ছোটো শহরের এক কোণে বাড়ি, ঝকঝকে শহরের ঘরে বিজলি আলো
শহরতলীর এক প্রান্তে মাঠে শিশুরা ফুটবল খেলছে,
মাঠের পূব পাশে উদোম গায়ে এক লোক,
তখন ওরকম দু’একজন গভীর মনোযোগী লোক পাওয়া যেত,
বাচাল নেতাদের মতো
কখনো বর্ণনা করে,
কখনো বক্তৃতার ঢংয়ে বলে যাচ্ছে ধারাবাহিক গল্প গাথাগুলো,
সময়টা ছিলো ২০০৫ সালের শীতকাল,
সে বলেছিল—
‘আমার দাদিরা ছড়া কাটে দেশি
আর বিদেশি কাকে খায় দুগ্ধবতি গাভীর কচি দুধের সর
ছেলেরা সারারাত তরুণীদের সাথে পাড়াময় মাস্তি করার স্বপ্ন দেখে;
মিথ্যার পটকা ফোটায় অন্দরমহলের আকাশে বাতাসে;
চাচা বা ভায়েরা আমার, একবার চোখ তুলে তাকান
এইবার শুধু এইবার হামাক ভোট দেন,
এইবারই সবচাইতে আধুনিক ভোট চাচা ভোটিং মেশিন ইত্যাদি …
ইত্যাদি… এইরকম আরো …’
সে ভেবেছিল,
আমার চাচুরা আর চাচিদের গল্প আরো বেশি বিদঘুটে;
কিছু মানুষ বুদ্ধি-বিবেকহীন
কুঁড়ে ঘর তাদের অশেষ সম্বল, ঘরে তাদের অফুরন্ত সুখ
যাদেরকে তোমরা কেউ কেউ চেনো, অপরিচিত রাস্তায় দেখো,
তাদের হাতে ছাতা, কোমরে গামছা, প্রতীকী চাদর গায়ে
লুংগিতে গ্রামীণ ছবি, দুহাতে গৃহপালিত পশুর দড়ি
আরো বেশি মানুষ বিবেক সম্পন্ন
বেশ কিছু মানুষ অজানা অজস্র নাম, অচেনা মাথা,
কেউ কেউ শহর রাস্তায় দিন কাটায়
তারা শুধু ছিছি করা ভুলে গেছে
আমরা আশায় আছি,
আমরা নিরাশ নই,
বিয়েতে জাকজমক সম্রাটের পোষাকে তারা
বিশেষ বিশেষ গল্পের হরিণ বা হরিণী নয়
তারা গণনার মানুষ আদমশুমারির দিনে ওএমআর ফরম পূরণ
কোন ধর্মী, কি করেন, কার সাথে ফিবছর মেলামেশা
আরও কতশত নিয়ম আর বিধি
আচরণ বিচরণ সাহেবেরা রাখেন খবর;
একচোট হাসল কেউ, একহাত নিল কেউ,
কেউ মরলো পিতলের বীচি খেয়ে; ক্রসফায়ার
আমাদের সত্যিকার চাচারা পরনে দেশি লুংগি, তাদের সন্তানেরা জিনসের প্যান্ট
ব্যবসায় দারুণ দাও মারা, দিনাজপুরে জন্মায় বোম্বাই লিচু
মুম্বাই যায় দিনাজপুরি শালী আর সবরি কলা
মুম্বাইর রাস্তায় ছাই লাগবে ছাই, কালা সাবান
মুম্বাই শহর দেখতে আছে, দেখতে বড় বাহার আছে
আমাদের ছাগু-ছাগিরা চমতকার দেহ নাচায় মুম্বাই শহরে।
তাই নিয়ে কত কত খবর,
‘শোনেন ভায়েরা আমার, এইবারই সবচাইতে আধুনিক ভোট
এসে গেছে গোটা দেশে ভারত মাতার সুবাদে টাটা সাহেব শিশ্ন নিয়ে,
লালন তোমার ছেউড়িয়ায় এখন প্রিন্স পুঁজিবাদ;
জমাও জন্মাও টাকা,
গর্তের মধ্যে জন্মাও তেল মধু আর সুন্দরী;
এখন আমার বাঙলায়
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়
ঢাকার পল্টনের রাস্তায়
আমরা যেন শুয়োপোকা তেলাপোকা ছারপোকা উইপোকা,
ছুঁচো আর ইঁদুর আর চামচিকার মতো কথা বলি’,
গণশত্রুরা গামলা আমলা আর তেল ভালোবাসে
তাই তারা শোষণের কল ঘুরিয়ে অস্ত্রের নাচন ভালোবাসে,
ইপিআর পুলিশ সেপাই বিএসএফ তিন বাহিনী
ফনাতন্ত্র বিষ দূষণ প্রাচ্যের পুরনো স্বৈরাচার,
বেজন্মা বেইমানরা মীরজাফরের বন্ধু
দাঙ্গাবাজ, মতলববাজ,
ভাঙল তেলের শিশি, ভাঙো বাঙলা,
গুলি চালা, চালা গুলি।
আধুরা পাবলিকেরা শুয়োরের মতো ঘেঁচু খোঁজে আর দিন দিন বাঁচে,
সৌন্দর্য সাবান নিরমা বা উপনিবেশিক সাবান জনসন চেনে না
ড. জনসন বা শেকসপিয়র চেনে না
ঐগুলারে গুতা মেরে পার করে দে, এপাশ থেকে ওপাশ,
মার ঠেলা সীমান্ত পার হেঁই মারো মারো ঠেলা নয়া দেশ দুই জাতি,
ঠেলা মারো হিন্দুস্তান, ঠেলা মারো ফাঁকিস্তান
বুঝলা দোস্ত সন্ত্রাসীগো দিন শ্যাষ, মিলিটারি শাসন হা হা কী ফকফকা;
চান্দের লাহান দ্যাশ আহা হা হা … …
| ⬅️ | 📜 সূচিপত্র | পরের কবিতা ➡️ |
|---|
কবিতাটির সংক্ষিপ্ত সাহিত্যিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ
‘মানুষ মানুষ আর মানুষ অথবা আধুনিক মানুষের ধারাবাহিক গল্প অথবা উন্মাদনামা’ কবিতাটি মূলত বুর্জোয়া সমাজের পচনশীল রূপ, করপোরেট পুঁজিপতিদের সাংস্কৃতিক পণ্যায়ন, উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্ব এবং সাধারণ মানুষের অবিরত সংখ্যা ও পণ্যে পরিণত হওয়ার বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ইশতেহার।
- প্রান্তিক জীবন ও করপোরেট আগ্রাসন: কবিতার প্রথমাংশে এক বাচাল নেতার ধারাবাহিক গল্পের ছলে গ্রামীণ মানুষের অন্ধ সুখ, বুদ্ধিহীনতা এবং ভোট-রাজনীতির ভোটিং মেশিনের মায়াজালকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে। সাধারণ মেহনতি মানুষ আজ বুর্জোয়াদের কাছে কেবল আদমশুমারির দিন ওএমআর (OMR) ফরম পূরণের একটি নিছক সংখ্যা বা উপাত্তে পরিণত হয়েছে, যাদের জীবনের সব খবর সাহেবেরা রাডারে রাখে।
- মুম্বাই ও ঢাকার অবক্ষয়িত রূপক: কবি এখানে দিনাজপুরের বোম্বাই লিচু আর সবরি কলার মুম্বাই পাচারের ঐতিহাসিক ও আঞ্চলিক রূপক টেনে এনেছেন। মুম্বাইয়ের রাস্তায় এদেশের ‘ছাগু-ছাগিদের’ দেহ নাচার চিত্র এবং টাটা সাহেবের পুঁজি ও আধিপত্যবাদের (শিশ্ন রূপকে বর্ণিত) নগ্ন আগ্রাসনকে তুলে ধরেছেন। লালনের ছেউড়িয়ায় ‘প্রিন্স পুঁজিবাদ’-এর জন্ম হওয়া এবং ঢাকার পল্টনের রাস্তায় সাধারণ মেহনতি মানুষকে শুঁয়োপোকা, তেলাপোকা ও ইঁদুরের মতো অবদমিত জীবনযাপনে বাধ্য করার এক তীব্র অবক্ষয়িত চিত্র এখানে আঁকা হয়েছে।
- ফনাতন্ত্র ও মিলিটারির প্রহসন: কবিতার শেষভাগে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা আমলা, গামলা ও গণশত্রুদের শোষণের কল ঘোরানোর চিত্রকে কবি চাবুক মেরেছেন। বিএসএফ ও বর্ডার ট্র্যাজেডির সমান্তরালে দুই জাতির কৃত্রিম দেশভাগের ‘হেঁই মারো মারো ঠেলা’ নীতি এবং সন্ত্রাসবাদের ভীতি ছড়িয়ে ‘মিলিটারি শাসনকে’ ফকফকা ও চান্দের লাহান দেশ বলে জাহির করার বুর্জোয়া প্রচারণাকে কবি চূড়ান্ত ব্যঙ্গে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন।
ফুটনোট: কবিতাটি পূর্বে ২২ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে লেখকের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী অনলাইনে ফুলকিবাজ.কম সাইটে কাব্যগ্রন্থ আকারে একটি পোস্টে প্রকাশ করা হয়। আজ ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একক কবিতা আকারে আপডেট করে প্রকাশ হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚