জর্জ বার্নার্ড শ-এর নাট্য রচনার বিষয়, বৈশিষ্ট্য ও নাট্যভাবনা

ইংরেজি সাহিত্যের নাট্যমঞ্চে জর্জ বার্নার্ড শ (George Bernard Shaw) এক অনন্য ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ের নাম। প্রায় গোটা একটা শতাব্দী ধরে বার্নার্ড শ এই পৃথিবীতে বেঁচেছিলেন, মানব সমাজকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন, এর মনস্তত্ত্ব বুঝেছিলেন এবং নিজের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতিতে এবং তাঁর নিজের দেশ আয়ারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের রাজনীতিতে, সমাজে যা কিছু পটপরিবর্তন ঘটেছে—তা তিনি নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে তিনি নিজের মনের ভেতর একটি সুনির্দিষ্ট মতাদর্শ গড়ে তুলেছিলেন এবং সেই মতাদর্শের ভিত্তির ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েই তিনি তাঁর কালজয়ী নাটকগুলো রচনা করেছিলেন।

রাজনৈতিক মতাদর্শ: ফেবিয়ান সমাজতন্ত্র ও স্ববিরোধিতা

রাজনীতিতে বার্নার্ড শ ছিলেন একজন কট্টর সোশ্যালিস্ট বা সমাজতন্ত্রী। তবে এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে যে, তিনি সমাজতন্ত্রী হলেও কোনোভাবেই কমিউনিস্ট (Marxist Communist) ছিলেন না। সমাজ পরিবর্তনের ডাক দিলেও মার্কসীয় বৈপ্লবিক তত্ত্বের ওপর তাঁর আস্থা ছিল না।

শ-এর এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কার্ল মার্কসের সহযোদ্ধা ও বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels) একটি অত্যন্ত চমৎকার ও তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছিলেন। এঙ্গেলসের ভাষায়:

“সাহিত্যের রহস্যময় মানুষ শ লেখক হিসাবে বুদ্ধিদীপ্ত বাক্যরসিক এবং অত্যন্ত প্রতিভাবান; কিন্তু অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদ হিসাবে একবারে অপদার্থ, যদিও তিনি সৎ এবং নিঃস্বার্থপর।”

এঙ্গেলসের মন্তব্যের যথার্থতা ও শ-এর সীমাবদ্ধতা

গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এঙ্গেলসের এই মন্তব্যটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য ছিল। কারণ, শ-এর বাস্তব সমাজ সংস্কারের যে কর্মসূচী—যা মূলত বিবর্তনিক ফেবিয়ান তত্ত্ব (Fabianism) এবং ধীর সংস্কারের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল—তা ছিল নেহাতই অবাস্তব ও কাল্পনিক। এই ফেবিয়ান মোহ বা ধীরগতির সংস্কারবাদী চিন্তা নাট্যকারের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার দিগন্তকে এক প্রকার সংকীর্ণ করে ফেলেছিল।

এই তত্ত্বের মোহে অন্ধ হয়ে তিনি ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এবং সামাজিক উন্নতি ও প্রগতির প্রশ্নে জনগণের মূল নেতৃত্ব দেওয়ার ভূমিকাকে ভুল বুঝেছিলেন। অর্থাৎ, সমাজ ও ইতিহাসের চাকাকে ঘুরিয়ে দেওয়ার পেছনে সাধারণ খেটে খাওয়া জনগণের যে একটা বিরাট ও ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে, তা বার্নার্ড শ উপলব্ধি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন।

একইভাবে, অর্থনীতি সম্বন্ধেও তাঁর ধারণা খুব একটা সুস্পষ্ট ছিল না। তিনি একদিকে যেমন ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার আসল শোষণের স্বরূপকে পুরোপুরি ধরতে পারেননি, তেমনি রাষ্ট্রের ও সমাজের প্রধান দুটি শ্রেণী (শোষক ও শোষিত)-র মধ্যকার মৌলিক দ্বন্দ্বের গভীরতাকেও বুঝতে পারেননি। অর্থনীতি সম্বন্ধে তাঁর ধারণা যদি সত্যিকার অর্থেই সুস্পষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত হতো, তাহলে রাজনীতিতে তিনি কখনো কাল্পনিক ফেবিয়ান সমাজতন্ত্রী হতেন না। আর এই কারণেই তিনি যেমন মার্কসীয় দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদকে গ্রহণ করেননি, তেমনি বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বকেও পুরোপুরি স্বীকার করেননি।

শ-এর দার্শনিক ভাবনা: ইচ্ছাশক্তি ও প্রাণশক্তি (Life Force)

বার্নার্ড শ সমাজের আমূল পরিবর্তন চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই পরিবর্তন কীভাবে আসবে—তা নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু দার্শনিক তত্ত্ব ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজের এই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঈশ্বর এনে দেবে না, কিংবা কোনো সশস্ত্র শ্রেণী সংঘর্ষ বা রক্তাক্ত বিপ্লবের ফলেও তা ঘটবে না; বরং তা ঘটবে প্রধানত মানুষের ভেতরের অদম্য ইচ্ছাশক্তির (Willpower) কারণে।

এই ইচ্ছাশক্তিকে তিনি মানুষের ভেতরের ‘প্রাণশক্তি’ বা ‘লাইফ ফোর্স’ (Life Force) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শ-এর মতে, এই প্রাণশক্তির প্রকাশই আদিম যুগে মানুষকে বানর-মানুষ (Ape-man) থেকে মুক্ত করে আজকের আধুনিক মানুষে রূপান্তরিত করেছে এবং এই একই প্রাণশক্তিই আগামীদিনে মানুষকে আরও উন্নত করে এক পরম ‘মহামানব’ বা ‘অতিমানব’ (Superman)-এ উন্নীত করবে।

🔗 আরো পড়ুন: জর্জ বার্নার্ড শ-এর জীবনী: জীবন সংগ্রাম, নোবেল ও বিখ্যাত নাটকসমূহের তালিকা 🖋️

ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে চরিত্র গঠন

শ মনে করতেন, মানুষের ভেতরের এই ইচ্ছাশক্তিই সমাজকে কলুষমুক্ত করতে পারে, মানুষকে পরিশুদ্ধ করতে পারে এবং মানবতাকে এক পরম মহত্ত্বে উন্নীত করতে পারে। মানুষ যদি নিজে থেকে আন্তরিকভাবে ইচ্ছা করে, তবে সে নিজেকে মহৎ ও সুন্দর করে গড়ে তুলতে পারে। এখানে বাহ্যিক কোনো শক্তির চেয়ে মানুষের ভেতরের ‘ইচ্ছাটাই’ হল প্রধান চালিকাশক্তি। এই তত্ত্বকে বোঝাতে শ নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে একটি মজাদার উদাহরণ দিয়ে বলেছেন:

“জিরাফ যদি নিজে চেষ্টা করে (গাছের উচুঁ পাতা খাওয়ার জন্য) বিবর্তনের মাধ্যমে নিজের ঘাড়টা বাড়াতে পারে, তাহলে মানুষও ইচ্ছা করলে নিজের চেষ্টা ও সাধনার দ্বারা তার চরিত্র উন্নত করতে পারে।”

বর্তমান যুগের এই ব্যাধিগ্রস্ত, দুর্নীতিগ্রস্ত ও নীতিহীন সমাজকে মুক্ত করে পৃথিবীকে যদি সত্যিকার অর্থেই স্বর্গে পরিণত করতে হয়, তবে মানুষকে সর্বাগ্রে ভালো হতে হবে; আর তা হতে হবে নিজের ইচ্ছাশক্তির প্রেরণা ও উদ্দেশ্যের প্রাণশক্তিতে উদ্বুদ্ধ হয়ে। এই প্রসঙ্গে শ-এর একটি বিখ্যাত বক্তব্য বিশেষভাবে স্মরণীয়:

“You must admit that unless we are replaced by a more highly evolved animal—in short, by the Superman—the world must remain a den of dangerous animals.”
(তোমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা উন্নততর কোনো প্রাণী—সংক্ষেপে, অতিমানবের দ্বারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছি, ততক্ষণ এই বিশ্বটা কেবল একদল বিপজ্জনক প্রাণীর আস্তানা বা খাঁচা হয়েই থাকবে।)

প্লেটো, নীৎসে ও বের্গস-এর প্রভাব

শ-এর এই নাট্যভাবনা বা জীবনদর্শন কিন্তু বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদী (Scientific Materialism) ভাবনা থেকে অনেক দূরে ছিল। বরং যুগের সাথে সাথে তিনি ক্রমশ গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর আদর্শবাদী ভাবনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এছাড়া জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ার এবং ফ্রিডরিশ নীৎসের ‘সুপারম্যান’ বা অতিমানব তত্ত্বের প্রভাব থেকেও তিনি মুক্ত ছিলেন না। সমসাময়িক কালের অনেক মনীষীর ভাবনাই শ-এর চিন্তার জগতকে আলোড়িত করেছিল, যার মধ্যে ফরাসি দার্শনিক হেনরি বের্গস-এর (Henri Bergson) বিখ্যাত ‘প্রাণশক্তি তত্ত্ব’ বা ‘এলান ভাইটাল’ (Élan Vital)-এর প্রতি তাঁর অন্ধ সমর্থন ছিল অন্যতম।

যাই হোক না কেন, সমস্ত স্ববিরোধিতা সত্ত্বেও বার্নার্ড শ ছিলেন মূলত একজন কট্টর মানবতাবাদী পিউরিটান (Puritan)। এই দুর্ধর্ষ মানবতাবাদীর ভাবনার জগত নানা তাত্ত্বিক স্ববিরোধিতায় আচ্ছন্ন থাকলেও, শ মনে-প্রাণে তৎকালীন প্রচলিত বৈষম্যমূলক সমাজ ও শোষক রাষ্ট্রব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি যেকোনো ধরনের সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় উৎপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, আইরিশ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তৎকালীন ব্রিটিশ বা ইংল্যান্ডের শ্বেতাঙ্গ সরকারের অমানবিক নির্যাতন ও দমনমূলক ব্যবস্থাকে তিনি তাঁর লেখায় তীব্র ভাষায় ধিক্কার ও নিন্দা জানিয়েছিলেন।

সমাজ ও রাষ্ট্রের এই নির্মম রূপ দেখে তাঁর সংবেদনশীল হৃদয় গভীরভাবে আহত হয়েছিল এবং এক ধরণের তিক্ততায় ভরে উঠেছিল। আর এই আহত চিত্ত ও তিক্ত মন নিয়েই তিনি সমসাময়িক রাজনীতি, ত্রুটিপূর্ণ অর্থনীতি, অন্ধ ধর্ম দর্শন এবং কপট নৈতিকতাকে তাঁর লেখনীর ব্যঙ্গের প্রচণ্ড কশাঘাতে জর্জরিত করেছেন। সমাজের উচ্চবিত্ত ও শাসকদের কপট চরিত্র এবং আসল রূপকে তিনি একদম নগ্ন ও উলঙ্গ করে সবার সামনে ছেড়ে দিয়েছেন।

অবশ্য বার্নার্ড শ-এর এই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের (Satire) কৌশল বা পদ্ধতি কোনো স্থূল বা সস্তা রসিকতা ছিল না; তা ছিল বুদ্ধির দীপ্তিতে অত্যন্ত প্রখর এবং মার্জিত। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় এই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের নীতি পদ্ধতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া শ-এর কাছে অন্য কোনো বিকল্প উপায়ও ছিল না। কারণ, বার্নার্ড শ তাঁর যুগের শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের পক্ষে কথা বলার এক মহান অঙ্গীকার ও প্রতিজ্ঞা নিয়েই নাট্যমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন:

“যখন সর্বক্ষেত্রে সাধারণ জনগণ চরম দুর্গতিতে ভুগছে এবং অনাহারে দিন কাটাচ্ছে, এবং এসব সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঝড় তোলার জন্য যখন সহৃদয় মানুষের তীব্র অভাব, তখন সমাজের মহৎ শিল্পীদেরই সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে হবে।”

শ-এর নাট্য রচনার তিনটি মূল স্তম্ভ

বার্নার্ড শ-এর নাটক নাটকীয় কলাকৌশল ও কাঠামোর দিক থেকে সনাতনী নাটক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তাঁর নাট্যরীতির মূল ভিত্তি ছিল তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য: রিয়েলিজম (Realism), অ্যান্টি-রোমান্টিসিজম (Anti-Romanticism) এবং ড্রামা অব আইডিয়াস (Drama of Ideas)। নিচে এই তিনটি স্তম্ভের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হলো:

শ-এর নাট্যরীতির প্রধান তিনটি স্তম্ভ

রিয়েলিজমঅ্যান্টি-রোমান্টিসিজমড্রামা অব আইডিয়াস
(Social Realism)(Anti-Romantic)(Drama of Ideas)

১. রিয়েলিজম বা সামাজিক বাস্তবতাবাদ (Realism)

বার্নার্ড শ নাট্যমঞ্চকে কেবল সস্তা বিনোদন বা রূপকথার জগত বানাতে চাননি। নরওয়েজিয়ান নাট্যকার হেনরিক ইবসেনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নাটকে ‘রিয়েলিজম’ বা কঠোর সামাজিক বাস্তবতাবাদ আমদানি করেন। তিনি সমাজের অন্ধ অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথের বাস্তব জীবনের কাহিনী ও নগ্ন সত্যকে তাঁর নাটকের মূল বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।

  • উইডোয়ার্স হাউসেস (Widowers’ Houses): এই নাটকে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে শহরের অভিজাত ও পুঁজিপতি বাড়িওয়ালারা বস্তির চরম দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের ওপর নির্মম শোষণ ও নির্যাতন চালায়। এটি ছিল পুঁজিবাদী শোষণের এক বাস্তব দলিল।
  • মিসেস ওয়ারেনস প্রফেশন (Mrs. Warren’s Profession): এখানে শ তৎকালীন ভিক্টোরিয়ান সমাজের ভণ্ডামিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পতিতাবৃত্তির (Prostitution) মতো একটি চরম বাস্তব ও স্পর্শকাতর বিষয়কে মঞ্চে নিয়ে আসেন এবং দেখান যে এর পেছনে আসল দায়ী সমাজের অর্থনৈতিক অসমতা।

২. অ্যান্টি-রোমান্টিসিজম বা কৃত্রিম আবেগের বিরোধিতা (Anti-Romanticism)

ভিক্টোরিয়ান যুগের নাটকগুলো যখন অতি-রোমান্টিকতা, অবাস্তব প্রেম এবং যুদ্ধের মিথ্যা বীরত্বগাথায় মগ্ন ছিল, বার্নার্ড শ তখন তাঁর অ্যান্টি-রোমান্টিসিজম (Anti-Romanticism) বা রোমান্টিকতা-বিরোধী চেতনা নিয়ে আঘাত হানেন। তিনি মনে করতেন, রোমান্টিক অবাস্তব কল্পনা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

  • আর্মস অ্যান্ড দি ম্যান (Arms and the Man): এই নাটকে তিনি যুদ্ধ এবং প্রেমের তথাকথিত ‘রোমান্টিক’ ও কাল্পনিক ধারণাকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেছেন। যুদ্ধের মাঠে বীরত্ব যে আসলে কোনো রোমান্টিক বিষয় নয়, বরং জীবন বাঁচানোর এক নিষ্ঠুর লড়াই—তা তিনি চকলেট-প্রেমী সৈনিক ব্লাশিলির চরিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
  • ক্যানডিডা (Candida) ও দি ম্যান অব ডেসটিনি (The Man of Destiny): এই নাটকগুলোতেও তিনি সমাজের বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার চেয়ে মানুষের মনের ভেতরকার অতি-রোমান্টিক অসঙ্গতিগুলি এবং সেই অবাস্তব মোহের বিরুদ্ধে মানুষের বাস্তব সংগ্রামের চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে অংকন করেছেন।

৩. ড্রামা অব আইডিয়াস বা ধারণার নাটক (Drama of Ideas)

বার্নার্ড শ-এর নাট্যরীতির সবচেয়ে বড় এবং প্রধান আবিষ্কার হলো ‘ড্রামা অব আইডিয়াস’ (Drama of Ideas) বা ‘ভাবনাশ্রয়ী নাটক’। প্রথাগত নাটকে যেখানে টানটান উত্তেজনা, মারপিট বা মেলোড্রামা থাকত, শ-এর নাটকে সেখানে প্রাধান্য পায় বিভিন্ন মতবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক তর্ক-বিতর্ক। তাঁর নাটকের চরিত্ররা মঞ্চে এসে একে অপরের সাথে দর্শন, রাজনীতি ও সমাজনীতি নিয়ে গভীর আলোচনা ও বিতর্কে লিপ্ত হতো।

  • ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান (Man and Superman): বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে তিনি যে সমস্ত নাটক রচনা করেছেন, তার মধ্যে এটি সর্বশ্রেষ্ঠ। এই নাটকটি শ-এর ‘ড্রামা অব আইডিয়াস’-এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এখানে প্রেম, বিবাহ, সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্র এবং জীবনের গভীর দার্শনিক ভাবনা বা প্রাণশক্তি নিয়ে চরিত্রদের মধ্যে এক দীর্ঘ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা স্থান পেয়েছে।

বিভিন্ন নাটকে পিউরিটানিজম ও ধর্মীয় কপটতার মুখোশ উন্মোচন

বার্নার্ড শ তাঁর নাটকের মাধ্যমে সমাজের পবিত্রতার ছদ্মবেশধারী কপট ও ভণ্ড ব্যক্তিদের মুখোশ অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে খুলে দিয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী নাটকগুচ্ছ বা “Three Plays for Puritans”-এর মধ্যে রয়েছে:

  1. দি ডেভিলস ডিসাইপল (The Devil’s Disciple – শয়তানের শিষ্য)
  2. সিজার এবং ক্লিওপেট্রা (Caesar and Cleopatra)
  3. ক্যাপ্টেন ব্রাসবাউন্ডস কনভারশন (Captain Brassbound’s Conversion)

এই নাটকগুলোতে তিনি মানুষের অনুভূতির স্থূলতা, স্বার্থপরতা ও তুচ্ছতার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ধর্মের নামে সমাজে কপটতা ছড়ানো হয়। এই নাটকগুলোর মাধ্যমে তিনি পিউরিটানিজমের ওপর এক নতুন প্রগতিশীল আলোকপাত করেন এবং অন্য কোনো দুর্বল জাতিকে কেবল নিজেদের স্বার্থে পদানত করে রাখার জন্য যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ—তার বিরুদ্ধে লেখনীর মাধ্যমে তীব্র ব্যঙ্গ ছুড়ে দেন।

অন্যান্য নাটকের বিষয়বস্তু

  • অ্যান্ড্রোক্লিস এবং লায়ন (Androcles and the Lion): এই নাটকে শ তৎকালীন প্রচলিত খ্রিস্টান ধর্মের একশ্রেণীর যাজক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেতরের ভণ্ডামির মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলেছেন।
  • ব্যাক টু মেথুসেলা (Back to Methuselah): এটি একটি মহাকাব্যিক নাটক, যেখানে ইতিহাসের শুরু থেকে সুদূর ভবিষ্যতের কাল পর্যন্ত মানব সভ্যতার ও মানবতার ক্রমপরিবর্তন এবং বিবর্তনের এক কাল্পনিক ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে।
  • সেন্ট জোয়ান (Saint Joan): এই নাটকে তিনি ঐতিহাসিক চরিত্র জোয়ান অব আর্কের অদম্য ব্যক্তিত্ব, দেশের প্রতি ত্যাগ এবং পরবর্তীতে ধর্মের ও রাজনীতির ধ্বজাধারী নেতাদের ভণ্ডামির কারণে তাঁর যে করুণ ও নির্মম মৃত্যু—তা তুলে ধরে সমাজের বিচারব্যবস্থাকে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন।

শ-এর নাট্যরীতির সীমাবদ্ধতা ও চরিত্র সৃষ্টিতে প্রভাব

বার্নার্ড শ মূলত তাঁর নিজের যুগের সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমসাময়িক বিশেষ বিশেষ সমস্যা (Particular Issues) নিয়ে নাটকের কাহিনী রচনা করতে ভালোবাসতেন। তবে এই বিশেষ কোনো একটি সমস্যা বা বস্তুকে নিয়ে অতিরিক্ত কারবার বা মেতে থাকার কারণে, তিনি সেই বিশেষকে সার্বজনীন বা ‘নির্বিশেষ’ (Universal) করে তুলতে অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছেন।

এর ফলে যা হয়েছে তা হলো—তাঁর নাটকগুলো তাঁর নিজের ভাবনার একটি নির্দিষ্ট ছকে বা ফ্রেমে আটকে পড়েছে। তিনি সমাজকে যেভাবে দেখতেন, নাটকগুলো ঠিক সেই ভাবনার গণ্ডিতেই আবদ্ধ থেকেছে। সাহিত্যতত্ত্ব অনুযায়ী, কমেডি মাত্রই সমাজের কোনো নির্দিষ্ট বা ‘Particular’ বিষয়কে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়। কিন্তু বার্নার্ড শ-এর রচনায় সেই নির্দিষ্ট চরিত্রগুলোও খুব একটা স্বাধীনভাবে বা রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে প্রাধান্য পায়নি; বরং সেখানে প্রধান হয়ে উঠেছে নাট্যকারের নিজস্ব ‘ভাবনা’ বা ফিলোসফি।

অ্যাকশনের অভাব ও আলোচনার নাটক (Discussion Play)

যেহেতু শ-এর নাটকে চরিত্রের চেয়ে ‘ভাবনা’ বা আইডিয়াই প্রধান ছিল, তাই তাঁর নাটকগুলো চরিত্রপ্রধান না হয়ে ভাবনাশ্রয়ী বা আইডিয়া-প্রধান হয়ে উঠেছিল। নিজের মনের সেই গভীর ভাবনা ও সমাজদর্শনকে রূপ দিতে গিয়ে তিনি নাটকের ভেতরের আসল নাটকীয় চরিত্র এবং তাদের নানামুখী ক্রিয়াকলাপ বা অ্যাকশন (Action) সৃষ্টির ব্যাপারটায় বিশেষ একটা দৃষ্টি দিতে পারেননি বা দেননি।

এজন্যই তাঁর নাটকগুলোতে শারীরিক বা বাহ্যিক ঘটনার ঘনঘটা কম দেখা যায় এবং এর পরিবর্তে তাঁকে দীর্ঘ কথোপকথন ও আলোচনার আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছে। সমালোচকদের মতে, তাঁর নাটক কোনো “Philosophy of action” বা ঘটনার নাটক নয়; তাঁর নাটক মূলত “Discussion Play” বা আলোচনার নাটক।

আদর্শ নায়কের অভাব ও সংলাপের চমক

শ-এর নাটকে প্রথাগত কোনো ‘আদর্শ নায়ক’ বা পারফেক্ট হিরো (Hero) খুঁজে পাওয়া যায় না। তাঁর সৃষ্ট অধিকাংশ নায়ক চরিত্রই কোনো না কোনো চারিত্রিক ত্রুটি, অহংকার বা খামখেয়ালিপনার ধারক ও বাহক। ফলে এইসব অসম্পূর্ণ চরিত্রের মাধ্যমে তিনি তাঁর সম্পূর্ণ নতুন ও বৈপ্লবিক ভাবনাকে সবসময় নিখুঁতভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে পারেননি। বরং সমাজ ও থিয়েটারের স্বার্থে তিনি সামাজিক মন্দ ও চতুর ব্যক্তিদের চরিত্রই বেশি নিখুঁতভাবে অংকন করেছেন।

শ যেন সমাজের চারপাশে কোনো মহৎ বা পজিটিভ চরিত্র দেখতে পাননি, অথবা নাটকের খাতিরে তা সৃষ্টি করতে চাননি। তাঁর নাটকের বিখ্যাত চরিত্র যেমন—সারটোরিয়াস (Sartorius), আন্ডারশ্যাফট (Undershaft) কিংবা কাউচন (Cauchon)—এরা প্রত্যেকেই ছিল অত্যন্ত চতুর, বাস্তববাদী এবং প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন; কিন্তু একই সাথে তারা শয়তানি, ভণ্ডামি, নির্মমতা এবং সামাজিক কপটতায় অত্যন্ত সিদ্ধহস্ত ছিল। তাদের জীবনের একমাত্র মূল লক্ষ্যই ছিল সাধারণ ও নিরীহ মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের আখের গোছানো এবং মুনাফা অর্জন করা।

আজকের যুগে এসে বার্নার্ড শ-এর নাটকের সেই সমসাময়িক জৌলুস হয়তো কিছুটা স্তিমিত হয়েছে, কারণ যুগের সাথে সাথে সমস্যাগুলো বদলে গেছে। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন তাঁর নাটক থিয়েটার জগতে এক অভূতপূর্ব চমক ও আলোড়ন জাগিয়েছিল। আর এই চমক জাগানোর মূল চাবিকাঠি ছিল তাঁর নাটকের চমকপ্রদ সংলাপ (Dramatic Dialogues)। শ-এর নাটকের সংলাপগুলো ছিল আপাতবিরোধী বৈপরীত্য বা প্যারাডক্সের (Paradox) রহস্যময় আবরণে আবৃত। বুদ্ধির জাদুকরী কলাকৌশল ও তীক্ষ্ণতার দীপ্তিতে তাঁর সংলাপগুলো ছিল দারুণ চমকপ্রদ, যা সাধারণ বা অগভীর পাঠকদের সহজে বোধগম্য হতো না; তা বোঝার জন্য প্রখর বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হতো।

ট্র্যাজেডি রচনায় ব্যর্থতা ও শেক্সপীয়রের সাথে তুলনা

জর্জ বার্নার্ড শ তাঁর জীবনে অনেক কমেডি ও সামাজিক নাটক লিখলেও, তিনি কখনো একটি খাঁটি বা সফল ট্র্যাজেডি (Tragedy) রচনা করতে পারেননি। সাহিত্যিকদের একাংশের মতে, ট্র্যাজেডির পেছনের যে গভীর জীবন দর্শন—যেখানে মানুষের নিয়তি, বেদনা ও মহৎ পতন জড়িয়ে থাকে—তা শ তাঁর চটজলদি ব্যঙ্গাত্মক মানসিকতার কারণে ঠিকমতো উপলব্ধি করতে পারেননি।

তাছাড়া বার্নার্ড শ স্বভাবগতভাবে কিছুটা দাম্ভিক বা অহংকারী ছিলেন। তাঁর মনটা সবসময় এক ধরণের প্রবল অহংবোধে আচ্ছন্ন থাকত। আর এই তীব্র আত্মঅহংকার ও দম্ভের বশবর্তী হয়েই তিনি ইংরেজি সাহিত্যের সর্বকালের সেরা নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপীয়রকে (William Shakespeare) পর্যন্ত ব্যঙ্গ করতে ছাড়েননি। শেক্সপীয়রের জীবনের নৈরাশ্যবাদকে কটাক্ষ করে শ অহংকার করে নিজের সম্পর্কে বলতে পেরেছিলেন:

“জীবনটা আমার ক্ষেত্রে শেক্সপীয়রের মতো কোনো ‘ক্ষণস্থায়ী বাতি’ (Brief candle) নয়। এটা একটা অপূর্ব ও জ্বলন্ত মশাল, যেটা আমি বর্তমানে সগৌরবে ধরে রেখেছি এবং ভবিষ্যৎ বংশধরদের হাতে ওটা সমর্পণ করে দিয়ে যাবার আগে আমি চাই ওটা যেন আরও উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে জ্বলুক।”

সমালোচকদের দৃষ্টিতে শ-এর সীমাবদ্ধতা

বার্নার্ড শ শেক্সপীয়রকে নিয়ে যতই ব্যঙ্গ বা কটাক্ষ করুন না কেন, আধুনিক সাহিত্য সমালোচকদের মতে, এই ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে আসলে শেক্সপীয়রের অবমূল্যায়ন হয়নি, বরং শ-এর নিজেরই এক ধরণের অজ্ঞতা বা সাহিত্যের সংকীর্ণতা প্রকাশ পেয়েছে। সমাজের সবার ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং ভণ্ডামি বর্ণনা করতে করতে শ শেষ পর্যন্ত নিজের অজান্তেই নিজের সাহিত্যিক সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটিকেই বিশ্বের সামনে প্রকাশ করে ফেলেছেন।

আর এই তীব্র অহংবোধের কারণেই তিনি শেক্সপীয়রের সৃষ্ট ‘হ্যামলেট’ বা ‘কিং লিয়ার’-এর মতো কালজয়ী ও মহৎ ট্র্যাজিক চরিত্রগুলোর ভেতরের আসল মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা ও চিরন্তন স্বরূপকে মন থেকে উপলব্ধি করতে পারেননি। এমনকি সমসাময়িক বাস্তবতাবাদী নাটকের জনক ইবসেনের (Henrik Ibsen) নাটকের ভেতরের যে গূঢ় ট্র্যাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক সুর ছিল, তাও বার্নার্ড শ অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তিনি কেবল ইবসেনকে নিজের সমাজতান্ত্রিক প্রচারণার একটি মাধ্যম হিসেবেই দেখেছিলেন।

তবে এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনার ঊর্ধ্বে উঠেও এ কথা নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে যে, জর্জ বার্নার্ড শ ছিলেন তাঁর যুগের এক সাহসী কণ্ঠস্বর। ট্র্যাজেডি না লিখতে পারলেও, তাঁর ‘ড্রামা অব আইডিয়াস’ এবং ক্ষুরধার ব্যঙ্গাত্মক কমেডিগুলো ইংরেজি নাটকের গতিপথকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল, যা আজও বিশ্বজুড়ে সমানভাবে চর্চিত ও প্রশংসিত হয়।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. ড. শীতল ঘোষ, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, ফ্রেন্ডস বুক কর্নার, ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩২৪-৩২৭।
২. রচনা ও প্রকাশকাল সংক্রান্ত টীকা: এই প্রবন্ধটি আজ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বর্তমান ডিজিটাল সংস্করণের জন্য মূল তথ্যসূত্রসহ পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংস্কার ও উন্নত সংস্করণে রূপান্তর করা হলো।

Leave a Comment