নাটক হচ্ছে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধরন যা অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়

নাটক (ইংরেজি: Drama) হচ্ছে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধরন যা অভিনেতা-অভিনেত্রীর মাধ্যমে পরিবেশিত ও উপস্থাপিত হয়। নাটক সাধারণত ভাষ্য-নাটক (ইংরেজি: Play), অপেরা, মাইম, ব্যালে ইত্যাদি হিসেবে প্রেক্ষাগৃহ বা রেডিও বা টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়। নাটক সাধারণভাবে কবিতার ধারা হিসাবে বিবেচিত। নাটকীয় তত্ত্বের প্রথম দিকের রচনা এরিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব (৩৩৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) থেকেই নাটকীয় রূপটি মহাকাব্য এবং গীতিকবিতার সাথে তুলনীয় হয়েছে।

সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক বা রূপের (Form) মধ্যে নাটক কবিতার মতোই প্রাচীন। ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্রে নাটককে কবিতারই একটি রূপ ‘দৃশ্যকাব্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যেখানে কবিতাকে বলা হয়েছে ‘শ্রব্যকাব্য’। নাটকে ঘটনা, চরিত্র, চরিত্রের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, আচার-আচরণ উচ্চারিত সংলাপের মাধ্যমে রূপ লাভ করে। এক্ষেত্রে নাটকের বিষয়বস্তু, পাত্র-পাত্রী এবং দর্শকের যৌথ উপস্থিতিতে এটি হয়ে ওঠে সামবায়িক শিল্প। অন্যদিকে কবিতা মূলত শ্রুতি নির্ভর। প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যতাত্ত্বিক এ্যারিস্টটলের Poetics বা কাব্যতত্ত্ব গ্রন্থে প্রধানত নাটকেরই বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে মানুষের রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন নাটকের রপ-রীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন অনিবার্য করে তুলেছে। কিন্তু নাটকের মৌলিক উপকরণ – অভিনেতা-অভিনেত্রী, মঞ্চ এবং দর্শক-শ্রোতা —অভিন্নই রয়ে গেছে।[১]

মানুষের জীবন সরলরেখায় শান্ত-স্বছন্দ ভঙ্গিতে প্রবাহিত হয় না। এ-ধরনের জীবন থাকলেও তা নাটকীয়তা বর্জিত। মানুষের জীবনের ছন্দ ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে প্রবহমান। দুর্ভোগ, যন্ত্রণা, বিক্ষোভ, অশান্তি প্রভৃতির আকস্মিক আঘাতে মানুষের জীবনে গতি ও বৈচিত্র্য অনিবার্য হয়ে ওঠে। জীবনের এই গতি ও বৈচিত্র্যকে শিল্পে ধারণ করার প্রয়োজন থেকেই নাটকের উদ্ভব।

মহৎ চেষ্টার নিষ্ফলতা, প্রাণান্তকর পরিশ্রমের ব্যর্থতা, অপ্রত্যাশিত ভাগ্যবিপর্যয়, বিচিত্র ঘটনার চমকপ্রদ সমাপতন, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনের বিশ্বাসঘাতকতা, দ্বেষ-ঈর্ষা, কঠিন সংগ্রাম ও তার শোকাবহ পরাজয়, মনের গভীরে বিরুদ্ধ-প্রবৃত্তির সঙ্গে কঠোর সংগ্রাম —এই সব নাটকীয় উপাদান বা নাটকীয়তা রয়ে গেছে মানুষের জীবন ও তার স্বভাবের মধ্যেই। নাট্যকার নাটক রচনার সময় জীবনের উল্লিখিত উপাদানগুলোই গ্রহণ করে থাকেন। কিন্তু উপাদানগুলোকে গ্রহণ করলেই যথার্থ নাটক হবে না। নির্দিষ্ট শিল্প-শৃঙ্খলায় কোনো একটি উপাদান বা একাধিক উপাদানের বিন্যাসই সার্থক নাটকের জন্ম দেয়। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো নাটকেরও রয়েছে রূপ-রীতিগত নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা।

কবিতা, গল্প, উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধ পাঠ ও উপভোগের জন্য মানুষের অন্য ব্যক্তি বা সহশক্তির প্রয়োজন হয় না। কিন্তু কেবল পাঠ করে নাটক উপভোগ করা যায় না। নাটক যথার্থভাবে উপভোগ করতে হলে একটি সামবায়িক বা যৌথ পরিবেশের প্রয়োজন। অভিনেতা-অভিনেত্রী, মঞ্চ এবং দর্শক-শ্রোতা – এসবের দিকে লক্ষ রেখেই নাট্যকার নাটক রচনা করেন। কেবল পাঠ করে নাটকের যে উপভোগ —তা আংশিক। উপভোগকে সমগ্র হয়ে উঠতে হলে নির্দিষ্ট সময়ে ও স্থানে সম্মিলিতভাবে নাটক উপস্থাপন ও দর্শন করতে হয়। এ জন্যেই নাটকের শিল্পীরীতি যথেষ্ট সতর্ক, দৃঢ়বদ্ধ, কঠোর এবং নিয়মতান্ত্রিক।

সময়ের বিবর্তনে নাটকের রূপ-রীতির ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু নিয়মের অনুশাসনের মধ্যে থেকেই রূপরীতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন নাট্যকাররা। প্রচীন গ্রীক-রোমান নাটক, এলিজাবেথান যুগের কালজয়ী নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপীয়রের নাটক কিংবা উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর বিচিত্র উপাদানে তৈরি নাটকসমূহ বিশ্লেষণ করলে উপর্যুক্ত মন্তব্যের সত্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে। নিয়ম ও রূপরীতির অনুশাসনের ফলেই নাটকের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা হয়ে উঠেছে প্রায়োগিক শিল্পমাধ্যম বা Performing Art। 

আরো পড়ুন:  অভিবাসন-এর মাধ্যমে মানিক সমাজের অর্থনীতিকে তুলে ধরেছেন

নাটকের প্লট বা ঘটনাংশ

এ্যারিস্টটল তাঁর Poetics গ্রন্থে নাটকের ছয়টি অঙ্গের কথা বলেছেন: ১. প্লট বা বৃত্ত ২. চরিত্র ৩. রচনারীতি ৪. ভাব, ৫. দৃশ্য এবং ৬. সঙ্গীত। এগুলোর মধ্যে প্লট বা বৃত্তই প্রধান। মানবজীবনে ঘটে যাওয়া বিচিত্র ঘটনার মধ্য থেকে নাট্যকার নাটকের উপাদান আহরণ করেন। 

নাটকের ঘটনাংশ বিভিন্ন অঙ্কে বিভক্ত থাকে। বিভিন্ন অঙ্কে নাটকের গতি চরিত্রের ফর্ম বা অ্যাকশন অনুযায়ী গতি পায়। গ্রীক ট্র্যাজেডিতে এই গতি চরম লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে অগ্রসর হয়। শেক্সপীয়রের নাটকের ঘটনাংশ পঞ্চাঙ্ক বিভাগের মাধ্যমে উপস্থাপিত। প্রত্যেক অঙ্কে ঘটনা এক-একটি বাঁক নেয়। এভাবে ঘটনার গতি উত্থান, চরমোন্নতি ও পতনের মধ্য দিয়ে পরিণামের দিকে ধাবিত হয়। 

নাটকের Plot বা বৃত্তের বিন্যাস-কৌশলের উপরই নির্ভর করে নাটকের শিল্পসার্থকতা। নাটকে প্লট বা বৃত্ত যে বিষয়বস্তুকে ধারণ করবে, এ্যারিস্টটলের মতে, সেখানে আদি, মধ্য, অন্ত — এই তিনটি পর্ব বিভাজন থাকবে। তার মতে নাটকের কাহিনী দুই রকম: 

১. সরল (Simple) 

২. জটিল (Complex)।

যে-নাটকে ঘটনার ধারা অবিচ্ছিন্ন, তার প্লটকেই বলা হবে সরল। কিন্তু মানুষের জীবনে এই সরল রৈখিক অবিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়াও রয়েছে এক গভীর, জটিল পর্যায়। যে-সব নাটকের ঘটনার মধ্যে বিপর্যয় বা অভূতপর্ব ধারণা, বোধ কিংবা ঘটনার পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন চিন্তার প্রতিফলনে বিশিষ্ট (Reversal of Situation or Recognition or by Both) হয়ে ওঠে, সে-সব নাটকের চরিত্র ভালো-মন্দ বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাঁক পরিবর্তন করে। এই বাঁক পরিবর্তনে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা মানবিক অবস্থার পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা পরিস্থিতির বিপর্যয় নাটকের ঘটনাকে কতোটা জটিল করে তুলতে পারে, সফোক্লিসের কালজয়ী ট্র্যাজেডি ‘ইডিপাস’ তার প্রমাণ।

নাটকের ঘটনার পরিণতি আনন্দদায়ক হলে তাকে বলে কমেডি (Comedy)। আবার চরম দুঃখবহ হলে তাকে বলা হয় ট্র্যাজেডি (Tragedy)। সফোক্লিস এবং শেক্সপীয়রের অধিকাংশ নাটকই প্লটবিন্যাস এবং বিষয় ভাবনায় ট্র্যাজেডির পর্যায়ে পড়ে। সমাজ ও সভ্যতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নাটকের প্লট ও বিষয়বিন্যাসে প্রচুর রূপান্তর ঘটেছে। কিন্তু জীবনকে উপস্থাপনে সরল ও জটিল – এই দুই ভঙ্গির প্রাধান্য এখনো আছে।

এ্যারিস্টটল সার্থক নাটকের জন্য তিনটি ঐক্যের উপর জোর দিয়েছেন। সেগুলো হচ্ছে—সময়ের ঐক্য, ঘটনার ঐক্য এবং স্থানের ঐক্য। এই ঐক্যের ধারণা অনেক পাল্টেছে বটে, কিন্তু সময়ের ভেতর-বাইরের শৃঙ্খলা এখনো একটি সার্থক নাটক হয়ে-উঠার অন্যতম মানদণ্ড।

চরিত্র 

নাটক মানব জীবনের রূপায়ণ। এ-জীবন ক্রিয়াশীল এবং বহু স্তরীভূত। সুতরাং চরিত্রই নাটকের মূল উপাদান। মানবচরিত্রের রূপ ও প্রকৃতি বিচিত্র, যেমন সৎ-অসৎ, সরল-জটিল, আত্মসচেতন, স্বাবলম্বী অথবা পরিস্থিতির কাছে আত্মসমপর্ণকারী ইত্যাদি। মানবজীবন রূপায়ণের প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের চরিত্র নাট্যকার বেছে নিতে পারেন। নাটকীয় চরিত্রকে চারটি বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করেছেন এ্যারিস্টটল। তাঁর মতে নাটকীয় চরিত্র মূলত কতকগুলো নৈতিক আচরণের সমষ্টি বা প্রতিনিধি মাত্র। এ্যারিস্টটলের মতে, এই আচরণের ভিত্তিতেই নাটকের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য নিরূপণ করতে হবে। 

আরো পড়ুন:  নীতিগল্প হচ্ছে রূপকথার ধরনে জীবজন্তুর গল্পের মাধ্যমে নীতিকথার প্রচার

প্রথমত: মানুষের চরিত্র ভালো (Good Character) হতে পারে। কিন্তু অবিমিশ্র ভালো চরিত্র নাটকে কোনো জটিলতা বা সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে না। নাটকীয় চরিত্র হবে ভালো-মন্দের সংমিশ্রণের ফল। এ্যারিস্টটলের মতে ট্রাজেডির চরিত্র হবে ভালো-মন্দের মাঝামাঝি। 

দ্বিতীয়ত: নাটকে চরিত্রের যথাযথ প্রকাশ (Appropiateness) ঘটবে। 

তৃতীয়ত: চরিত্রকে হতে হবে বা বাস্তবসম্মত (Real) 

চতুর্থত: চরিত্রের সঙ্গতিপূর্ণ আচরণ (Consistent)। 

চরিত্রের আচরণে অসামঞ্জস্য থাকলে শিল্পের ক্ষেত্রে তা হবে সঙ্গতিহীন (Consistently Inconsistent)। এ্যারিস্টটলের এই দৃষ্টিভঙ্গি নাটকের চিরকালের বৈশিষ্ট্যকেই যেন নির্দেশ করেছে। সমাজজীবনের পরিবর্তন মানুষের বোধকেও পরিবর্তিত করেছে। ভালো মন্দের ধারণাও পরিবর্তিত হয়েছে। মন্দচরিত্রও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নাটকে বিধৃত হয়েছে। কিন্তু মনুষ্যত্বের লক্ষণবর্জিত কোনো চরিত্র, যে মানুষের সহানুভূতি আকর্ষণে ব্যর্থ – তাকে কখনোই নাটকীয় চরিত্র বলা যাবে না।

পরিবর্তনশীল সমাজ ও জীবন নাটকের চরিত্রের আকৃতি-প্রকৃতির বদলও অনিবার্য করে তুলেছে। ইউরোপের রেনেসাঁস থেকে শুরু করে গণতন্ত্রের আবির্ভাব ও চর্চা নাটকের চরিত্র ও তার স্বভাবকেও পরিবর্তন করেছে। রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের অন্ধকার যুগ থেকে কেবল নাটক নয়, নাটকের চরিত্রও বের হয়ে এসেছে। ইডিপাসের মতো অসাধারণ চরিত্র হয়তো এখন নেই। কিন্তু সাধারণ মানবজীবন থেকে আহরিত চরিত্র-পাত্রদের জীবনেও যে জটিল চিন্তা, তীক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা, দ্বন্দ্ব, অন্তর্যন্ত্রণা, দুঃখবোধ প্রভৃতি বিদ্যমান আধুনিক নাট্যকাররা তাকেই রূপদান করেন নাটকে। 

এ-প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে, নাটকের সবগুলো উপাদানের যথাযথ প্রয়োগ কোনো নাটককে সফল করে তোলে। প্লট বা ঘটনা এবং চরিত্রের পাররিক সংযোগ ও সামঞ্জস্যই নাটকীয়তা সৃষ্টির নিয়ামক। কিন্তু ঘটনা ও চরিত্রের এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আপেক্ষিক। কোনো নাটকে ঘটনা আবার কোনো নাটকে চরিত্র প্রাধান্য পায়। জীবনের গভীর উপলব্ধির প্রাধান্য ট্র্যাজেডিকে করেছে চরিত্রপ্রধান। সংগ্রামশীল মানবজীবন, তার দ্বন্দ্ব ও বেদনার বাহন হিসেবে ঘটনার গুরুত্ব সর্বাধিক। কমেডি জীবনের বাইরের অসঙ্গতিকে কৌতুকময় করে প্রকাশ করে বলে সেখানে ঘটনা প্রাধান্য পায়। আধুনিককালের কোনো কোনো নাটকে নাট্যকারের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে সমাজ, মানুষের অস্তিত্ব, ব্যক্তিমানুষ প্রভৃতি গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয়েছে।

সংলাপ 

সাহিত্যের অন্যান্য শাখা থেকে নাটকের পৃথক অবস্থানের কারণ এই সংলাপ। কেবল চরিত্রের কথা নয়, নাট্যকারের রসসৃষ্টি ও আইডিয়ার বাহনও এই সংলাপ। সংলাপের সার্থকতা নির্ভর করে পরিবেশ ও চরিত্রের মনোভাবের সঙ্গতির উপর। চরিত্রের ব্যক্তিত্ব কিংবা ব্যক্তিত্বহীনতা ফুটিয়ে তোলে এই সংলাপ। চরিত্রের ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে হলে তার বাকভঙ্গির বিশিষ্টতা থাকতে হবে। যেমন দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’ নাটকের নিমচাঁদের সংলাপ। তার মেধা, ব্যক্তিত্ব কিংবা ব্যক্তিত্বশূন্যতার বাহন তার ইংরেজি-প্রভাবিত সংলাপ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘বহিপীর’ নাটকের সংলাপ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও স্বরূপকেই ফুটিয়ে তোলে। সংলাপের ভাষা-বৈচিত্র্য কেবল চরিত্রের স্বাতন্ত্র্যকে প্রকাশ করে না, নাট্যকারের স্বভাবধর্মকেও প্রকাশ করে।

নাটকের শ্রেণীবিভাগ 

নাটকের বিষয় ও পরিণতি বিচার করে নাটককে প্রধানত তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে: 

১. ট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্তক নাটক 

২, কমেডি বা মিলনান্তক নাটক। 

৩. প্রহসন।

ট্রাজেডি বা বিয়োগান্তক নাটক বা বিষাদাত্মক নাটক (ইংরেজি: Tragedy) হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ যখন তার পরিণতিতে প্রধান চরিত্রের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনে তখন সেই নাটককে ট্রাজেডি বলা হয়।[২] দ্বন্দ্বময় পারিপার্শ্বিক ঘটনা ও পরিস্থিতির জটিলতায় পরাভূত মানবজীবনের করুণ কাহিনী ট্রাজেডির উপজীব্য।

আরো পড়ুন:  রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকৃতি প্রেম ও প্রকৃতিবাদ এবং বাঙলাদেশের পরিবেশ

মিলনান্তক হলেও প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রাপ্তির এবং উদ্দেশ্যের সঙ্গে উপায়ের দ্বন্দ্ব অথবা বলা যায় মানবকর্মের অসঙ্গতি ট্র্যাজেডির মতো কমেডিরও উপজীব্য। কমেডিকে কয়েকটি প্রধান শ্রেণিভুক্ত করা যায়। যেমন কাব্যধর্মী বা রোম্যান্টিক কমেডি, সামাজিক কমেডি, চক্রান্তমূলক কমেডি প্রভৃতি। আবার কোনো কোনো সমালোচক কমেডিকে কল্পনাত্মক, ভাবপ্রবণ, বাস্তববাদী, বিদ্রুপাত্মক, সামাজিক ভাবপ্রধান প্রভৃতি ধারায় চিহ্নিত করেছেন। এছাড়াও রয়েছে নাটকের ঐতিহাসিক এবং পৌরাণিক রূপের দুই বহু চর্চিত ধারা।

ক. বিষয় ও পরিণতি বিচার করে নাটক

ছকের সাহায্যে নাটকের শ্রেণিবিভাগের বৈচিত্র্য নির্দেশ করা যেতে পারে:

নাটকের প্রধান দুইরূপ

ট্রাজেডি ও কমেডি। 

কমেডি চার প্রকার, যথা রোমান্টিক কমেডি, কমেডি অব ম্যানারস, প্রহসন এবং ব্যঙ্গ-বিজ্ৰপাত্মক কমেডি।

খ. সাহিত্যের বিভিন্ন আন্দোলন-নির্ভর রূপরীতিগত বৈচিত্র্য

আন্দোলন-নির্ভর নাটক কয়েক প্রকার, যথা রোমান্টিক, ক্লাসিক, বাস্তববাদী, সাংকেতিক, অভিব্যক্তিবাদী, এপিক থিয়েটার এবং থিয়েটার অব দি অ্যাবসার্ড।

গ. বিষয়-গত রূপবৈচিত্র্য

বিষয়-গত রূপবৈচিত্র্য নাটক চার প্রকার। যথা ঐতিহাসিক, পৌরাণিক, সামাজিক নাটক ও লোকনাট্য।

এছাড়াও আধুনিককালে সংযোযিত হয়েছে একাঙ্ক নাটক। 

নাটকের উদ্ভব ও ইতিহাস 

সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক বা রূপের মধ্যে নাটকের ইতিহাস কবিতার মতোই প্রাচীন। ভারতীয় অলংকার শাস্ত্রে নাটককে কবিতারই একটি ‘দৃশ্য কাব্য’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সেখানে কবিতাকে বলা হয়েছে ‘শ্রাব্য কাব্য’। সংস্কৃত আলংকারিকগণ নাটককে সব রকম কাব্য সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করে বলেছেন — ‘কাব্যেষু নাটকং রম্যাম’। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যতাত্ত্বিক এরিস্টটলের পোয়েটিকস বা কাব্যতত্ত্ব গ্রন্থে প্রধানত নাটকেরই বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে।[৩]

মূল নিবন্ধ: নাটকের ইতিহাস

উপন্যাস ও ছোটগল্পের মতো বাংলা নাটকেরও সূত্রপাত উনবিংশ শতাব্দীতে। কিন্তু নাটকের ঐতিহ্য ও সূত্র বাঙালি জীবনে আদিকাল থেকেই ছিলো। যাত্রা, পালাগান, কবিগান এমনকি মঙ্গলকাব্যগুলোর মধ্যেও নাট্যরীতির যথেষ্ট নিদর্শন বিদ্যমান। উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে আসার ফলে সচেতনভাবে বাংলা নাটক রচনা ও মঞ্চায়ন শুরু করে।

অন্যান্য সাহিত্য-আঙ্গিকের মতো বাংলাদেশের নাটকেরও স্বতন্ত্র যাত্রাপথ চিহ্নিত হয় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এ-ভূখণ্ডের স্বতন্ত্র জীবনরুচি, দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনা-রূপায়ণে দেশবিভাগ-পূর্বকাল থেকেই যাঁরা নাটক রচনায় মনোনিবেশ করেন তাঁদের মধ্যে শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫) ইব্রাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৯), আকবরউদ্দীন (১৮৯৫-১৯৭৮), আবুল ফজল (১৯০৩-১৯৮৩), শওকত ওসমান (১৯১৮-১৯৯৮) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এঁদের হাতেই বাংলাদেশের নাটকের স্বতন্ত্র ভিত্তি তৈরি হয়। 

তথ্যসূত্র

১. বেগম আকতার কামাল, ভীষ্মদেব চৌধুরী, রফিকউল্লাহ খান ও অন্যান্য, বাংলা ভাষা: সাহিত্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, পুনর্মুদ্রণ ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৯।
২. কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা ১২৫।
৩. আবুল ফজল ও রেজাউল ইসলাম, সাহিত্য তত্ত্ব-কথা, দুরন্ত পাবলিকেশন, ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ ২০০৯, পৃষ্ঠা ৩১।

Leave a Comment

error: Content is protected !!