এসেছি দুজন একই পথে দুভাবে—
তোমার জন্মক্ষণে উঠেছিল বেজে ভোরের পাখির ডাকের
মতো আনন্দের কলরোল;
আর আমার জন্মক্ষণে এক অনন্ত ছাইচাপা কান্না
চলেছিল বয়ে কলকলে, অ্যাম্বুলেন্সের মতো!
আমি এক পোড়াকপালি।
আমার কচি পাতার সাথে বেড়ে উঠেছে কিছু প্রাণী,
যারা বেওয়ারিশ পুকুরের কচুরিপানার মতো কাটায় জীবন;
মুখ রক্তহীন, নীলাভ জন্ডিসাক্রান্ত রোগীর বাংলা পাঁচের মতো।
এড়িয়ে চলে তারা সবাই আমাকে—
আমি যে পোড়ারমুখী,
মা-বাবার গলার ঘ্যাগ—অবিক্রীতদাসী!
অন্তরঙ্গ ভাবিনি কাউকে,
কাউকে ভাবিনি অভিন্ন হৃদয়ের দোলা;
শুধু হৃদয়-যন্ত্রণাকে বুকে লালন করেছি তেল-নুনে মেখে।
প্রকাশ হয়নি কভু আবেগের দুর্বলতা;
তবু একদিন হঠাৎ এসে গেল বসন্ত বাতাস—
সহজাত কিশোরীবেলায় আকাঙ্ক্ষার আবেদন ঠিকঠাক বুঝিনি বলেই
গ্রহণ করেছিলাম আমার প্রথম প্রেম, প্রথম যৌবন।
কীভাবে বাজলো বাঁশি, কীভাবে ভাঙলো বাঁশি—ভাবতে অবাক লাগে;
ভাবনার কোলাহলে, নিত্যদিনের জঞ্জালে
হারিয়ে ফেলেছি বহুবার নিজের ঠিকানা!
আমি পরিশ্রান্ত, ঘৃণাবাহী প্রাণী—
নিজেকে কখনো প্রবোধ দিতে শিখিনি,
ভুলিনি তারপর আর কারো কথার ছলনে।
মা-বাবা ভেবেছে পরিত্যাগেই মুক্তি আমার—অবধারিত।
আত্মহত্যার মধু আমি কতদিন খেতে গেছি
রশি হাতে নিয়ে মাঠের মৌচাকে!
কে আর এ জগতে কার খোঁজ রাখে?
আমি খোঁজ রেখেছি সবার—
আমার মৃত্যু ও আগুনগোলার।
বারো বছর বয়সে ছেড়েছিলাম নিজ গাঁ,
সেই গাঁও পারিনি ভুলতে, পারিনি ভালোবাসতে;
যে গাঁ দিয়েছে অবহেলা আর ঘৃণার পাহাড়!
এরপর কত পথ, বিপথ, কুপথে
দিলাম পাড়ি—আবেগ-উত্তেজনাহীন চলার নিয়মে।
ঘড়ির কাঁটার সাথে বালিশে মাথা গুঁজে,
চোখের পানির সাথে খুঁজেছি—
ঈশ্বরের পেচ্ছাবের মিল ও অমিল;
সে কখনো তাকায়নি গোগ্রাসী চোখ তুলে!
আমার অপরিচিত-পরিচিত বন্ধু ও কর্মীরা
আমার পাশে এসেছে প্রতিরাতে,
আমাকে তুলে নিয়ে বসিয়েছে বারান্দার সোফায়;
দেখিয়েছে পকেটের কুয়েতি দিনার—
অন্ধকারের বুকে চুমু খেয়ে ঘোষণা করি, ‘এ পৃথিবীর সবাই আমার’।
এখন শরীরকে যন্ত্রণা দিয়ে সুখ পাই;
বুক কেটে রক্ত চেটে দেখি—
তাতে পাপের তিক্ত স্বাদ আছে কি না?
মোড়কে মোড়ানো আমি—
চব্বিশ বছরের নির্মলা।
রাতের খাবারে আসে
সেদ্ধ-অসিদ্ধ, নোনতা বা আলুনি মাংস-কাবাব;
কিন্তু তেরো বছর আগে যখন—
পাঁচজন এসে খেলো কুমারী কাবাব,
তারপর কান্নার পিরামিড
বুকের পাঁজরে চেপে বসে আছে!
জীবনকে বর্ণিল রঙে রাঙিয়েছে চারপাশে আমার পড়শীরা,
আমি ছিলাম শুধুই দর্শক;
আমার চোখে লেগে থাকে সাতরঙা রঙধনুর রঙ,
ঠোঁটে হাসি, সাজসজ্জা বেচাকেনার খাটে—
নিত্যদিনের হাটে।
| ⬅️ আগের কবিতা | 📜 সূচিপত্র | পরের কবিতা ➡️ |
|---|
ফুটনোট: কবিতাটি পূর্বে ৩ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে রোদ্দুরে.কম-এ প্রকাশিত হয়েছিল এবং লেখকের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী ফুলকিবাজ.কম সাইটে পুনর্মুদ্রিত হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚