সত্য ও চিন্তার আলোয় অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের ৮৭তম জন্মদিবস উদযাপিত

আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক, প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের ৮৭তম জন্মদিবস গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পালিত হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্যারের এই জন্মবার্ষিকীটি উদযাপিত হয়। তবে বিগত বছরগুলোর চেয়ে এবারের আয়োজনটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আবেগঘন। কারণ, চলতি বছরের ৫ জুলাই স্যারের প্রয়াণের পর, এটিই তাঁর প্রথম জন্মদিন যা শুভানুধ্যায়ীদের কাটল স্যারের সশরীরে উপস্থিতি ছাড়াই।

স্যারের আদর্শ ও দর্শনকে ধারণ করে এই বিশেষ দিনটি উদযাপনের লক্ষ্যে ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২:০০ টায় দিনাজপুরের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমীতে এক ব্যতিক্রমী আলোচনা ও স্মৃতিচারণ সভার আয়োজন করা হয়। খুব জাঁকজমকপূর্ণ না হলেও অনুষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ—তা হলো স্যারের জীবন, দর্শন ও সমাজচিন্তা নিয়ে কিছু সময় অতিবাহিত করা এবং তাঁর রেখে যাওয়া বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের মূল্যায়ন করা।

স্যারের স্মরণে স্মৃতিচারণ ও মুক্ত আলোচনা

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমীর এই অন্তরঙ্গ আয়োজনে উপস্থিত থেকে স্যারের বর্ণাঢ্য জীবন ও বহুমাত্রিক কর্মের ওপর আলোকপাত করেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও লেখকগণ। আলোচনা ও স্মৃতিচারণ পর্বে অংশ নেন:

  • অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম বিপ্লব
  • লেখক শাহজাহান সাজু
  • অধ্যাপক সারোয়ার মোর্শেদ রিগ্যান
  • ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমীর পরিচালক মানিক সরেন
  • ‘রোদ্দুর’ পত্রিকার সম্পাদক দোলন প্রভা এবং
  • লেখক ও চিন্তক অনুপ সাদি

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থী তাসমিম হাসান, আলাউদ্দিন আজাদ রুবেল, শামীমা ইয়াসমিন শিমু, সৈয়দা তাবাসসুম রোজ এবং কাওসার আলী বাবু। প্রবীণ ও নবীনের এই মেলবন্ধন অনুষ্ঠানটিকে এক নতুন মাত্রা দেয়।

জ্ঞানার্জন ও নবজাগরণের ভাবনায় আবুল কাসেম ফজলুল হক

আলোচকগণ তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারের সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কিত কাজ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আমাদের জ্ঞানার্জনের পরিধিকে প্রতিনিয়ত প্রসারিত করে। বিশেষ করে উনিশ ও বিশ শতকের রাজনৈতিক দিক এবং বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসকে তিনি যেভাবে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন, তা নতুন প্রজন্মকে মুক্তবুদ্ধির চর্চায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে।

আজকের এই আলোচনা ও আড্ডাটি উপস্থিত সকলের মনে আবারও এই বোধ জাগ্রত করেছে যে, অর্জিত জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাকে কীভাবে বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যের পাদপীঠে সমর্পণ করতে হয়। স্যার সবসময় বলতেন, জ্ঞান চর্চা তখনই সার্থক হয় যখন তা সমাজের কল্যাণে এবং সত্য উন্মোচনে ব্যবহৃত হয়।

‘স্বদেশ চিন্তা সঙ্ঘ’ ও স্যারের অনুপস্থিতির বেদনা

প্রতি বছর স্যারের জন্মদিনে ‘স্বদেশ চিন্তা সঙ্ঘ’-এর বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা স্যারের ঢাকার বাসভবনে একত্রিত হতেন। আনন্দঘন পরিবেশে কেক কাটা, শুভেচ্ছা বিনিময় আর দীর্ঘ সময়ের তাত্ত্বিক আড্ডায় মুখরিত থাকত সেই দিনটি। কিন্তু ২০২৬ সালের এই ৩০ সেপ্টেম্বর ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। স্যারের চিরবিদায়ের পর এবারই প্রথম তাঁর ভক্ত ও অনুরাগীরা স্যারের অনুপস্থিতিতে জন্মদিন পালন করলেন।

ভৌগোলিকভাবে রাজধানী থেকে দূরে দিনাজপুরে বসে আয়োজিত এই আড্ডাটি মূলত স্যারের শূন্যতা পূরণের এক নীরব চেষ্টা। সশরীরে তিনি আমাদের মাঝে না থাকলেও, তাঁর রেখে যাওয়া মূল্যবান গ্রন্থসমূহ, সমাজচিন্তা এবং নিরপেক্ষ রাজনৈতিক তত্ত্বের আলো চিরকাল আমাদের পথ দেখাতে থাকবে। মুক্তচিন্তার এই বাতিঘরের জন্মদিনে তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

আরো পড়ুন

Leave a Comment