দ্বারকাপুরী। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণদেবের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুভদ্রার নিমিত্ত প্রার্থনা মন্দিরে গিয়ে হাজির হলেন। সুভদ্রা তখন তার শুচিশুভ্র হাতদুটি জোড় করে পরম ব্রহ্মের চিন্তায় ধ্যাননিমীলিতা ছিলেন। চারিপাশে যদুকুলবংশীয় মহাকুলবৃন্দ।
হলায়ুধ বলরাম জমিকর্ষণে ব্যস্ত। ধরিত্রী মাতার স্তন হইতে দুগ্ধ আহরণে ব্যাপৃত। শ্রীকৃষ্ণ মিটিমিটি করিয়া চাহিয়া আছেন। আর দ্বিরথধারী অর্জুনকে অতিগূঢ় নির্দেশ দিতেছেন: ব্রহ্মার মন্দিরে আরোহণ কর।
সুভদ্রা তখন প্রণাম শেষ করিয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিতেছেন। এমন সময় দ্বারে কোমল করাঘাত। সখীরা সচকিত হইয়া উঠিল। সুভদ্রার দুই রক্তোৎপল সদৃশ কর্ণে হস্ত প্রদান করিয়া তাহার শ্রুতিবোধের বাহিরে রাখিয়া দিলেন। কিন্তু তবু সুভদ্রা সেই হস্তাঘাতের মর্ম অনুভব করিলেন।
তিনি ঝটিতি উঠিয়া বসিলেন। কহিলেন কার করাঘাত? সখীরা কহিল: উহা কিছু না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এইরকম শব্দ হইয়া থাকে।
সুভদ্রার তীব্র নাসা স্ফুরিত হইয়া উঠিল। ভ্রুকুটি বিভঙ্গে তিনি কহিলেন: আমি জানি। তাই আমার কাছে অনূত কথা কহিও না। তিনি আসিয়াছেন আমি যাইব।
ঐদিকে বাহিরে শ্রীকৃষ্ণ তাহার শিখীপাখাসংযুক্ত শির হানিয়া অর্জুনকে কহিতেছেন: বৎস, ধৈর্য ধারণ করো। চিরকালের যোদ্ধা অর্জুনের কর্ণমূল পর্যন্ত রক্তিম হইয়া উঠিয়াছে। তিনি গাণ্ডীবে একটি টঙ্কার ছাড়িলেন। যদুকুলবান ভয় পাইয়া গৃধ্নস্বরূপ পলায়ন করিয়া হলাকর্ষণ ক্ষেত্রে শ্রীবলরামের প্রতি গিয়া নিবেদন করিলেন যে সুভদ্রা অপহৃতা হইতেছেন।
ইহার মধ্যে মন্দিরের দ্বার খুলিয়া গিয়াছে। সুভদ্রা অর্জুন-পদ্মলোচন দেখিয়া প্রায় মূর্ছিতা। কী করিবেন তাহা ভাবিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। সখীবৃন্দ তাহাকে ধরিয়া দ্বারকাপুরীর দিকে লইয়া যাইবার চেষ্টা করিতেছেন। তাহার যাইবার ক্ষমতা নাই।
অর্জুন কহিলেন: রথে উঠো। কৃষ্ণ, যিনি সৃষ্টি-স্থিতি-বিলয়ের কর্মকর্তা, শুধুমাত্র একটু হাসিলেন।
শ্রীকৃষ্ণ যাদবগণকে ঠেকাইলেন না। যেমন যেমন অর্জুনদেব সুভদ্রাকে দ্বিরথে উঠাইয়া প্রবল বেগে রথচালনা করিলেন, তেমন তেমন যাদবগণ শর-নিক্ষেপ করিতে লাগিলেন, ইহার মধ্যে স্বয়ং স্বয়ম্ভূ-স্বরূপ হলায়ুধ হাতে হল লইয়া পশ্চাৎধাবন করিতে লাগিলেন।
আজিকার ভাষায় বলা যায় যে, শ্রীকৃষ্ণ একটু মুচকাইয়া হাসিয়াছিলেন। অর্জুনের প্রতি শর নিক্ষিপ্ত হইতে লাগিল। সুভদ্রা যিনি বীরভোগ্যা, যিনি এই ধাত্রী বসুন্ধরা, তিনি কহিলেন: উহারা শরনিক্ষেপ করিতেছে। হে প্রভু, হে পার্থ, রথের রশ্মি আমার হাতে দাও। ইহাদিগকে তুমি মোটামুটি সামলাও।
অর্জুন দেখিলেন, ইহাই পৃথিবী।
তিনি সুভদ্রার হাতে তাহার নীল, শীল ও শৈল, শীল দুই অশ্বের দায়িত্ব দিতেছেন।
সুভদ্রা কহিলেন: আমি অশ্ব চালাইব। তুমি তোমার গাণ্ডীবে জ্যা রোপণ করো ত।
তাহার পর যা দৃশ্য হইল তাহা ভুলিবার নহে। রথ অন্তরীক্ষে উঠিল। সুভদ্রা সারথী, অর্জুন পশ্চাৎ সন্ধানকারী। সমগ্র যাদবকুল সম্বত এবং সংহৃত করিয়া অর্জুন সুভদ্রাকে গান্ধর্ব বিবাহের জন্য লইয়া গেলেন। যাহার ইতিহাস সপ্তব্যূহ গৃহে অভিমন্যু কাহিনীতে আমরা জানিতে পারি। এই প্রেমের কোনো তুলনা নাই। কৃষ্ণ তাহার চিরকালের দুষ্টামিযুক্ত মিষ্ট হাসিতে লাগিলেন, তখন হলায়ুধ চটিয়া কাঁই হইলেন।
এই হচ্ছে মোটামুটি পৃথিবীর চেহারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের। আমাদের বাপ-জ্যাঠাদের অনেক সুবিধে ছিল যে এই-সমস্ত রূপকের দ্বারা ব্যাপার জমাতে পারতো। কিন্তু আমরা এখন এমন একযুগে জন্মেছি যে এটা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি।
সোজা মার। মার না দিলে ব্যাপার জমবে না। রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে কীট প্রবেশ করেছে এবং আজকের ১৩ নং নেবুতলা লেনের অর্ধভুক্ত বৌমাটিকে দেখলে যার সুভদ্রার কথা মনে হয় না-সে মানুষ নয়।
সৈয়দ ওয়াজেদ আলী সাহেবের যে একটা কথা ছিল না-সেই Tradition সমানে চলেছে-সেটা বোঝার ক্ষমতা যার থাকবে সেই বুঝবে। এইসব রূপকের মধ্য দিয়ে চিরকাল আমাদের ভারতবর্ষ বেঁচে থাকবে। আমাদের মা-বোনেরা সেই সুভদ্রা এবং তাদেরকে, সেই রূপকে, গ্রহণ করার ক্ষমতা যাদের আছে তারা বুঝবে যে এই লড়াইটা এখনও শেষ হয় নি, কারণ বহুধাবিভক্ত এই আমাদের বাংলাদেশে, এখানে এইসব রূপকাশ্রয়ী কথাগুলি স্পষ্ট করে বলা হয় নি। সেটা করার জন্য একটা মারধোরের প্রশ্ন আছে।
আজকের বাংলাদেশের চারপাশে যা দেখা যায় সেরকম সুভদ্রা কোথায় হবে, সেরকম অর্জুনদেব কোথায় হবে। কিন্তু নিশ্চয় এরা বাংলাদেশে আছে। তারা হবে আমাদের উত্তরপুরুষ।
অভিমন্যুর মতো মায়ের গর্ভ থেকে তারা চক্রব্যূহ ভেদমন্ত্রের কৌশল শিখেছে। এবার এরা মেরে ফাটিয়ে দিক। এদের ফাটানোর একটা ব্যাপার এসে গেছে। সামনের রক্তিম শিমূল গাছটা মোটামুটিভাবে সেই কথাই বলছে।।
মধ্যাহ্ন ৪র্থ বর্ষ শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৭৬
মার গল্পের প্রেরণায় সোমনাথ হোড়ের কলম-
[১৯৪৭ সালের মাঝামাঝি কুতুবদিয়ায় গিয়েছিলাম। সেখানে তখন ঘোর বর্ষা। কমরেড ধীরেণ শীলের সঙ্গে কৃষক এলাকা ঘুরে দেখছিলাম। এক জায়গায় দেখলাম-লাঙ্গলের একদিকে গাই অন্যদিকে কিষাণী; লাঙ্গল চালাচ্ছে কিষাণ। ধীরেণ বললেন-এই আমাদের কৃষক জীবন। ‘মার’ গল্প পড়ে মনে হল-কিষাণ কিষাণীর ভূমিকা পাল্টে দেওয়া যায় না কি?
কিষাণী রূপা সুভদ্রার সারথ্যে অর্জুন অমিত বিক্রমে ভূমি কর্ষণ করছে বীজসিক্ত করবে। ছবিটিতে মূল গল্পের সরাসরি মিল নেই; তবে অবচেতনে মিল থাকতেও পারে।
সুভদ্রা, অর্জুন এবং পাচনি হাতে অভিমন্যু-কে রোখে এই জোট!
‘মার মার’।]
আরো পড়ুন
- মার
- ঝংকার
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- প্রেম
- আনুগত্য হলো একটি দেশ, দর্শন, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠা
- শিল্পকলা হচ্ছে সৃজনশীল অভিব্যক্তি, গল্প বলার এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণের পরিসর
বিশেষ দ্রষ্টব্য: গল্পটি ছাপা হয়মধ্যাহ্ন পত্রিকার ৪র্থ বর্ষ, শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৭৬ সময়ে। এখানে ঋত্বিক মেমোরিয়াল ট্রাস্ট প্রকাশিত ঋত্বিক ঘটকের গল্প সংগ্রহ, ৪ নভেম্বর ১৯৮৭, কলকাতা, পৃষ্ঠা ১৩৪-১৩৬ থেকে নেয়া হয়েছে।

ঋত্বিক ঘটক (জন্ম: ৪ নভেম্বর, ১৯২৫ – মৃত্যু : ৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৬) একজন বিখ্যাত বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম বহুবার বহুভাবে উচ্চারিত। তিনি পরিচালনা করেছেন নাগরিক (১৯৫২, মুক্তি ১৯৭৭), অযান্ত্রিক (১৯৫৮), বাড়ী থেকে পালিয়ে (১৯৫৮), মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) কোমল গান্ধার (১৯৬১), সুবর্ণরেখা (১৯৬২), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), যুক্তি তক্কো আর গপ্পো (১৯৭৭) প্রভৃতি চলচ্চিত্র।