একজন রাজনৈতিক নেতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন অসঙ্গতি সম্পর্কে বুঝতে পারা, উপলব্ধি করা এবং সমাজের অসঙ্গতিগুলো দূর করার জন্যে চিন্তা ও কাজ করা। বেগম রোকেয়া শুধু একজন লেখক? একজন সমাজ সংস্কারক? একজন আলোকবর্তিকা?
বেগম রোকেয়া পাঠ এবং তাঁর কৃতি ও কীর্তি পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় তিনি একজন অঘোষিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কারণ, রাজনৈতিক নেতার কাজই হচ্ছে সমাজের সকল কুসংস্কারে আঘাতের পর আঘাত করে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া। বেগম রোকেয়া ছিলেন দলহীন সংগঠনহীন এক প্রতিভাবান অদ্বিতীয় নেতৃত্বের অধিকারী। যদিও আমরা রাজনীতি বলতে শুধুমাত্র রাষ্ট্র পরিচালনা করার রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মতৎপরতা বুঝে থাকি। তাঁর “পিপাসা” প্রবন্ধটি প্রগতির তৃষ্ণায় তৃষিত। রোকেয়া বলছেন, “প্রাণটা সত্যই নিদারুণ তৃষ্ণানলে জ্বলিতেছে। এ জ্বালার শেষ নাই, বিরাম নাই, এ জ্বালা অনন্ত।….” (পিপাসা) এই প্রবন্ধের শেষাংশে তিনি লিখছেন,
“আমার হৃদয় যত গভীর, পিপাসাও তত প্রবল। এ সংসারে কাহার পিপাসা নাই?… ধনীর ধন-পিপাসা, মানীর মান-পিপাসা, সংসারীর সংসার-পিপাসা, নলিনীর তপন-পিপাসা, চকোরীর চন্দ্রিকা-পিপাসা! অনলেরও তীব্র পিপাসা আছে! আহা! এই মোটা কথা বুঝ না?”
একজন নেতার কাজ শুধু রাজনৈতিক মঞ্চে বক্তৃতা দিয়ে মঞ্চ কাঁপানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না;— সমাজের বিভিন্ন সঙ্কট উন্মোচন করা এবং সেই সঙ্কট নিরসনের জন্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। মেয়েদের জন্যে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনীতি। পুরুষশাসিত সমাজের বুকে আঘাত করে পুরুষীদের মেরুদন্ড খাড়া করার যে হিম্মত রোকেয়া দেখিয়েছেন, তা ইতিহাসে দুর্লভ। এ জন্যে অনেকেই তাঁকে একজন সমাজসংস্কারক হিসাবে আখ্যায়িত করেন। যদিও মেয়েদের জন্যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা ছিল সম্পূর্ণরূপে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
মানুষের জীবন প্রবাহের কতগুলো ধারা আছে; যেমন — জেলে জীবন, পাহাড়ী জীবন, কৃষক জীবন, তাঁতী জীবন, চাশ্রমিক জীবন, কয়লাসহ বিভিন্ন খনির শ্রমিকদের জীবন, মরু জীবন, যাযাবর জীবন, বেদে জীবন, সাপুড়ে জীবন, ধর্মীয় জীবন, ধর্মহীন জীবন, নাস্তিক জীবন, স্বাভাবিক জীবন, অস্বাভাবিক জীবন, গোষ্ঠী জীবন, সম্প্রদায়ভিত্তিক জীবন, বাউল জীবন, সন্ন্যাস জীবন, উদ্বাস্তু জীবন, ভাড়াটে জীবন, চাকুরে জীবন, বেকার জীবন, শহুরে জীবন, শহরতলী জীবন, গ্রামীণ জীবন, অজোপাড়াগাঁ জীবন প্রভৃতি জীবন প্রবাহ মানব জীবনে বিভিন্নভাবে বিরাজমান; তাছাড়া শ্রেণি তো আছেই (উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিন্মমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, বিত্তের বাইরের নৃগোষ্ঠীবিত্ত)। অর্থাৎ সামান্য কয়েকটা বছরের জীবনে মানুষের বিচিত্র স্বভাব, বিচিত্র আচরণ, বিচিত্র জীবনযাপন এক আশ্চর্য যাত্রা। এ যাত্রায় মানুষ যাযাবর হওয়ার পরিবর্তে হয়ে উঠেছে অধিকর্তা। ফলে সর্বত্র অস্থিরতা আর নৈরাজ্যের এক হাটবাজারে মানুষের আনাগোনা। সেই বিচিত্র জীবনের অস্থির অবস্থাকে শান্ত করতে এবং নৈরাজ্যের হাটকে স্বর্গরাজ্যে পরিণত করতে পুরুষ এবং পুরুষীর অবস্থানকে সুস্থ ও মধুর করতে সামাজিক সীমাবদ্ধতাগুলো গভীরভাবে আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। এমনকি মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক সকল সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার উপায়গুলোও অনুসন্ধান করেছেন তিনি। বেগম রোকেয়ার মতে পুরুষ-পুরুষীর পারস্পরিক উন্নতি ও সহযোগিতাই মানব সভ্যতাকে স্বর্গে পরিণত করতে পারে। ফলে তিনি তাঁর রচনায় বারবার উভলিঙ্গের বোঝাপড়া সম্পর্কে অবহিত করেছেন।
এখানে যে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো — বেগম রোকেয়ার জীবন, কর্ম ও সাহিত্য পাঠকের পাঠানন্দের বস্তু নয়; বরং রাষ্ট্রীয় জীবনে বেগম রোকেয়ার চিন্তার বাস্তবায়ন জরুরি। কেননা, পুরুষ-পুরুষী সমান্তরাল অবস্থায় পৌঁছতে পারলেই জগতের অসংখ্য সমস্যা সমাধানযোগ্য। তবুও পাঠক যদি পাঠের মধ্যদিয়ে বেগম রোকেয়ার সাহিত্যে অনুপ্রাণিত হন, তাতে পাঠক উপকৃত না হলেও উন্নত হবেন।
পৃথিবীতে একজন মেয়ে সরাসরি ধর্ম, পুরুষ ও সমাজের বিরুদ্ধে পুরুষীর অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন, তিনি বেগম রোকেয়া। তিনি মানুষের জীবনের সৌন্দর্যের বিভিন্ন পর্যায় বিশেষ করে পুরুষ ও পুরুষীর সহাবস্থান নিয়ে ব্যাপক দিক-নির্দেশনা উপস্থাপন করেছেন। যাতে পুরুষ এবং পুরুষীদের কন্টকাকীর্ণ জীবন ধীরে ধীরে পুষ্পশয্যায় রূপ নিতে পারে।
বৈষম্য হচ্ছে প্রকৃতির অভিন্ন বৈপরিত্য সুষমা। জগতের প্রতি পরতে পরতে বিচ্ছেদের লীলা বিরাজমান। এই লীলা নিয়মহীন শৃঙ্খলহীন এক অমোঘ নিয়তি। সেই অদৃষ্টের হাত থেকে মানুষের মুক্তির কোনো উপায় নেই। কিন্তু, মনুষ্য সৃষ্ট বৈষম্য বিশেষ করে মেয়েদের প্রতি পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিরূপ ধারনাকে তুলে ধরে, সেই বিরূপ ধারনাকে আঘাতের পর আঘাত করে শিকড় উপড়ে ফেলাই ছিলো রোকেয়ার স্বকীয়তা। সেখানে কোনো বিরোধ নেই, আছে একরাশ চমৎকার যুক্তি। যে যুক্তির কাছে সমাজ ও পুরুষশক্তি পেশিশক্তি প্রদর্শন করতে পারে না। সে যুক্তির কাছে ধর্মগ্রন্থগুলোর বচন দুর্বল। রোকেয়ার মহিমা ফুটে উঠেছে পুরুষী সম্পর্কিত সমাজ, পরিবার ও ধর্মীয় রোগ নির্ণয়ের থিউরিগুলো বর্ণনাতে। তিনি গৃহবধূ এবং গৃহিনীদের আচারগুলো হাস্যরসে তুলে ধরেছেন অতি দরদের সঙ্গে। যেখানে পাঠকের চিন্তায় মুক্তি ও যুক্তির সমন্বয় লক্ষনীয়।
মেয়েদের দাসত্বের আয়োজন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত। বেগম রোকেয়া সেই ছিদ্রগুলো অতি সহজে তুলে ধরেছেন। বিশেষত মেয়েরা সাজগোজ অলংকারপ্রিয়। কিন্তু, রোকেয়া অলংকারের আয়োজন সম্পর্কে বলেন,
“আমাদের অতিপ্রিয় অলংকারগুলি- এগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ! এখন ইহা সৌন্দর্যবর্ধনের আশায় ব্যবহার করা হয় বটে;… কিন্তু অলংকার দাসত্বের নিদর্শন ছিল।… যাহার শরীরে দাসত্বের নিদর্শন যত অধিক, তিনি সমাজে ততোধিক মান্যা গণ্যা!
এই অলংকারের জন্য ললনাকুলের কত আগ্রহ!…
এই অলংকারের জন্য ললনাকুলের কত আগ্রহ! যেন জীবনের সুখ সমৃদ্ধি উহারই উপর নির্ভর করে।… অভ্যাসের কি অপার মহিমা! দাসত্বে অভ্যাস হইয়াছে বলিয়া দাসত্বসূচক গহনাও ভালো লাগে।…
বাস্তবিক অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন ভিন্ন আর কিছুই নহে।” (স্ত্রী জাতির অবনতি)
এতো সহজভাবে পুরুষীদের চোখ দেওয়ার পরও মেয়েরা যুগ যুগ ধরে এখনো অলংকারপাগল!!
পুরুষীদের দমিয়ে রাখার আয়োজন সকল দেশে সকল কালে সকল সমাজে সকল গোত্রে সকল ধর্মে বর্ণে পুরুষগণ তৈরি করে রেখেছেন। এবং এই দমিয়ে রাখার শিকড় এতো গভীরে যে তার মূলোৎপাটনের প্রারম্ভিক পদক্ষেপ শিক্ষা। এজন্যে রোকেয়া মেয়েদের শিক্ষার প্রতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেন। শিক্ষা সম্বন্ধে তিনি বলেছেন,
“শিক্ষা-র অর্থ কোনো সম্প্রদায় বা জাতিবিশেষে ‘অন্ধ-অনুকরণ’ নহে। ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান বা ক্ষমতা দিয়াছেন, সেই ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা।”
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মেয়েদের অর্থাৎ পুরুষীদের দমিয়ে রাখার যে অনুশীলন ব্যক্তি পরিবার গোষ্ঠী সমাজ প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র হচ্ছে, সেই অনুশীলনের প্রভাবে মেয়েদের জিনগত বৈশিষ্ট্যে দুর্বলতা স্থায়ীভাবে বাসা বেঁধেছে। ফলে মেয়েরা প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের পুরুষ অপেক্ষা দুর্বল মনে করে। ব্যতিক্রম কিছু পুরুষী কখনো কখনো পুরুষদের সমকক্ষ হয়ে জগতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরুষীদের দুর্বলতা ফুটে উঠে। এক্ষেত্রে রোকেয়ার দ্বারস্থ হওয়া যাক,
“অনেকে মনে করেন যে পুরুষের উপার্জিত ধন ভোগ করে বলিয়া নারী তাহার প্রভুত্ব সহ্য করে। কথাটা অনেক পরিমাণে ঠিক। বোধহয় স্ত্রী জাতি প্রথমে শারীরিক শ্রমে অক্ষম হইয়া পরের উপার্জিত ধনভোগে বাধ্য হয়। এবং সেইজন্য তাহাকে মস্তক নত করিতে হয়। কিন্তু এখন স্ত্রী জাতির মন পর্যন্ত দাস হওয়ায় দেখা যায়, যে স্থলে দরিদ্রা স্ত্রীলোকেরা সূচিকর্ম বা দাসীবৃত্তি দ্বারা অর্থ উপার্জন করিয়া পতি পুত্র প্রতিপালন করে, সেখানেও ঐ অকর্মণ্য পুরুষেরাই “স্বামী” থাকে। আবার যিনি স্বয়ং উপার্জন না করিয়া প্রভূত সম্পত্তির উতরাধিকারিণীকে বিবাহ করেন, তিনিও তো স্ত্রীর উপর প্রভুত্ব করেন! এবং স্ত্রী তাহার প্রভুত্বে আপত্তি করেন না। ইহার কারণ এই যে বহুকাল হইতে নারীহৃদয়ের উচ্চবৃত্তিগুলি অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায় নারীর অন্তর, বাহির, মস্তিস্ক, হৃদয় সবই দাসী হইয়া পড়িয়াছে। এখন আর নারীদের হৃদয়ে স্বাধীনতা, ওজস্বিতা বলিয়া কোন বস্তু নাই — এবং তাহা লাভ করিবার প্রবৃত্তি পর্যন্ত লক্ষিত হয় না।”
পুরুষীদের পিছিয়েপড়া, দুর্বলতা এবং পরিবার ও সমাজে তাদের অবহেলার বিভিন্ন কারণ বেগম রোকেয়া উপরের উদ্ধৃতাংশে তুলে ধরেছেন। একইভাবে এই দুর্বলতা দৈন্যতা কাটিয়ে উঠার কৌশল ও চেষ্টার কথা সহজ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। রোকেয়ার মতে,
“কি করিলে আমরা দেশের উপযুক্ত কন্যা হইব? প্রথমতঃ সাংসারিক জীবনের পথে পুরুষের পাশাপাশি চলিবার ইচ্ছা অথবা দৃঢ় সংকল্প আবশ্যক। এবং আমরা গোলামজাতি নই, এই কথায় বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইবে।…
পুরুষের সমকক্ষতা লাভের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। যদি এখন স্বাধীনভাবে জীবিকা অর্জন করিলে স্বাধীনতা লাভ হয়, তবে তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে আমরা লেডীকেরাণী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডীম্যাজিস্ট্রেট, লেডীব্যারিস্টার, লেডীজজ — সবই হইব। পঞ্চাশ বৎসর পরে লেডী Viceroy হইয়া এ দেশের সমস্ত নারীকে “রানী” করিয়া ফেলিব!! উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? যে পরিশ্রম আমরা “স্বামী”র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?…
আমরা যদি রাজকীয় কার্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে না পারি, তবে কৃষিক্ষেত্রে প্রবেশ করিব।”
এরপরই তিনি সাবলীল ভঙ্গিতে পুরুষ-পুরুষীর সহাবস্থান আরও স্পষ্ট করতে বলেন,
“আমরা সমাজেরই অর্ধঅঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোন ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে, সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ এবং নারীদের স্বার্থ ভিন্ন নহে- একই। পুরুষদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা, নারীদের লক্ষ্যও তাহাই। শিশুর জন্য পিতামাতা – উভয়ের সমান দরকার। কি আধ্যাত্মিক জগতে, কি সাংসারিক জীবনের পথে- সর্বত্র নারী যাহাতে তাঁহাদের পাশাপাশি চলিতে পারে, আমাদের এরূপ গুণের আবশ্যক।”
একজন রাজনৈতিক নেতার কাজ মানুষ ও সমাজের শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে সাংগঠনিকভাবে কাজ করা। কিন্তু বেগম রোকেয়ার রাজনীতির ক্ষেত্র ভিন্ন। তিনি রাজনীতি করেন এককভাবে। তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই; তিনি নিজের সঙ্গে নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মুখোমুখি দাঁড় করান। এবং সমাজের কুসংস্কারের বিরামহীন আঘাত করেন। “নিরীহ বাঙ্গালি” প্রবন্ধটিতে বেগম রোকেয়া বাঙালির স্বভাব, খাদ্যাভ্যাস, এবং পোশাকসহ চারিত্রিক দুর্বলতা ভীরুতা যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তাতে হুমায়ুন আজাদের “বাঙালি একটি রুগ্ন জনগোষ্ঠী” বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি প্রবন্ধ।
সমাজ সংস্কারক হিসাবে বেগম রোকেয়ার ভাষা নদীর স্রোতের মতো বহমান এবং সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ছন্দময়। অপরদিকে হুমায়ূন আজাদের ভাষা চৈত্রের খরতাপদগ্ধ এবং কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। এ জন্যে বেগম রোকেয়া কৃষক তথা কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন; যার কোনো বিকল্প নেই। বলা উচিত “নিরীহ বাঙ্গালি” প্রবন্ধটি বেগম রোকেয়ার কথিত শিক্ষিত বাঙালি সনদধারীদের প্রতি চপেটাঘাত।
পুরুষ -পুরুষীর বৈষম্য এবং মেয়েদের দমিয়ে রাখার আয়োজন একটি রাজনৈতিক বিষয় ; এমনকি এই বৈষম্য এবং দমিয়ে রাখার আয়োজন থেকে মুক্তির জন্যে যে রাজনীতির প্রয়োজন, সেই রাজনীতি ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়েছে রোকেয়ার সাহিত্যে, রোকেয়ার কৃতি ও কর্মে।
“অর্ধাঙ্গী” প্রবন্ধে পুরুষের আধিপত্যের কাছে পুরুষীরা কতো অসহায় তার উজ্জ্বল প্রমাণ উপস্থিত করে বেগম রোকেয়া বলেন,
“স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপেন। স্বামী যখন কল্পনা-সাহায্যে সুদূর আকাশে গ্রহনক্ষত্রমালা বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধুমকেতুর গতি নির্ণয় করেন; স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাউল ডাল ওজন করেন এবং রাধুনীর গতি নির্ণয় করেন।”
তিনি পুরুষ-পুরুষী তথা ছেলে-মেয়ের বৈষম্যের বিভিন্ন স্তর, বিভিন্ন পর্যায়, বিভিন্ন ধাপ এবং বিভিন্ন ব্যবস্থা সম্পর্কে অতি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন,
“যিনি পুত্রের সুশিক্ষার জন্য চারিজন শিক্ষক নিয়োগ করেন, তিনি কন্যার জন্য দুই জন শিক্ষয়িত্রী নিযুক্ত করেন কি? যেখানে পুত্র তিনটা (বি. এ. পর্যন্ত) পাস করে, সেখানে কন্যা দেড়টা পাস (এন্ট্রাসি পাস ও এফ. এ. ফেল) করে কি?”
অর্থাৎ মেয়েদের দমিয়ে রাখার আয়োজন শুরু হয় পরিবার থেকেই। “পদ্মরাগ” কিংবা “মতিচুর” সহ আরও অনেক লেখা আছে, যেগুলো একজন ব্যক্তির শুধু আত্মোউপলব্ধিই নয়; বরং রাজনৈতিক বক্তব্য।
“সুলতানার স্বপ্ন” একটি কল্পময় স্বাপ্নিক জার্নি। যেখানে বেগম রোকেয়া বোঝাতে চেয়েছেন একজন মেয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেক শক্তিমান। কিন্তু সমালোচকগণ এই বক্তব্যকে নানান রঙ মেখে ব্যাখ্যা করে আসছেন। অথচ এই গল্পের মূলভাব আত্মশক্তিতে মাধুকরীর সন্ধান করা; বলা যায় স্বর্গসুখ উপলব্ধি করা। এটাও পুরুষীর রাজনৈতিক অবস্থান। অতএব, বেগম রোকেয়াকে সাহিত্যিক আর সমাজসংস্কারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা বোকামি। বেগম রোকেয়া মূলত একজন রাজনৈতিক প্রতিনিধি; যাঁকে আমরা ভয়ঙ্কর আশ্চর্য অপরূপ এক সাহিত্যিক ও সমাজকর্মী হিসাবে বীরদর্পে দণ্ডায়মান দেখেছি। তিনি আমাদের পুরুষ-পুরুষীদের নমস্য। শেষ করছি রোকেয়ার রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে। রোকেয়া বলছেন,
“কোনো ভগ্নী মস্তক উত্তোলন করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। … আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যে পুরুষগণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষরচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পান, কোনো স্ত্রী-মুনির বিধানে হয়ত তাঁহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। … ধর্ম আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে; ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন।”
পরিশেষে বলা যায়, বেগম রোকেয়া কেবল একজন সাহিত্যিকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক ও বলিষ্ঠ রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখনীর সাবলীল ছন্দ আর গভীর জীবনবোধ একইসঙ্গে কৃষকের অধিকার রক্ষা এবং তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের ভণ্ডামিকে উন্মোচিত করেছে। পুরুষতান্ত্রিক বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙতে তিনি যে রাজনৈতিক সচেতনতার বীজ বুনেছিলেন, তা আজও বাঙালি নারীর মুক্তির পথে ধ্রুবতারা হয়ে আছে। মূলত, তাঁর সাহিত্য ও কর্মের সার্থকতা নিহিত রয়েছে শোষিত মানুষের অধিকার এবং নারীর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার নিরন্তর সংগ্রামে।
আরো পড়ুন
- রাজনৈতিক সমাজসংস্কারক হিসেবে বেগম রোকেয়া: একটি বিশ্লেষণ
- শহীদ কমরেড রাবেয়া আখতার বেলী: নকশালবাড়ি আন্দোলনের এক নির্ভীক নারী বিপ্লবী
- নারী-শ্রমিকদের প্রথম সারা রুশ কংগ্রেসে বক্তৃতা
- সিমন দ্য বোভেয়া: ব্রিজিত বার্দো এবং ললিতা সিনড্রোম ও অন্ধ হয়ে আসা চোখ গ্রন্থের আলোচনা
- মুক্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ
- নারীমুক্তির প্রশ্নে লেনিনবাদ শোষণ ও অধীনতা থেকে মুক্তির কথা বলে
- সাম্যের নারীবাদী ভাবনা হচ্ছে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মালিকানা অর্জনে সমতা
- নারীমুক্তি প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সাক্ষাৎকার
- সেলিনা হোসেনের সাক্ষাৎকার — আদর্শবিহীন রাজনীতি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়
- হাসনা বেগমের সাক্ষাৎকার — আমাদের শত্রু হলো রাষ্ট্র ব্যবস্থা
- নারীবাদ পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন
- নারীমুক্তি হচ্ছে সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন

লোকমান ফরাজী বাংলাদেশের কবি, লেখক, ও উপন্যাসিক। তিনি ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ ( The Outspoken Daily) পত্রিকায় দীর্ঘদিন সম্পাদকীয় ও অনলাইন বিভাগে কাজ করেন। তার প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থগুলো হচ্ছে — অকবিতা (২০০৯), রুখে দাঁড়াবি কবে (২০১০) ও সীমাবদ্ধতার সীমালঙ্ঘন (২০১১); গল্পগ্রন্থ — রুগ্ন সমাজ এবং উপন্যাস — তোমাকে ভালোবসে (২০১০)। তিনি ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৮৫ তারিখে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন।