তিনি পালিয়ে এসেছেন। গভীর জঙ্গল, সামনে পাহাড়ের খাদ বেয়ে বইছে, তারই ধারে একটা কুঁড়ে তৈরি করে উনি ধ্যানমগ্ন আছেন। সরস্বতী বীণ কি করে আবার খুঁজে পাওয়া যায়। সেই তার সাধনা।
মানুষকে ভালোবাসতে গিয়ে, অনেক আঘাত পেয়ে তিনি মদ এবং ধীশক্তির আশ্রয় গ্রহণ করে কোথাও বোধ হয় উঠার চেষ্টা করছিলেন। তাই সমাজ তাঁকে পরিত্যাগ করল, সংসার তাঁকে পরিত্যাগ করল, পরমপ্রিয়া স্ত্রী পরিত্যাগ করলেন, দেবশিশুর মতো ওঁর নিজস্ব সন্তানগুলি পরিত্যাগ করল এবং উনি এই জঙ্গলে মনুষ্যবহির্ভূত একটি কুটিরে এসে আশ্রয় নিলেন।
সুরের ধ্যানই হচ্ছে ওঁর ধ্যান এবং ঐ সুর যে মন্ত্রে বেরুতে পারে সেই সরস্বতী বীণ পৃথিবী থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে। তবুও তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে থাকলেন, নানারকম যন্ত্র ঠুকঠাক করে হাতুড়ি পিটে ঘসে মেজে দাঁড় করাবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তখন উনি রাগ করে যন্ত্রটাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। সেটা ঝনঝন শব্দে বেজে উঠল।
সেদিন বর্ষার রাত। মাথায় ঘুরছে খালি মধ্যম-রেখা আন্দোলন। উনি দুহাতে মুখ ঢেকে বসে আছেন আর মাঝে মাঝে মদের পাত্রটা থেকে একটা করে চুমুক দিচ্ছেন। এই সময় হঠাৎ কোথা থেকে পাখিরা গান গেয়ে উঠল। গভীর সঙ্গীত শোনা গেল, তারপরে উনি মুখ তুলে দেখলেন সামনে অপূর্ব একটি মহিলা। তিনি শুভ্রা, শ্বেতবসনা, হংসবাহিনী, কমললোচনা। তিনি হেসে বললেন— “তুমি আমার প্রেমিক, এসো আমরা প্রেম করি।”
এই গভীর অরণ্যে যেখানে নারীর অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না, সেইখানে এমন অপরূপা তিলোত্তমা মহিলা কোথা থেকে এলেন, এটা বিবেচনার বস্তু। বাইরে বিজলির ঝলক কোথায় যেন হারিয়ে গেল। পৃথিবী শান্ত স্তব্ধ হয়ে এল। ঝিঁ ঝিঁ ডাক আস্তে আস্তে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল। মাঘী পূর্ণিমার চন্দ্রিমা কোথা থেকে উদিতা হলেন, চারপক্ষ যেন গুটিয়ে আসতে থাকল।
তিনি উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কে?”
মহিলা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন “বীণটা তোল।”
উনি বললেন, “এ তো সরস্বতী বীণ, হারিয়ে গেছে, এই তো খুঁজছিলাম।”
মহিলা বললেন, “আমার হাতে দাও।”
তিনি দিলেন।
মহিলা সেটিকে নিজের হাতে নিয়ে এক অপরূপ লীলায়িত ছন্দে গ্রহণ করে একটি ঝংকার তুললেন। একটি ঝংকার।
অপরূপ সব শুভ্র।
জগৎ এইখানেই শেষ।।
আরো পড়ুন
- মার
- ঝংকার
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- প্রেম
- আনুগত্য হলো একটি দেশ, দর্শন, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠা
- শিল্পকলা হচ্ছে সৃজনশীল অভিব্যক্তি, গল্প বলার এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের পরিসর
বিশেষ দ্রষ্টব্য: গল্পটি ছাপা হয়মধ্যাহ্ন পত্রিকার ৩য় বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, পৌষ-কার্তিক ১৩৭৫ সময়ে। এখানে ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট প্রকাশিত ঋত্বিক ঘটকের গল্প সংগ্রহ, ৪ নভেম্বর ১৯৮৭, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১২৫ থেকে নেয়া হয়েছে।

ঋত্বিক ঘটক (জন্ম: ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ – মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুবার বহুভাবে উচ্চারিত। তিনি পরিচালনা করেছেন নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্র।