান বিবেচনায় নিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, এই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো অনেক উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র থেকেও নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ এগিয়ে বা বহুদূর প্রাগ্রসর ছিল। বর্তমানে এই অঞ্চলগুলো আধুনিক গণতান্ত্রিক ও মুক্তবাজার অর্থনীতির পথে অগ্রসর হয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক পরাধীনতার মাত্রা যোগ করেছে।

ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের বিচারে পশ্চিম ইউরোপ আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বের মোট শিল্পপণ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এককভাবে উৎপাদন করে থাকে, যা বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদনে এই অঞ্চলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্যের প্রমাণ দেয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি এই অঞ্চলটি কৌশলগত ও সামরিক দিক থেকেও অত্যন্ত প্রভাবশালী; বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর সাম্রাজ্যবাদী ও আধুনিক সামরিক সামর্থ্যের এক সুবিশাল ও উল্লেখযোগ্য অংশের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে এই রাষ্ট্রগুলো বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী সামরিক জোট (যেমন ন্যাটো) এবং বিশাল শিল্প কাঠামোর সমন্বয়ে পশ্চিম ইউরোপ বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ভৌগোলিক আয়তন ও জনসংখ্যার বিচারে পশ্চিম ইউরোপের মাত্র এক-চতুর্থাংশ বা তারও কম হওয়া সত্ত্বেও, এই অঞ্চলের অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত উন্নত ও স্থিতিশীল ছোট দেশগুলো সমগ্র ইউরোপের মোট শিল্পপণ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ উৎপাদন করে, যা এককভাবে শক্তিশালী ব্রিটেনের মোট উৎপাদনের প্রায় সমতুল্য। আধুনিক অর্থনৈতিক সূচক ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশেষ করে মাথাপিছু উৎপাদন এবং উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ‘মেশিন টুলস’ বা শিল্প-যন্ত্রপাতি নির্মাণে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যাণ্ড ইতিমধ্যে ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে অথবা অন্যান্য প্রধান পশ্চিম ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলোর সমপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছে। সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বিবেচনায় নিলে এটি স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর বর্তমানে জার্মানি, ব্রিটেন এবং পশ্চিম ইউরোপীয় অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রবর্গের এই জোটই বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ও শিল্প-অর্থনীতির দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য বজায় রাখছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. কনস্তানতিন স্পিদচেঙ্কো, অনুবাদ: দ্বিজেন শর্মা: বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূগোল, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, বাংলা অনুবাদ ১৯৮২, পৃ: ১৯-২০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!