১৮৮৮ সালের সংস্করণের মুখবন্ধ[১]
১৮৫৯ সালে বার্লিন থেকে প্রকাশিত ‘অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ নামক গ্রন্থের ভূমিকায় মার্কস বলেছেন, ১৮৪৫ সালে ব্রাসেলসে ‘জার্মান দর্শনের ভাবাদর্শগত মতামতের বিরুদ্ধে আমাদের বক্তব্যটি’, অর্থাৎ ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা, যা প্রধানত মার্কসেরই রচনা, ‘আমরা যুক্তভাবে প্রস্তুত করব, বস্তুতপক্ষে, আমাদের এতদিনকার দার্শনিক বিবেকবুদ্ধির সঙ্গে হিসাব নিকাশ মিটিয়ে নেব’ বলে স্থির করেছিলাম। ‘আমাদের এই সংকল্প কাজে পরিণত হলো হেগেল-পরবর্তী দর্শনের সমালোচনারূপে। অক্টাভো-আকারের দুই বৃহৎ খণ্ডে এই পাণ্ডুলিপিটি ওয়েস্টফালিয়ায় প্রকাশকেন্দ্রে পৌঁছে যাওয়ার অনেকদিন পরে আমরা খবর পেলাম যে, পরিবর্তিত অবস্থার দরুন লেখাটির মুদ্রণ সম্ভব নয়। পাণ্ডুলিপিটিকে মুষিকের দস্তুর সমালোচনার কবলেই ছেড়ে দেওয়া গেল সাগ্রহেই, কারণ আমাদের প্রধান যে উদ্দেশ্য, নিজেদের ধারণাকে স্বচ্ছ করা, সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়েছিল।’
তারপর চল্লিশ বছরের বেশি কেটে গিয়েছে, মার্কস মারা গিয়েছেন, এবং আমাদের দুজনের মধ্যে কেউই এই বিষয়ে প্রত্যাবর্তন করবার সুযোগ পাই নি। নানা প্রসঙ্গে আমরা হেগেলের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছি; কিন্তু কোথাও সামগ্রিক ও ধারাবাহিকভাবে নয়। এবং ফয়েরবাখের প্রসঙ্গে আমরা একবারও প্রত্যাবর্তন করি নি, যদিও সব সত্ত্বেও হেগেল-দর্শন ও আমাদের চিন্তাধারার মধ্যে নানা দিক থেকে তিনিই হলেন অন্তর্বর্তী যোগসূত্র।
ইতিমধ্যে জার্মানি ও ইউরোপের সীমানার বাইরে বহুদূর পর্যন্ত, পৃথিবীর সমস্ত সাহিত্যিক ভাষায় মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গির অনুগামীরা দেখা দিয়েছেন। অপরপক্ষে বিদেশে বিশেষত ইংল্যান্ড ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় চিরায়ত জার্মান দর্শন যেন একধরনের পুনর্জন্ম লাভ করছে এবং এমনকি জার্মানিতেও বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের নামে যে কাঙালী ভোজনের একলেক্টিক খিচুড়ি পরিবেশন করা হয় সে সম্বন্ধেও লোকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে হয়।
এই পরিস্থিতিতে হেগেল-দর্শনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বিষয়ে কীভাবে আমরা এই দর্শন থেকেই যাত্রা করেছি এবং কী করে তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি, সে বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ও প্রণালীবদ্ধ বিবরণীর প্রয়োজনীয়তা আমি ক্রমশই বেশি করে অনুভব করছিলাম। সেই সঙ্গে আমি অনুভব করছিলাম, আমাদের ঝড়-ঝাপটার দিনে [২] আমাদের উপর হেগেলোত্তর অন্যান্য দার্শনিকদের তুলনায় ফয়েরবাখের যে প্রভাব, সেটার পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি না দিলে আমাদের মর্যাদার ঋণ অপরিশোধিত থাকে। তাই Neue Zeit [৩] পত্রিকার সম্পাদক যখন ফয়েরবাখ সম্বন্ধে স্টার্কে রচিত গ্রন্থটি সমালোচনা করবার অনুরোধ জানালেন, তখন আমি তা সাগ্রহে স্বীকার করলাম। উক্ত পত্রিকার ১৮৮৬ সালের চতুর্থ ও পঞ্চম সংখ্যায় আমার লেখা প্রকাশিত হয় এবং বর্তমানে আমার সংশোধনায় তাইই স্বতন্ত্র পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হচ্ছে।
এ লেখা ছাপাখানায় পাঠাবার আগে আমি ১৮৪৫-১৮৪৬ সালের সেই পুরনো পাণ্ডুলিপিটি[৪] খুঁজে বের করেছি এবং আরেকবার পড়ে দেখেছি। তাতে ফয়েরবাখ সংক্রান্ত অংশটি অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছে। সে পাণ্ডুলিপির সমাপ্ত অংশটি হলো ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা এবং তাতে শুধু এই প্রমাণ হয় যে, তখনো পর্যন্ত আমাদের অর্থনৈতিক ইতিহাসের জ্ঞান কত অসম্পূর্ণ ছিল। ফয়েরবাখের আসল মতবাদের কোনো সমালোচনা এতে নেই; অতএব বর্তমান উদ্দেশ্যে তা ব্যবহারোপযোগী নয়। অপরপক্ষে, মার্কসের একটি পুরনো খাতায় ফয়েরবাখ সম্বন্ধে এগারোটি থিসিস[৫] খুঁজে পেয়েছি; সেগুলি এখানে পরিশিষ্ট হিশেবে প্রকাশিত হলো। ভবিষ্যতে বিশদ সংরচনের জন্য তিনি এই নোটগুলি তাড়াহুড়োয় লিখে রেখেছিলেন, মোটেই প্রকাশের জন্য নয়। কিন্তু নতুন বিশ্বদৃষ্টির প্রতিভাদীপ্ত ভ্রুণসত্তার প্রথম দলিল হিশেবে এগুলি অমূল্য।
লন্ডন, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮৮
ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস[৬]
আরো পড়ুন
- ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ ও ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের অবসান
- ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের সমালোচনা: মার্কসবাদের তাত্ত্বিক উৎস এবং এঙ্গেলসের ঐতিহাসিক মুখবন্ধ
- মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির ভূমিকা এক যুদ্ধরত পার্টি বৈশিষ্ট্যধারী শ্রেণি-বিজ্ঞান
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৪) — জাতীয় ঐক্যের সংগঠন
- মার্কসবাদ এবং শোধনবাদ
- মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান
- মার্কসবাদ প্রসঙ্গে
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- দ্বন্দ্ববাদের উদাহরণ
- মার্কসবাদ ও অভ্যুত্থান
- বিশ্বজুড়ে মার্কসবাদ, মুক্তি কোন পথে
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- শ্রেণি উদ্ভব হবার কারণ ও বিলুপ্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ
- বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদ
- রাষ্ট্র হচ্ছে শ্রেণি শোষণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- বস্তুবাদ ও ভাববাদ হচ্ছে দুটি পরস্পরবিরোধী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান প্রসঙ্গে একটি আলোচনা
- মার্কসবাদী দর্শন-এর একটি সাধারণ রূপরেখা
- মার্ক্সবাদ প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিযুদ্ধের হাতিয়ার ও তাদের মুক্তির মতবাদ
- ভ্যানগার্ডবাদ বা ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- পুঁজিপতিরা কীভাবে তাদের মুনাফা গোপন করে
- বলশেভিকবাদ রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাষ্ট্রশাসন প্রণালীর বিপ্লবী মার্কসবাদী ধারা
- শ্রেণিহীন সমাজ হচ্ছে এমন সমাজ যেখানে কেউ সামাজিক শ্রেণিতে থাকে না
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্ক প্রসঙ্গে মার্কসীয় অর্থশাস্ত্রের বিশ্লেষণ
- ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ ও ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের অবসান
- ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের সমালোচনা: মার্কসবাদের তাত্ত্বিক উৎস এবং এঙ্গেলসের ঐতিহাসিক মুখবন্ধ
- ধ্রুপদীবাদ বা ক্লাসিসিজম কী? শিল্পকলার শাশ্বত ধ্রুপদী ঐতিহ্যের স্বরূপ ও বিবর্তন
- ধ্রুপদী রাজনৈতিক দর্শন: সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা এবং প্রাচীন গ্রিসের বীজতলা
- এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব ও কাব্যতত্ত্ব: অনুকরণ, ট্র্যাজেডি ও ক্লাসিক-রোমান্টিক রীতির বিশ্লেষণ
- নব্য ধ্রুপদী বা নিওক্লাসিকাল সাহিত্য ইউরোপীয় সাহিত্যে উদ্ভূত বিশেষ ধারার সাহিত্য
- নব্য ধ্রুপদীবাদ শিল্প ও সাহিত্য আন্দোলন যা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিল্পের অনুসরণ করে
- মহাকবি কালিদাস ছিলেন একজন ধ্রুপদী সংস্কৃত লেখক
তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ ও ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের অবসান গ্রন্থের রচিত ভূমিকার কথা বলা হচ্ছে।
২. ‘ঝড়-ঝাপটা’ ১৮শ শতকের ৮ম-৯ম দশকের জার্মান বার্গারদের সাহিত্যিক আর সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলনটি ছিল সামন্ত-স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জার্মানির নবীন লেখকদের একটি স্বকীয় সাহিত্যিক বিদ্রোহ।
৩. Die Neue Zeit (‘নব কাল’) – জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক পার্টি’র তাত্ত্বিক পত্রিকা; স্টুটগার্টে ১৮৮৩ সাল থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়। ১৮৮৫-১৮৯৪ সালে এঙ্গেলস এতে তাঁর বহু প্রবন্ধ প্রকাশ করেন।
৪. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস রচিত ‘জার্মান মতাদর্শ’ গ্রন্থ
৫. ফয়েরবাখ সম্বন্ধে থিসিসিসমূহ
৬. ১৮৮৮ সালে স্টুটগার্টে প্রকাশিত ‘ল্যুডভিগ ফয়েরবাখ ও ধ্রুপদী জার্মান দর্শনের অবসান’ গ্রন্থের স্বতন্ত্র সংস্করণের জন্য ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক লিখিত এবং মূল গ্রন্থের পাঠ অনুসরণে মুদ্রিত জার্মান থেকে ইংরেজি অনুবাদের ভাষান্তর থেকে প্রগতি প্রকাশন কর্তৃক অনূদিত। এখানে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশের সময় সাম্প্রতিক বানান ও শব্দচয়ন করা হয়েছে।
কার্ল মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (২৮ নভেম্বর, ১৮২০ – ৫ আগস্ট ১৮৯৫) ছিলেন জার্মান বিপ্লবী, দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো হচ্ছে “পবিত্র পরিবার” (১৮৪৪), “ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা” (১৮৪৫) “এ্যান্টি-ডুরিং” (১৮৭৮) “প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা (১৮৮৩), “পরিবার ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি” (১৮৮৪) প্রভৃতি। ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার”।