লুইস হেনরি মর্গানের এ্যানসিয়েন্ট সোসাইটি: সমাজবিজ্ঞানের বিবর্তনের ইতিহাস

আমেরিকান চিন্তাবিদ ও গবেষক লুইস হেনরি মর্গানের হাত ধরে ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত হয় সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ “এ্যানসিয়েন্ট সোসাইটি”। এর আগেও ১৮৫১ সালে তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই “দ্য ইরোকোয়া” আলোর মুখ দেখেছিল। তবে “এ্যানসিয়েন্ট সোসাইটি” প্রকাশের পর তা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বরং সারাবিশ্বের বুদ্ধিজীবী মহলে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি করে।

একটি মজার বিষয় হলো, মর্গান নিজে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ ছিলেন না। কিন্তু কার্ল মার্কসের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের লেখার সূত্র ধরেই মর্গানের এই কাজ বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। এই সংযোগের ফলে পশ্চিমা বিশ্বের অনেক পুঁজিপন্থী সমাজবিজ্ঞানী মর্গানের মূল তত্ত্বকে অবমূল্যায়ন করতে শুরু করেন এবং তাঁর গবেষণার খুঁটিনাটি ভুলত্রুটি খোঁজার পেছনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

গবেষণার নেপথ্য প্রেরণা: সুস্থ সমাজ গঠনের আকুলতা

মর্গানের কাজকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না; বরং নিছক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং সত্য জানাই ছিল তাঁর মূল চালিকাশক্তি। তৎকালীন মার্কিন সমাজে পুঁজিপতিদের সীমাহীন অর্থলোভ, সামাজিক অবক্ষয়, নৈতিকতাহীনতা এবং তরুণদের অপরাধপ্রবণতা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। এসব সামাজিক ব্যাধি দূর করে কীভাবে একটি আদর্শ ও সুস্থ আমেরিকা গড়ে তোলা যায়, সেটিই ছিল তাঁর গবেষণার মূল অন্বেষণ। পুঁজিবাদী সমাজ ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন কোনো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করার ধারণা সম্পর্কে মর্গানের কোনো প্রত্যক্ষ ভাবনা ছিল না।

ব্যক্তিগত জীবনে মর্গান একটি উচ্চবিত্ত বুর্জোয়া পরিবারে জন্মেছিলেন এবং পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। পরবর্তীতে উত্তর মিশিগানের খনি ও রেলপথ ব্যবসায় বিনিয়োগ করে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন। এই আর্থিক স্বচ্ছলতাই তাঁকে পরবর্তীতে ব্যবসা ছেড়ে পুরোদস্তুর সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সাহায্য করেছিল।

রেড ইন্ডিয়ানদের সাথে জীবনযাপন ও মাঠপর্যায়ের গবেষণা

গবেষণার তাগিদে মর্গান নিউ ইয়র্ক রাজ্যের ‘ইরোকোয়া’ রেড ইন্ডিয়ান উপজাতির অন্তর্ভুক্ত ‘সেনেকা’ জনগোষ্ঠীর সাথে দীর্ঘ সময় কাটান। তিনি তাদেরই একজন হয়ে উঠেছিলেন। তাদের অদ্ভুত সামাজিক রীতিনীতি, উৎসব এবং বিশেষ করে তাদের আত্মীয়তার সম্পর্কবাচক শব্দাবলি (Kinship Terms) মর্গানকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। এই সরেজমিন অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তিনি একের পর এক গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এমন তথ্যসমৃদ্ধ ও মাঠপর্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার কারণে মর্গানকে কেবল সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের জনক বলাই যথেষ্ট নয়, বরং উনবিংশ শতাব্দীর সমাজ গবেষকদের মধ্যে তাঁকে অবলীলায় শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া যায়।

মর্গান নিজের পারিবারিক বংশমর্যাদা নিয়েও বেশ সচেতন ছিলেন এবং ১০৮৯ সাল থেকে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত মর্গান পরিবারের ইতিহাস সংবলিত একটি গ্রন্থ তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন। তিনি মনেপ্রাণে একজন খাঁটি খ্রিস্টান ছিলেন এবং পুঁজিবাদকেই মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ রূপ বলে মনে করতেন। তাঁর দৃষ্টিতে পুঁজিবাদই ছিল সর্বোত্তম সমাজব্যবস্থা, আমেরিকা ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র এবং খ্রিস্টধর্মই ছিল একমাত্র পরম সত্য। সুতরাং, তিনি ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান চেয়ে সমাজতন্ত্র কামনা করেছিলেন—এমন ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

এঙ্গেলস ও মর্গান: ইতিহাসের এক নাটকীয় সংযোগ

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সাথে মর্গানের নাম জড়িয়ে যাওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের। ১৮৮৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি কার্ল কাউটস্কিকে লেখা এক চিঠিতে এঙ্গেলস মর্গানের এই বইটিকে জীববিজ্ঞানে ডারউইনের তত্ত্বের মতোই আদিম সমাজের ওপর এক চূড়ান্ত প্রামাণ্য দলিল হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, কার্ল মার্ক্সই মর্গানের এই কাজের গুরুত্ব প্রথম অনুধাবন করেছিলেন এবং মর্গান নিজের বিষয়ের গণ্ডির মধ্যে থেকেই স্বাধীনভাবে ইতিহাসের বস্তুগত ধারণাকে আবিষ্কার করেছিলেন।

তৎকালীন সময়ে জার্মান চ্যান্সেলর বিসমার্ক সমাজতন্ত্র-বিরোধী আইন পাস করে সমাজতান্ত্রিক ঘরানার সব বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। বিসমার্ককে বোকা বানানোর জন্য এঙ্গেলস একটি কৌশল নেন। তিনি এমন একটি বই লিখতে চাইলেন যা বিসমার্ক কোনোভাবেই নিষিদ্ধ করতে পারবেন না। আর সেই বইটির মূল ভিত্তিই ছিল মর্গানের গবেষণা।

এই রাজনৈতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা সমাজবিজ্ঞানীরা মর্গানের ওপর একধরনের অহেতুক উষ্মা প্রকাশ করতে শুরু করেন, যা বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য মোটেও কাম্য ছিল না। এটি সত্য যে আধুনিক গবেষণার আলোকায়ন মর্গানের অনেক তত্ত্বই পরিমার্জিত হয়েছে, কিন্তু তিনি যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার জন্ম দিয়েছিলেন, সেখানেই তাঁর আসল শ্রেষ্ঠত্ব।

বাঙালি পাঠক ও মর্গানের লেখার মেলবন্ধন

একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মর্গানের এই অমূল্য বইটি খোদ আমেরিকাতেই পুনর্মুদ্রিত হয়নি। অথচ ১৯৪৭ সালে কলকাতার ‘ভারতী লাইব্রেরি’ এই বইটির একটি ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশ করে, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের গবেষকেরা ব্যবহার করে আসছিলেন।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক বিনয় কুমার সরকার এঙ্গেলসের বিখ্যাত গ্রন্থ “অরিজিন অব দ্য ফ্যামিলি, প্রাইভেট প্রোপার্টি অ্যান্ড দ্য স্টেট” বইটি বাংলায় অনুবাদ করেন। তিনি এর নাম দেন “পরিবার, গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি”। এঙ্গেলসের এই পুরো বইটিই গড়ে উঠেছিল মর্গানের “এ্যানসিয়েন্ট সোসাইটি”র ওপর ভিত্তি করে। বিনয় সরকারের এই অনুবাদের মাধ্যমেই বাঙালি সমাজ প্রথম মর্গানের বৈজ্ঞানিক সমাজ-বিশ্লেষণের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। পরবর্তীতে কলকাতার ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সিও’ এই বইটির আরেকটি বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করে। বাংলা ভাষায় সমাজবিজ্ঞান চর্চার প্রসারে এই অনুবাদগুলো আজীবন এক অনন্য দিকনির্দেশক হিসেবে গণ্য হবে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. বইয়ের রেফারেন্স: লুইস হেনরি মর্গান, আদিম সমাজ, অনুবাদ ও সম্পাদনা: বুলবন ওসমান, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, পুনর্মুদ্রণ: মে ২০১৪, পৃষ্ঠা: ৯-১০।
২. লেখাটি আজ ২১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে সংস্কার করে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment