মাস্টারদা সূর্য সেন ও চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ: বিপ্লবী পটভূমি ও অজানা ইতিহাস

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাস্টারদা সূর্য সেন এবং চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ এক রোমাঞ্চকর ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। বিশ শতকের শুরুতে বাংলায় যে সশস্ত্র বিপ্লববাদের সূচনা হয়েছিল, চট্টগ্রামের যুব সমাজ তাতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব কীভাবে চট্টগ্রামে বিপ্লবী দল গড়ে উঠেছিল, সূর্য সেনের প্রথম দিকের নেতৃত্ব এবং বিপ্লবীদের ব্যক্তিগত জীবনের কঠোর ত্যাগ ও মানসিকতার কিছু অজানা দিক।

চট্টগ্রামের বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা ও পটভূমি

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় যখন বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী ‘স্বদেশী আন্দোলন’ শুরু হয়, তখন তার ঢেউ চট্টগ্রামে এসেও আছড়ে পড়ে। সেই প্রভাবের জের ধরে রাউজান থানার কোয়েপাড়া গ্রামের যামিনী সেনের উদ্যোগে ‘চট্টল হিতসাধিনী সভা’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত এই সংগঠনটিকে কেন্দ্র করেই চট্টগ্রামের উৎসাহী দেশপ্রেমিক যুবকদের সাথে ১৯০৭ সালের দিকে কলকাতার শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবীদের একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

যামিনী সেনের সাথে বিপ্লবী নেতা অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্র কুমার ঘোষ ও উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের পরিচয় থাকায় চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা কলকাতার ধারার সাথে সরাসরি যুক্ত হন। পরবর্তীতে বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীরা যখন ‘অনুশীলন’ ও ‘যুগান্তর’—এই দুই প্রধান দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন চট্টগ্রামের বিপ্লবী দলটি নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে যুগান্তর দলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করে। একই সাথে তারা প্রকাশ্যভাবে জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন জনআন্দোলনেও সক্রিয় সহযোগিতা করতে থাকে।

১৯২৩ সালের বিপ্লবী কমিটি এবং নেতৃত্ব বণ্টন

চট্টগ্রামে বিপ্লবী আন্দোলনকে একটি সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার জন্য ১৯২৩ সালের দিকে একটি বিশেষ বিপ্লবী কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টন ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত:

  • সভাপতি: মাস্টারদা সূর্য সেন।
  • সহ-সভাপতি: অম্বিকা চক্রবর্তী (তাঁর মূল দায়িত্ব ছিল বাংলার ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের বিপ্লবী দলগুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং কংগ্রেসের সাথে রাজনৈতিক সংযোগ বজায় রাখা)।
  • শহর সংগঠন: শহর অঞ্চলের বিপ্লবী কার্যক্রমের মূল দায়িত্বে ছিলেন গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ।
  • গ্রাম সংগঠন: গ্রামীণ জনপদে বিপ্লবের বীজ বপন ও তরুণদের সংগঠিত করার দায়িত্বে ছিলেন নির্মল সেন।
  • ছাত্র আন্দোলন ও ব্যায়ামাগার: পরবর্তীতে লোকনাথ বলকেও কমিটির সাথে যুক্ত করে ছাত্র আন্দোলন পরিচালনা এবং তরুণদের শারীরিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যায়ামাগার গঠনের গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়।

মাস্টারদার পলাতক জীবন ও কারাবরণ

১৯২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে ১৯২৫ সালের প্রথম কয়েক মাস পর্যন্ত ব্রিটিশ পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় মাস্টারদা সূর্য সেন বিপ্লবী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। এই পলাতক জীবনের একটি রোমাঞ্চকর ঘটনা হলো—মাস্টারদা যখন তাঁর শ্বশুরের দেওয়ান বাজারের বাসায় অবস্থান করছিলেন, তখন হঠাৎ সেখানে ব্রিটিশ পুলিশ হানা দেয়। পুলিশের আগমন টের পেয়ে তিনি চতুরতার সাথে দোতলা থেকে পেছনের নালায় লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এরপর কলকাতার বিপ্লবীদের সাথে পরবর্তী পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য তিনি গোপনে কলকাতায় চলে যান। কিন্তু পলাতক অবস্থার মধ্যেই ১৯২৬ সালে কলকাতার আর্মহার্স্ট স্ট্রিটের (Amherst Street) একটি মেস থেকে মাস্টারদা হঠাৎ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে দূরবর্তী মুম্বাইয়ের (তৎকালীন বুম্বাই) রত্নগিরি জেলে কঠোর পাহারায় আটকে রাখে।

বিপ্লবীদের পারিবারিক জীবন এবং মাস্টারদার বিয়ে

তৎকালীন সমাজের নর-নারীর সম্পর্ক, বৈবাহিক জীবন এবং পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে বিপ্লবীদের আদর্শ ও মানসিকতা কেমন ছিল, তা বুঝতে মাস্টারদার ব্যক্তিগত জীবনের ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি। সে যুগের বিপ্লবীরা মূলত গভীর ধর্মীয় ভাব এবং দেশপ্রেমের আদর্শ দ্বারা বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করাকে তাঁরা একটি কঠোর কৃষ্ণসাধনমূলক ‘তপস্যা’ হিসেবে গ্রহণ করতেন। এই কঠোর জীবনদর্শনের কারণে বিপ্লবীরা বিবাহিত জীবনের বন্ধনকে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি বড় অন্তরায় বা কর্তব্য-চ্যুতির কারণ মনে করতেন। এই বোধ থেকেই বাংলার বহু বিপ্লবী নেতা চিরকুমার জীবন যাপন করে গেছেন।

মাস্টারদা সূর্য সেনও বিপ্লবী ভাবধারায় দীক্ষিত হওয়ার পর থেকে সম্পূর্ণ বিবাহ-বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ১৯১৮ সালে বহরমপুর কলেজ থেকে বিএ পাস করে যখন তিনি চট্টগ্রামের বাড়িতে আসেন, তখন পারিবারিক তীব্র চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে তাঁর বড় ভাই শিক্ষক চন্দ্রনাথ ঘোষ এবং অন্যান্য আত্মীয়দের বিশেষ অনুরোধ ও সামাজিক বাধ্যবাধকতার কারণে ১৯১৯ সালে তিনি কানুনগোপাড়ার নগেন্দ্র নাথ দত্তের রূপবতী কন্যা ষোলো বছর বয়সী পুষ্প দত্তকে বিবাহ করতে বাধ্য হন। তবে বিয়ের পরও মাস্টারদার মনে এই ধারণাই বলবৎ ছিল যে, বিবাহিত জীবন একজন বিপ্লবিকে তাঁর দেশমাতার মুক্তির মূল কর্তব্য থেকে ভ্রষ্ট করে।

মুমূর্ষু স্ত্রীর মৃত্যুশয্যা ও এক ট্রাজিক অধ্যায়

মাস্টারদা যখন তাঁর শ্বশুরের বাসা থেকে পুলিশের তাড়া খেয়ে জীবন বাজি রেখে পালিয়ে যান, তখন তাঁর স্ত্রী পুষ্প দত্ত টাইফয়েড রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুশয্যায় শায়িত ছিলেন। দেশের কাজের জন্য স্ত্রীকে সেই অবস্থায় রেখেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে মাস্টারদা যখন মুম্বাইয়ের রত্নগিরি জেলে বন্দী, তখন তাঁর স্ত্রীর শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। এই মুমূর্ষু অবস্থায় স্ত্রীকে শেষ দেখা দেখার জন্য জেলের ভেতর থেকে বহু আবেদন-নিবেদনের পর ব্রিটিশ সরকার কঠোর পুলিশ পাহারায় মাস্টারদাকে কিছুদিনের ছুটিতে চট্টগ্রামে আসার অনুমতি দেয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবীদের ব্যক্তিগত জীবনে কতখানি মর্মান্তিক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল, মাস্টারদার জীবন তারই এক অনন্য উদাহরণ।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. জয়নাল আবেদীন, উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী ও বামধারার রাজনীতি: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, ফেব্রুয়ারি ২০১৩, বাংলাপ্রকাশ, ঢাকা, পৃষ্ঠা ২-৩।

প্রকাশনার নোট: এই ঐতিহাসিক প্রবন্ধটি ৪ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কম-এর সম্মানিত পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয়েছিল।

Leave a Comment