দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস: কারণ, ঘটনা এবং ভয়াবহ পরিণতির সম্পূর্ণ চিত্র

মানব সভ্যতার ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (Second World War) ছিল এক নজিরবিহীন ধ্বংসাত্মক অধ্যায়, যা ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর স্থায়ী হয়েছিল। সেই চরম উত্তেজনাকর সময়ে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো মূলত মিত্রশক্তি এবং অক্ষশক্তি নামক দুটি শক্তিশালী সামরিক জোটে বিভক্ত হয়ে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এই মহাযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে ৩০টিরও বেশি দেশের প্রায় ১০ কোটিরও বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেছিল, যা একে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধে (Total War) পরিণত করে। যুদ্ধের ভয়াবহতা এতটাই ব্যাপক ছিল যে দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব, শিল্প কাঠামো এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনসমূহকে সম্পূর্ণভাবে সামরিক উদ্দেশ্যে এবং রণকৌশল বাস্তবায়নে নিয়োজিত করেছিল।[১]

নৃশংসতার দিক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও মারাত্মক জীবনঘাতী সংঘাত। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মহাযুদ্ধে প্রায় ৭ থেকে সাড়ে ৮ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, যার বিশাল একটি অংশ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীনের নিরপরাধ বেসামরিক জনতা। এই বিপুল প্রাণহানির পেছনে কাজ করেছিল পরিকল্পিত গণহত্যা, নাৎসি বাহিনীর অমানবিক হলোকাস্ট (Holocaust), নির্বিচার কৌশলগত বোমা হামলা এবং যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ ও মহামারী। এছাড়া মানব ইতিহাসের একমাত্র যুদ্ধ হিসেবে এই সংঘাতের শেষ পর্যায়ে ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ দেখা গিয়েছিল, যা যুদ্ধের সংজ্ঞাকে চিরতরে বদলে দেয়।

রণাঙ্গনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও অনেক অত্যাধুনিক ও উন্নত অস্ত্রের ব্যবহার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণহানির পরিমাণ বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই সর্বাত্মক বিশ্বযুদ্ধ দেশ থেকে দেশ ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে। অন্যদিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সাগরতল, গভীর মহাসাগর এমনকি অন্তরীক্ষেও চলেছিল ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী সংঘাত। বিশ্বের প্রায় ৬১টি দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অংশগ্রহণে এই মহাযুদ্ধ চলেছিল দীর্ঘ ৬ বছর ধরে। জাপানে লিটল বয় ও ফ্যাটম্যান নামক পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে মৃত্যুর এক চরম তাণ্ডবলীলা। অবশেষে ১৯৪৫ সালে জার্মানির আত্মসমর্পণ এবং জাপানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অনুষ্ঠিত প্যারিস শান্তি সম্মেলন মূলত ইউরোপে স্থায়ী শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছিল। ভার্সাই চুক্তির অপমানজনক শর্তগুলো জার্মানির ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার ফলে তারা মনে মনে আরেকটি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ইতিহাসে জয়ী শক্তির ভাষ্যই প্রাধান্য পায়, আর পরাজিতদের জন্য সবকিছুই নেতিবাচক হয়—এই ধ্রুব সত্যটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। প্রচলিত ইতিহাসে জার্মান নেতা হিটলার এবং তার মিত্র দেশগুলোর ভূমিকাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট বাদ পড়ে যায়। পরস্পর আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের সাধারণ রীতি সরিয়ে রাখলে একে নিছক একটি ঐতিহাসিক ঘটনা মনে হতে পারে। তবে প্রচলিত কাহিনীতে প্রায়শই অক্ষশক্তি ও হিটলারের নেতিবাচক ছবি অতিরঞ্জিতভাবে বারবার তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোই পরিস্থিতি বিচারে আংশিক সত্য কিংবা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। তাই ইতিহাসের এই বর্ণনাগুলোকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনায় পুনঃপাঠ ও সেগুলোর কার্যকারণ বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে বিশ্বজুড়ে এমন কিছু অস্থিতিশীল ঘটনা ঘটে যা বিশ্বনেতাদের নতুন করে আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধে জড়াতে প্ররোচিত করে। জার্মানির জন্য চরম অপমানজনক ভার্সাই চুক্তির পাশাপাশি প্যারিস শান্তি সম্মেলনের ব্যর্থতা কার্যত আরেকটি যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে দেয়। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়কালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ১৯৩০-এর দশকের গ্রেট ডিপ্রেশন তথা ভয়াবহ মহামন্দাকেও বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তাই যুদ্ধের প্রকৃত পটভূমি ও মূল কারণ বোঝার ক্ষেত্রে দুই বিশ্বযুদ্ধের অন্তর্বর্তীকালীন ইউরোপের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।[২]

যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও ভয়াবহতা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দুই দশক না পেরোতেই ধরা পড়ে ভার্সাই চুক্তির সারশূন্যতা আর লীগ অব নেশনসের অকর্মণ্য অবস্থান। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব নতুন করে কেঁপে ওঠে আরেক দফা আক্রমণ আর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের মর্মন্তুদ ঘটনায়। এরপর ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ পর্যন্ত দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে রক্তক্ষয়ী ৬ বছর ১ দিন। তারপর আবার শান্ত হয়ে আসে ইউরোপের বিভিন্ন রণাঙ্গন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা কিংবা আটলান্টিক অঞ্চলের পাশাপাশি আফ্রিকার নানা দুর্গম স্থান। সেই অক্ষশক্তি জার্মানির পক্ষে এবার যোগ দিয়েছিল ভিন্ন মিত্র ইতালি, জাপান, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া আর বুলগেরিয়া। আর যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের মিত্রবাহিনীতে এবারের বড় আকর্ষণ ছিল বিশাল রাশিয়া। রুশপন্থী ইতিহাসবিদদের ক্রমাগত পুঁজিবাদ ভর্ৎসনা আর অতিরঞ্জিত বিবরণ থেকে বোঝা কঠিন হয়ে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসলে অক্ষশক্তি-মিত্রশক্তির মধ্যে হয়েছে, নাকি রুশ বনাম পুরো বিশ্ব হয়েছে। তবে কঠোর বাস্তবতা হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও অনুষ্ঠিত হয় অক্ষশক্তি আর মিত্রশক্তির মধ্যে। আর এবারে মিত্রশক্তির পুরোভাগে ছিল রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রাজিল। ফলাফলটা শেষ পর্যন্ত এবারও অবধারিতভাবে বিপক্ষে গেছে অক্ষশক্তির।

যুদ্ধের প্রধান নেতৃত্ব এবং ক্ষয়ক্ষতি

মিত্রশক্তির ক্ষেত্রে দেখা গেছে রাশিয়ার নেতৃত্বে জোসেফ স্তালিন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ও ট্রুম্যান, যুক্তরাজ্যের উইনস্টন চার্চিল, চীনের চিয়াং কাইশেক এবং ফ্রি ফ্রান্স আন্দোলনের নেতা শার্ল দ্য গল ফরাসিদের নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে, থার্ড রাইখ সরকারের প্রধান ও নাৎসি বাহিনীর পুরোধা অ্যাডলফ হিটলার ছিলেন অক্ষশক্তির নেতৃত্বের পুরোভাগে। ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনি এবং জাপানের সম্রাট হিরোহিতো ও প্রধানমন্ত্রী তোজো ছিলেন স্ব স্ব বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে বিশ্বজনীন রূপ লাভ করে যখন জাপান আকস্মিক পার্ল হারবার আক্রমণ করে বসে। এরপর হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে চরম আক্রোশে যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক বোমা নিক্ষেপ ১৯৪৫ সালে জাপানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। এরই মাঝে জার্মানি পরাজিত হলে একটি গোপন বাংকারে আত্মহননের মাধ্যমে নিজের জীবনের অবসান ঘটান অ্যাডলফ হিটলার। ১৯১৯ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ক্যালেন্ডারের পাতায় দুই দশকের সামান্য বেশি সময় পার হতেই ১৯৩৯ সালে শুরু হয়ে যায় এই প্রলয়ঙ্কারী যুদ্ধ। এর করুণ ফলাফল হিসেবে বিভিন্ন রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনীর প্রায় ১৬ লক্ষ সৈন্য নিহত হয় এবং এর বাইরে ৪৫ লাখের বেশি নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়।

আরো পড়ুন

📖 বিশেষ পাঠ: ইউরোপের আদি ইতিহাস এবং আধুনিক বিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে জানতে আমাদের এই বিশেষ পাতাটি ভিজিট করুন— ইউরোপের ইতিহাস: প্রাচীন সভ্যতা থেকে আধুনিক বিশ্ব 🛡️

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ৩০ আগস্ট ২০১৯, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল” রোদ্দুরে.কম, ইউআরএল: https://www.roddure.com/history/on-second-world-war/
২. মো. আদনান আরিফ সালিম, আধুনিক বিশ্বের ইতিহাস, [Pdf]. বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জানুয়ারি ২০১৯. সানজিদা মুস্তাফিজ ও সুমা কর্মকার. সম্পা. পৃষ্ঠা ৭০; Retrieved from http://www.ebookbou.edu.bd/wp/OS/hsc4_2.php#hsc2855

Leave a Comment

error: Content is protected !!