হাসান ফকরী (জন্ম: ৭ অক্টোবর, ১৯৫২) বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক প্রদীপ্ত ও উজ্জ্বল নক্ষত্র। গভীর সাম্যবাদী রাজনৈতিক চেতনায় ঋদ্ধ ও দীপ্ত এই গুণী কবি, কালজয়ী গীতিকার, অনন্য নাট্যকার ও প্রথিতযশা প্রাবন্ধিক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে বাংলাদেশের গণমুখী সাহিত্যের ধারাকে পৌঁছে দিয়েছেন আপামর সাধারণ ও মেহনতি মানুষের একান্ত দোরগোড়ায়। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিশীল, মননশীল ও কালজয়ী কাজ আজ আমাদের অনেকের কাছেই গভীর শ্রদ্ধা, নিখাদ ভালোবাসা ও পরম অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
মাঝেমধ্যে স্মৃতির মণিকোঠায় যখনই তাঁর এই বিপ্লবী সত্তা ও অবদানের কথা পরম মমতায় ভেসে ওঠে, তখনই আমাদের মানসপটে সগৌরবে ভেসে ওঠে সেইসব অকুতোভয়, আপসহীন ও সাম্যবাদী মানুষের মুখচ্ছবি—যারা যুগ যুগ ধরে আজও শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ে এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে অবিশ্রাম ও নিরলস লড়াই করে চলেছেন। প্রগতিশীল চেতনার মহান পুরুষ হাসান ফকরী জীবনভর এক অকুতোভয় ও অপরাজেয় মানবিক চেতনার ধারক ছিলেন; জীবনের কোনো চরম প্রতিকূলতা কিংবা কারো ক্ষমতার করুণার কাছে তিনি কখনো সামান্যতম মাথানত করেননি।
স্রোতের বিপরীতে সাম্যের গান ও সাহিত্য সাধনা
তাঁর সেই আজন্ম আপসহীন ও নির্ভীক মানসিকতাই হয়তো যৌবনের উত্তাল ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ দিনগুলোতে道を প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী রাজনীতির একনিষ্ঠ পথে পরিচালিত করেছিল। সমাজ ও সময়ের এক সন্ধিক্ষণে যখন একদল সুবিধাবাদী তরুণ স্রেফ বৈষয়িক মোহের পেছনে অন্ধের মতো হন্যে হয়ে ছুটছিল, হাসান ফকরী তখন সেই আত্মসর্বস্ব স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাহসের সাথে গেয়েছেন মানুষের সাম্য ও মুক্তির জয়গান। সেই সুমহান আদর্শের অমোঘ টানেই তিনি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নিজ হাতে তুলে নিয়েছিলেন ক্ষুরধার কলম; যা কালক্রমে আমাদের বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ ও দেদীপ্যমান করেছে অসংখ্য কালজয়ী নাটক, গণসংগীত, দ্রোহের কবিতা ও মননশীল প্রবন্ধের যুগান্তকারী সম্ভারে।
হাসান ফকরী যখনই প্রগতিশীল আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তি ও শ্রেণিযুদ্ধের স্বপক্ষে সুদৃঢ় জনমত গঠনে সচেষ্ট হতেন, তখনই আন্দোলনের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একদল সুযোগসন্ধানী ও ‘ভুয়া-কমিউনিস্ট’-এর আবোল-তাবোল কথাবার্তা ও তাত্ত্বিক আস্ফালন তাঁর চোখে পড়ত। শোষক শ্রেণির সেই দালালরা মূলত অন্তঃসারশূন্য কথার মায়াবী জালে সাধারণ কর্মীদের সুবিধাবাদ আর ক্ষতিকারক সংশোধনবাদের এক গোলকধাঁধায় বিসর্জন দিতে চাইত। বিশেষ করে, যখনই তিনি শ্রমিক শ্রেণির বলিষ্ঠ নেতৃত্বে প্রকৃত গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জোরালো ও যৌক্তিক দাবি তুলতেন, তখন সেই ছদ্মবেশী ও নামধারী কমিউনিস্টদের তথাকথিত ‘প্রলেতারীয় একনায়কত্ব’ কিংবা ‘রাষ্ট্রক্ষমতা দখল’-এর বাস্তব ও বিপ্লবী কথা শুনলেই ভয়ে হাঁটুতে কাঁпуনি ধরত আর বুক কেঁপে পিলে চমকে যেত।
আদর্শের অবিচল পথ এবং গণলাইনের রাজনীতি
মহান বিপ্লবী হাসান ফকরী ছিলেন সেইসব কাপুরুষ, ভীরু ও সুবিধাবাদী হাঁটু-কাঁপা ভুয়া-কমিউনিস্টদের সুবিধাতান্ত্রিক চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য। তিনি সবসময় মনগড়া স্লোগানের চেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচী, বলিষ্ঠ ও সচেতন জনমত এবং জনগণের মুক্তির জন্য সত্যিকারের ‘গণলাইন’-কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে হয়তো সমকালীন রাজনীতির সেই উত্তপ্ত ময়দান আর ক্লান্তিহীন সাহিত্যচর্চার ব্যস্ততার দোলাচলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিটি সৃষ্টিশীল সাহিত্যকর্মে সেই সুমহান আদর্শের শতভাগ পূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো তাঁর পক্ষে সবসময় পুরোপুরি সম্ভব হয়ে ওঠেনি, তবুও তাঁর সাহিত্যিক প্রয়াস চিরকাল অনবদ্য ও অনন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে সমাদৃত।
ইউটিউবে দেখুন হাসান ফকরীর একটি কবিতা
গীতিকার হিসেবে হাসান ফকরী এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
গীতিকার হিসেবে হাসান ফকরীর ক্যারিয়ারে একটি অত্যন্ত স্মরণীয় ও মজার অধ্যায় রয়েছে, যা তাঁর জীবনের অন্যতম এক অনন্য মাইলফলক। তিনি তাঁর অসাধারণ ও অর্থবহ সৃষ্টির জন্য সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজী হায়াৎ পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা ‘চাঁদাবাজ’ ১৯৯৩ সালে তৎকালীন বিএনপির রাজনৈতিক দুঃশাসনামলে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এর ঠিক পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে যখন মর্যাদাপূর্ণ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘোষণা করা হয়, তখন এই সিনেমার অত্যন্ত জনপ্রিয় ও হৃদয়স্পর্শী ‘মুক্তিযোদ্ধা কোথায় তুমি’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ গীতিকারের গৌরবময় পুরস্কার লাভ করেন হাসান ফকরী। একই সাথে এই অবিস্মরণীয় গানটির দুর্দান্ত সুরকার ও প্রধান কণ্ঠশিল্পী আজাদ রহমানও যথাক্রমে শ্রেষ্ঠ সুরকার ও শ্রেষ্ঠ শিল্পীর জাতীয় পুরস্কার জিতে নেন, যা বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে।
বাংলা সংগীতের এই দুই কীর্তিমানের মেলবন্ধনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও গভীর ছিল। মূলত হাসান ফকরীর ক্ষুরধার লেখালেখির সূত্র ধরেই ঐতিহাসিক ১৯৬৯ সালের উত্তাল গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলো থেকে প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক এবং জনপ্রিয় সুরকার আজাদ রহমানের সাথে তাঁর এক আত্মিক পরিচয় ও গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের সেই চেনা-জানা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ পরবর্তীতে এক অবিচ্ছেদ্য পেশাদার সম্পর্কে রূপ নেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় ৩৫ বছর ধরে তাঁরা দুজনে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সার্বক্ষণিক ভাবে বিভিন্ন কালজয়ী সংগীত সৃষ্টিতে একসাথে কাজ করে গেছেন।
আজাদ রহমানের সাথে হাসান ফকরীর এই দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের পথচলা আমাদের সংগীতভাণ্ডারকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি প্রগতিশীল ও গণমুখী গানের ধারাকে চলচ্চিত্রের পর্দায় এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতি কেবল তাঁর গীতিকার সত্তার মূল্যায়ন ছিল না, বরং তা ছিল তাঁর আজীবন লালন করা চেতনার এক পরোক্ষ জয়।
হাসান ফকরীর কাব্যগ্রন্থ ও দ্রোহের কবিতা
কবি হিসেবে হাসান ফকরী তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে বাংলা কবিতার জগতে এক অনন্য ও স্থায়ী আসন তৈরি করে নিয়েছেন। সময়ের সাহসী উচ্চারণ ও মেহনতি মানুষের জীবনের দুঃখ-কষ্টকে তিনি কবিতার ছন্দে পরম মমতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর প্রকাশিত ও বহুল সমাদৃত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের নাম নিচে তুলে ধরা হলো:
- মুঠো মুঠো কান্না (১৯৭০) — স্বাধীনতা-পূর্বকালের এক অনন্য ও সংবেদনশীল কাব্য সংকলন।
- হাসান ফকরীর কবিতা ও গান (২০০২) — তাঁর কবি ও গীতিকার সত্তার এক চমৎকার মেলবন্ধন।
- দ্রোহের পাঁচালি (২০১৭) — অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও তীব্র প্রতিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ।
- দেশটা কী তোর বাপের (২০২০) — সমকালীন শোষণ ও ক্ষমতার দম্ভের বিরুদ্ধে এক সাহসী রাজনৈতিক চপেটাঘাত।
- নির্বাচিত কবিতা (২০২২) — তাঁর দীর্ঘ কবিজীবনের সেরা ও কালজয়ী কবিতাগুলোর একটি সমৃদ্ধ সংকলন।
‘দেশটা কি তোর বাপের’: প্রলেতারিয়েত বিপ্লব ও প্রতিরোধের নন্দনতত্ত্ব
হাসান ফকরীর বহুল আলোচিত ‘দেশটা কি তোর বাপের’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর শিরোনাম ও অভ্যন্তরীণ বুনন বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এর মূল কাব্যধারা মূলত কমিউনিস্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ, তীব্র শ্রেণীসংগ্রাম এবং রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের চেতনা দ্বারা গভীরভাবে চালিত। এই গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘মহান শিক্ষক চারু মজুমদার’, ‘লেনিন’, ‘মার্কসবাদ’ এবং ‘মাওবাদের সপক্ষে’র মতো অত্যন্ত রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক শিরোনামগুলো সরাসরি নির্দেশ করে যে, এই সামগ্রিক কাব্যগ্রন্থটি প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রেণীর বৈপ্লবিক দর্শনে গভীরভাবে বিশ্বাসী। কবি হাসান ফকরী এখানে কেবল কল্পনার জগতে বিচরণ করা কোনো শব্দের জাদুকর নন, বরং তিনি নিজে একজন মাঠের বিপ্লবী কর্মী হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের জরাজীর্ণ ও বৈষম্যমূলক কাঠামোকে ভেঙে ফেলার এক তীব্র ও অমোঘ ডাক দিয়েছেন।
নিছক সস্তা ‘আমোদ-প্রমোদ’ বা বুর্জোয়া শ্রেণীর ‘রোমান্টিকতার’ সংকীর্ণ গণ্ডির বাইরে গিয়ে হাসান ফকরীর এই অনন্য কাব্যধারাকে নির্দ্বিধায় ‘প্রতিরোধের নন্দনতত্ত্ব’ বা সত্যিকারের ‘গণকাব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করা চলে। তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত ‘আমার প্রতিবাদের নাম’, ‘ধাক্কা’, ‘আক্রমণ’ এবং ‘নিশানা হোক হিংস্র পশু’র মতো ক্ষুরধার শব্দবন্ধগুলো প্রথাগত শোষক ও শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে এক ধরনের সুসংগঠিত সশস্ত্র মানসিক, আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধের এক অমোঘ ইশতেহার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
একই সাথে, দেশীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট—যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন নিয়ে রচিত ‘প্রসঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড’ কিংবা ভারতীয় প্রগতিশীল কবি ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বন্দী ‘বিপ্লবী দূত ভারভারা রাও’—এর মতো বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে, কবির এই কাব্যিক লড়াই কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় বা দেশের ম্যাপে আবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের অভিন্ন সামাজিক বেদনার এক সমস্বরেরই বিশ্বস্ত অংশ।
প্রান্তিক মানুষের অধিকার, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং শ্রেণী লড়াইয়ের চরম সত্য
শ্রেণী-বিভাজিত বুর্জোয়া সমাজের প্রান্তিক মেহনতি মানুষের ন্যায্য অধিকার রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক আজন্ম আপসহীন ক্ষোভ এই কাব্যধারার আরেকটি প্রধান ও শক্তিশালী চালিকাশক্তি। তাঁর ‘বস্তিবাসীর চালচিত্র’ বা ‘মে দিবস তোমাকে স্বাগত’ শীর্ষক কবিতার মধ্য দিয়ে কবি দিনমজুর ও মেহনতি মানুষের জীবনের কঠিন রুঢ় বাস্তবতা এবং অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক সংগ্রামকে অত্যন্ত মহিমান্বিত রূপ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, সমকালীন স্বাধীনতাহীনতা, কণ্ঠরোধের নোংরা রাজনীতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির ওপর তীব্র চাবুক মেরেছেন ‘রিমাণ্ড সমাচার’, ‘ডিজিটাল আইনের বয়ান’ এবং ‘দেশটাই যমালয়’ শিরোনামগুলোর সুতীক্ষ্ণ ও সাহসী কবিতার মাধ্যমে। মানবতা-বিরোধী পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থাকে কবি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ‘পুঁজিবাদই সেই শকুন’ বলে চিহ্নিত করেছেন, যা মানুষকে কেবল নিজেদের মুনাফা ও শোষণের স্বার্থে অন্ধকার ‘ক্রীতদাস যুগটা’র মতো আজও নির্মমভাবে শৃঙ্খলিত করে রাখে।
শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতার দম্ভকে তুড়ি মেরে ওড়ানোর জন্য এবং শোষিত মানুষের মনে সাহস জোগাতে কবি উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন ‘আসলে ওরা কাগুজে বাঘ’; যা সংগ্রামী ছাত্র-জনতা ও মেহনতি মানুষকে সব ধরনের ভীরুতা কাটিয়ে ‘কেন মিছে মৃত্যু ভয়’ ভুলে ময়দানে লড়তে তীব্রভাবে উদ্বুদ্ধ করে। সামগ্রিকভাবে, হাসান ফকরী এখানে যেন দ্রোহের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এক যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি তীব্রভাবে ‘কবি সুকান্তের ছিল প্রয়োজন’ উপলব্ধি করে ‘সমাধান শ্রেণী লড়াই বিপ্লবী জনতার’—এই চিরন্তন ও চরম ঐতিহাসিক সত্যকে নিজের কাব্যিক বাণীতে রূপ দিয়েছেন।
হাসান ফকরীর এই কাব্যধারা শোষকদের সাথে কোনো প্রকার আপস বা সমঝোতার কথা বলে না। বরং তা ‘পারলে একটু আগুন দে’ এবং ‘শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র’—এর মতো অকুতোভয় ও বৈপ্লবিক উচ্চারণের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের এক আসন্ন, অবধারিত ও অনিবার্য অগ্ন্যুদ্গারের চূড়ান্ত পথ তৈরি করে দেয়।
মননশীল প্রবন্ধ, সমাজ ও দর্শন গবেষণা
শুধু কবিতা বা নাটকেই নয়, বরং গভীর মননশীল প্রবন্ধ এবং গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনায় হাসান ফকরী তাঁর অসাধারণ তাত্ত্বিক প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন। সমাজ ও রাজনীতিকে খুব কাছ থেকে বিশ্লেষণ করে তিনি রচনা করেছেন বেশ কিছু কালজয়ী প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক গ্রন্থ, যার তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- প্রকৃত শিক্ষা কী (১৯৭৬) — প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অসারতা দূর করে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা একটি সময়োপযোগী বই।
- প্রগতিশীল সাহিত্য ও শিল্পের সংকট এবং সম্ভাবনা (১৯৯৪) — আমাদের দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও দিকনির্দেশনামূলক গ্রন্থ।
- পলিটিকস বনাম পলিট্রিকস (১৯৯৯) — রাজনীতির নামে যে নোংরা কূটকৌশল বা ভণ্ডামি চলে, তার বিরুদ্ধে এক অনন্য সমাজতাত্ত্বিক সমালোচনা।
- ধর্ম ও ঈশ্বর অস্বীকারে বাধা কোথায় (২০০৭) — কুসংস্কারের বেড়াজাল ভেঙে প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী সমাজ গঠনের এক সাহসী দার্শনিক প্রয়াস।
- এসো বিদ্রোহ করি (২০০৯) — শোষিত সমাজকে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার এক অমোঘ ও বিপ্লবী আহ্বান।
সাম্যবাদী এই চিন্তাবিদের প্রতিটি গ্রন্থই আমাদের সমাজকে নতুন করে চিনতে এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতে এক আলোর দিশা হিসেবে কাজ করে।
নাট্যকার হাসান ফকরী এবং ‘ক্রাশ ফারাক্কা’র ঐতিহাসিক আলোড়ন
নাট্যকার হিসেবে হাসান ফকরী বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য ও কালজয়ী অধ্যায় রচনা করেছেন। ১৯৭৫ সালে তিনি রচনা করেন তাঁর ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদ বিরোধী কালজয়ী নাটক ‘ক্রাশ ফারাক্কা’। মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের মধ্যকার ত্রিদেশীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও তৎকালীন বাংলাদেশ নিয়ে তাদের নানামুখী আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের জটিল জালকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই নাটকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। মুন্সিগঞ্জের রিকাবী বাজারে ‘কাদামাটি সাহিত্য সংস্কৃতি গোষ্ঠী’র বলিষ্ঠ উদ্যোগে এই কালজয়ী নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ করার গৌরব অর্জন করে।
পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ঐতিহাসিক মে দিবসে দেশের আপামর মেহনতি মানুষের সম্মানে রাজধানীর ঢাকা জেলা ক্রীড়া সমিতির মিলনায়তনে নাটকটির বৃহৎ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বেশ ক’টি প্রগতিশীল শ্রমিক, ছাত্র, যুব ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের যৌথ বলিষ্ঠ উদ্যোগে এবং সক্রিয় অংশগ্রহণে নাটকটি পুনরায় সাফল্যের সাথে মঞ্চস্থ হয়। তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘ক্রাশ ফারাক্কা’ নাটকটি সারা দেশে প্রচণ্ড আলোড়ন জাগিয়েছিল এবং শোষিত মানুষের মাঝে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল।
মেহনতি মানুষের পক্ষের এমন একজন আপসহীন ও খাঁটি মানুষকে আমরা অন্তরের অন্তস্তল থেকে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তিনি তাঁর ভেতরের সবটুকু সৃজনশীল শক্তি ও বিপ্লবী চেতনা উজাড় করে দিয়ে এদেশের শোষিত শ্রমিক-কৃষকদের মুক্তির জন্য আজীবন আমৃত্যু কাজ করে যাবেন—এই সুদৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস আমাদের সবার হৃদয়ে চিরকাল অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
হাসান ফকরীর কালজয়ী নাটক ও অনন্য কাব্যনাট্য সম্ভার
বাংলা থিয়েটার ও মননশীল নাট্যচর্চাকে সমৃদ্ধ করতে হাসান ফকরী অসংখ্য স্মরণীয় ও সমাজসচেতন নাটক উপহার দিয়েছেন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য পূর্ণাঙ্গ নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- বাঁচতে চাই (১৯৭২) — যুদ্ধের ঠিক পরবর্তী সময়ের এক অনন্য দলিল।
- একখণ্ড বাংলাদেশ (১৯৭২) — স্বাধীন দেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
- এপোয়েন্টমেন্ট লেটার (১৯৭৫) — বেকারত্বের অবক্ষয় নিয়ে লেখা নাটক।
- ক্রাশ ফারাক্কা (১৯৭৬) — সাম্রাজ্যবাদ ও পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ।
- রাক্ষুস সাবধান (১৯৭৭) — শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি।
- সারেঙ লঞ্চ ঘোরাও (১৯৮০) এবং তানোর এখন সারা দেশ (১৯৮০) — গ্রামীণ ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের দ্রোহ।
- যদি এমন হতো (১৯৮২) ও খর বায়ু বয় (১৯৮৩) — সামাজিক বাস্তবতার নিখুঁত চিত্রায়ন।
- ভোটের ভ্যাট (১৯৮৬) — সমকালীন রাজনৈতিক প্রহসনের বিরুদ্ধে তীব্র ব্যঙ্গ।
নাটকের পাশাপাশি বাংলা কাব্যনাট্যের ক্ষেত্রেও তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর প্রমাণ রেখেছেন। কাব্য ও নাটকের এক অনন্য মেলবন্ধনে রচিত তাঁর স্মরণীয় কাব্যনাট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- একুশের গান গা’ক মেশিনগান (১৯৭৪) — একুশের চেতনাকে তীব্র বিপ্লবী রূপে উপস্থাপন।
- ঈদ পাখিটার মাংস খাবো (১৯৭৫) ও সব শতাব্দীর ঈশ্বর আমি (১৯৭৫) — বঞ্চিত শ্রেণির তীব্র ক্ষোভ ও মানবিক আর্তি।
- প্রেয়সীরা চায় রক্তশাড়ী (১৯৭৬) — রোমান্টিকতার মোড়কে দ্রোহের এক অনন্য কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ।
তাঁর এই সুবিশাল সাহিত্যকীর্তি ও নাট্য সম্ভার আমাদের প্রগতিশীল সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হিসেবে চিরকাল টিকে থাকবে।
আরো পড়ুন
- হাসান ফকরী: প্রগতিশীল সাহিত্যের ধ্রুবতারা ও এক অকুতোভয় সাম্যবাদী কণ্ঠস্বর
- কবি থেকে বিপ্লবী: কে এই এনামূল হক পলাশ, যিনি স্বৈরাচারের রোষানল পেরিয়েও দমে যাননি?
- বঙ্গবাণী ও কবি আবদুল হাকিম: মাতৃভাষা প্রেমের এক অনন্য ইতিহাস
- কামিনী রায় কবিতায় ব্যর্থতা ও হতাশার গ্লানি ছাপিয়ে জীবনের জয়গান গেয়েছেন
- প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক ও সিনেমা পরিচালক
- কাহ্নপা বা কাহ্নপাদ হাজার বছর আগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদকর্তা
- কবি শামসুল ফয়েজ: সাম্যবাদী জীবনাকাঙ্ক্ষা ও দ্রোহের এক তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- অজয় ভট্টাচার্য ছিলেন আশাবাদী, রোমান্টিক গীতিকার ও কবি
- রণজিৎ মল্লিক বাংলা ভাষার সৃজনশীল এবং মননশীল ধারার কবি ও প্রাবন্ধিক
টিকা
১. রচনা ও প্রকাশকাল সংক্রান্ত টীকা: এই প্রবন্ধটি ১৮ নভেম্বর ২০২২ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ আজ ০৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে বর্তমান ডিজিটাল সংস্করণের জন্য এটি সম্পূর্ণ পরিমার্জন, পুঙ্খানুপুঙ্খ সংশোধন ও উন্নত সংস্করণে রূপান্তর করা হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚