ক্ষণে ক্ষণে টের পাই তোমার ত্রিসীমানায়
আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি;
পথ নেই ছেড়ে যাবার।
ইতিহাস শিক্ষা দেয় একদিন প্রয়োজন ফুরাবে,
কেননা ইতিহাস সবকিছু পাঠায় ধ্বংসকূপে—
তুমি-আমি-কঙ্কাল-রাজপ্রাসাদ-সভ্যতা-কৃষ্ণগহ্বর;
ইতিহাস পাঠায় ধ্বংসকূপে মরণের স্পন্দনে চলমান
প্রাণের ঘূর্ণায়মান সুতা ছিঁড়ে ছুটে চলা অবিরাম
বিড়বিড় আউলা প্রলাপ বকা ঘুড়ি।
সেই ঘুড়ি আমার ছাদ হতে পৌঁছে যায় তোমার অলিন্দে;
আমাকে পৌঁছে দেয় তোমার কল্পনার ফুলবাগানে।
কল্পফুল তুলে আমি রেখে দেই তোমার করতলে—
আঙিনায়, বিছানায়, জানালার বৃষ্টিতে মরীচিকার মতো
ঝিকমিক করা তোমার চোখের প্রিজমে।
অসময়ে তোমার সাময়িক উপস্থিতির অনুভূতি
আমাকে রেখেছে প্রবল টানের মাঝখানে;
আমি একধরনের রুদ্ধশ্বাস সাবলীলতার সঙ্গে
ভেসে বেড়িয়েছি কল্পনার মহাজাগতিক রশ্মিতে,
অনুভবে জেনেছি শব্দ ও প্রশান্তির
সবুজ কারুকাজে ঘেরা সকালের ফুটন্ত ফুলের বাগান।
হঠাৎ হাঁটাপথে তোমার হাসি শুনে জেনে ফেলি আশপাশে
রেখেছো ছড়িয়ে ইথারের মতো তোমার আগ্রহী বিস্তার।
আরেকজন উঁকি মারে নবীন পূজারি সেজে
তোমার বর্ণিল জানালায়; নিরাবেগ নির্ভার ছিল না সে,
নজর রাখে তোমার প্রাঙ্গণের চারিদিকে।
ধীরে ধীরে খাপ খাইয়েছে নিজেকে
তোমার কৌশলের সাথে?
আমি আর সে— মাঝখানে তুমি,
বিপরীত দুজনের আঙিনায় অবাক সেতু।
তবুও আশা রাখি কখন কোন ভূমিকম্প এসে
বদলে ফেলে মানুষের চিন্তাজাল।
কী ছিলে তুমি পৃথিবীর কাছে?
স্বাভাবিক সহজাত সতেজ প্রেমিকা;
তোমার চোখের আলো আমার চারপাশে
গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রখর রোদে পিচঢালা
পথের উপর বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক ঢেউয়ের মতো।
আমাদের দিন আর রাত্রিগুলো আলো আর ছায়ার মতো
কেটে যাচ্ছিল একসাথে হ্রস্ব হাসির খিলখিল শব্দে;
আর সাপের মতো এঁকেবেঁকে পিছলে যাওয়া রাতে
তুমি রেশমের মতো কোমল, উইলো শাখার মতো মসৃণ আর
জেলির মতো আদুরে হয়ে আমার বুকে পড়ে থাকতে, স্বপ্ন আঁকতে;
অথচ শেষ প্রহরের মেয়ে তুমি, রক্ত-জল মেঝেতে লেপ্টে
চলে গেছো আমার আঙিনা ছেড়ে;
একপথ চলা পথিক তুমি— স্থিতিহীন, ফিরতে জানো না।
আর যদি কেউ আসে কোনোদিন আমার বৈঠক ঘরে
বৈঠা হাতে নিয়ে ভালোবাসে রূপহীন, ছায়াহীন,
দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধহীন আমার সাধারণ ঘর,
তবে পাবে চুলের মধ্যে সুন্দর মেঠো মেঠো গন্ধ,
নাটকীয় সূর্যাস্ত কিংবা নায়াগ্রা জলপ্রপাতের দিকে
চুপ করে তাকিয়ে থাকা প্রেমিক যুগলের মূর্তি।
তুমি চলে যাও, চলে যেতে পারো, তবে রেহাই পাবে না
তাদের হাত থেকে যারা চোখ বুঁজে খুলে দেয় অসত্যের দ্বার;
কেউই রেহাই পাবে না বেনো জলের মতো ঢুকে পড়া
কাদা ও গোবরের হাত হতে।
মর্গে, হাসপাতালে বা পুলিশ ফাঁড়িতে
তারা খুঁজে ফিরবে বন্ধু বা আত্মীয়ের লাশ;
হয়তো এসবের মাঝখানে আমাকে প্রাণহীন খুঁজে পাবে,
তোমাকেও পেতে পারে।
শুধু পাবে না আমার বাণী, আনন্দস্পর্শ, জন্মসুসংবাদ,
প্রাণবান প্রীতির আলো, হাতে হাতে সহযোগিতার আংটি বদল,
দুর্বাফুলের কুঁড়ি আর প্রাকৃতিক দৃশ্যের পটভূমি।
| ⬅️ আগের কবিতা | 📜 সূচিপত্র | পরের কবিতা ➡️ |
|---|
ফুটনোট: কবিতাটি পূর্বে ৫ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে রোদ্দুরে.কম-এ প্রকাশিত হয়েছিল এবং লেখকের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী ফুলকিবাজ.কম সাইটে পুনর্মুদ্রিত হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚