দিমিত্রি নালবান্দিয়ান: সোভিয়েত ইউনিয়নের কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী

দিমিত্রি আরশাকি নালবান্দিয়ান (১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯০৬, তিফ্লিস, রুশ সাম্রাজ্য – ২ জুলাই, ১৯৯৩, মস্কো, রাশিয়া) ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের (USSR) একজন বিখ্যাত ও জনপ্রিয় চিত্রশিল্পী। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ‘হিরো অব সোশ্যালিস্ট লেবার’ উপাধিতে ভূষিত হন এবং সোভিয়েত একাডেমি অব আর্টসের একাডেমিশিয়ান হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি দুইবার মর্যাদাপূর্ণ ‘স্টালিন পুরস্কার’, ‘লেনিন পুরস্কার’ এবং ১৯৭০ সালে ‘জওহরলাল নেহেরু পুরস্কার’-এ ভূষিত হন। ১৯৪৮ সাল থেকে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

তিনি আর্মেনিয়ান সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকের (ԽՍՀՄ) বিশিষ্ট ও সম্মানিত চিত্রশিল্পী আরপেনিক নালবান্দিয়ানের ভাই।

দিমিত্রি নালবান্দিয়ানকে চারুকলার জগতে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতাবাদের (Socialist Realism) অন্যতম সেরা মাস্টার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে সোভিয়েত আমলের তথাকথিত “অফিসিয়াল পোর্ট্রেট” বা সরকারি প্রতিকৃতি আঁকার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিশিষ্ট এবং প্রভাবশালী চিত্রশিল্পী। প্রতিকৃতি ছাড়াও তিনি বিশাল আকারের ঐতিহাসিক পটভূমি, স্থিরচিত্র (Still Life) এবং প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ তৈরিতে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন।

প্রাথমিক জীবন ও কর্মজীবন

১৯২৯ সালে দিমিত্রি নালবান্দিয়ান তিফ্লিস একাডেমি অব আর্টস থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। সেখানে তিনি বিখ্যাত শিল্পী ইয়েগিশে তাদেভোস্যার এবং ল্যান্সেরের অধীনে শিল্পকলার দীক্ষা নেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি প্রথমে ‘পেলকিনো’ এবং পরবর্তীতে ‘ওডেসা ফিল্ম স্টুডিওতে’ একজন অ্যানিমেটর বা কার্টুনিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ১৯৩১ সালে তিনি স্থায়ীভাবে মস্কোতে চলে আসেন।

পলিটব্যুরোর এক নম্বর ব্রাশ

দিমিত্রি নালবান্দিয়ানের আঁকা বিখ্যাত ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম ‘দ্য গ্রেট ফ্রেন্ডশিপ’ (১৯৫১), যেখানে সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন এবং চীনের মাও সেতুং-এর বৈঠক ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই কাজের জন্য তিনি স্তালিন পুরস্কার পান।

দিমিত্রি নালবান্দিয়ান মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের জাঁকজমকপূর্ণ অফিসিয়াল প্রতিকৃতি তৈরির মাস্টার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্থানীয় বহু নেতার প্রতিকৃতি বা পোর্ট্রেট এঁকেছেন, যাদের মধ্যে জোসেফ স্টালিন, নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং লিওনিদ ব্রেজনেভ অন্যতম। সোভিয়েত শাসকগোষ্ঠীর এত কাছাকাছি থেকে তাদের নিখুঁত ছবি আঁকার কারণে সমসাময়িক শিল্পীদের মাঝে তিনি রসিকতা করে “পলিটব্যুরোর এক নম্বর ব্রাশ” (Politburo’s Brush No. 1) নামে পরিচিত ছিলেন।

১৯৭৮ সালে আর্মেনীয় সংস্কৃতির বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নিয়ে আঁকা তাঁর বিখ্যাত দলগত প্রতিকৃতি “ভের্নাতুন”-এর জন্য দিমিত্রি নালবান্দিয়ানকে সোভিয়েত একাডেমি অব আর্টসের স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, তিনি ১৯৫৩ সাল থেকেই এই একাডেমির একজন সম্মানিত সদস্য (একাডেমিশিয়ান) ছিলেন।

জীবনাবসান ও উত্তরাধিকার

১৯৯৩ সালের ৩ জুলাই মস্কোতে তীব্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দিমিত্রি নালবান্দিয়ান শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মস্কোর বিখ্যাত নভোদেলিয়েন কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

মৃত্যুর এক বছর আগে, তিনি তাঁর নিজের তৈরি শিল্পকর্মের একটি বিশাল অংশ মস্কো শহরকে উপহার হিসেবে দান করে যান। তাঁর এই উপহারের ওপর ভিত্তি করেই রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর সরকার “সোভিয়েত ইউনিয়নের পিপলস আর্টিস্ট দিমিত্রি নালবান্দিয়ানের মিউজিয়াম-স্টুডিও” প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তীতে শিল্পীর বোন মার্গারিটা নালবান্দিয়ান তাঁর ভাইয়ের আরও কিছু চমৎকার কাজ এই সংগ্রহশালায় যুক্ত করেন। বর্তমানে এই মিউজিয়াম-স্টুডিওটি মস্কোর বিখ্যাত “মানেজ” (Manege) মিউজিয়াম অ্যান্ড এক্সিবিশন অ্যাসোসিয়েশনের একটি অন্যতম প্রধান অংশ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

আরো পড়ুন

📚 তথ্যসূত্র ও টীকা (References & Notes)

১. রচনা ও প্রকাশকাল সংক্রান্ত টীকা: এই গবেষণাধর্মী প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম আজ ১০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বর্তমান ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment