রাষ্ট্রের কর্তা নই, আমরা আছি গৃহকর্তা,
খবরদারি মাতব্বরি সব ঘরের মধ্যেই,
ফেমেলি, পোলাপান, ঝগড়া,
গালাগাল যে শিল্প তা আমাদের গ্রামে এলে দেখবেন;
এখন নজর টাকার উপর,
স্বপ্নে হলেও দেখি সদর দরজায় দারোয়ান,
ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে খেলনা পুতুল,
ঘোরানো সিঁড়ি, আকাশে আলোকিত গ্রহ, আমাদের নগর,
পরিশ্রম, দৈনন্দিন ঘাম, নাইট ডিউটি, ওভারটাইম,
মনে নয়, দেহেই বেশি ক্লান্তি,
বাদল দিনে হিন্দি গানে,
পত্রিকা, টিভিতে খবর আসে প্রতিদিন আমার অফিসে,
ছোটোবেলার চড় থাপ্পড়, সন্তানের জন্য কান্না, চম্পা বকুলের গন্ধ,
শিশুর ওষুধ, মায়ের শাড়ি,
ছোটোখাটো চুরি, খুঁজে পাওয়া স্কুলের ঘর
পাখির গানে স্মৃতি দেখা,
বিড়ির সংগে বন্ধুত্ব, সিগ্রেট প্রত্যাশি,
স্বপ্ন এবং কয়লাখনি,
কবে ঘরবাড়ি সব উধাও হলো নদী ভাঙনে,
ঘরবাড়ি নিলো সরকার, ক্ষতিপুরণবিহীন;
পুরোনো ঘাট কোথায় হারিয়েছে, কে আর জল আনতে যায়,
রাধারা সব বোতলে বোতলে মিনারেল ওয়াটার খায়
এখন মালখালাসকারি জল আনে কার্ভাড ভ্যানে
পাইপে জল আসে শহরে,
মূল্য দিয়ে কিনতে হয় বোতলের পানি।
আমার অন্য বন্ধুরা হাঁটে মাঠে ঘাটে সমুদ্রবন্দরে
ওইখানে তারা মাল খালাসকারি
ভাবনা আর চাহিদা অনেক কম তাই এই বেশ ভালো থাকা
মজুরি বাড়লে ভালো হত;
অনেক দিন ভালো ঘুমাইনি,
আমার সমবয়সি বন্ধুরা উপশহরে কাজ করে
টিভি সিনেমা দেখে, ভাত খায়, সিটি মেরে গান গায়
মেয়েরা বড় হয়, বিয়ে দেয়,
মা হয়, মায়েরা বুড়ায়,
বুড়া-বুড়ির যত্নআত্তি পথ্য, মেলা কষ্ট,
আপনার লগে বিড়ি আছে, ধরাইতাম,
মেলা গল্প, পরে শুনবেন, সব অভাবের গল্প একই রকম,
বাঁচার নিয়মে ফুর্তি, মাঝে মাঝে পালাইতে মন চায়,
পাখির মতো ছোট্ট মেয়েটা চিড়িয়াখানায় যেতে চায়,
ওর হাতি খুব পছন্দ, ও মানুষজন অপছন্দ করে।
বুঝলেন নিজে ভাল হলে বিপদ বেশি,
অন্যকেও ভাল করা লাগে,
নীতি চাই, মাইর দিয়া খুব কম কাজই হয়,
তদুপরি শক্তি প্রদর্শন এক বিশাল ফ্যাক্টর,
আমার প্রথম টার্গেট শিশুরা সুন্দর হবে,
ওরা ভুলপথে যাবে না,
দাস ক্যাপিটাল, মানে শোষণবিহীন দুনিয়া, কার্ল মার্কস,
পৃথিবীর সারা শরীরে ব্যথা,
মলম দেবে কে,
কষ্টের কাজ পৃথিবীকে মাথায় বহন,
তার চেয়ে ভালো হয় এটিকে কোনো ভাগাড়ে ফেলে দিলে।
মাটি কাটার জটিল কাজে শ্রমিকের জীবন অন্তহীন,
সত্যকে মাটির গভীরে পাওয়া যায় না,
পোড়া সত্য পোড়া মাটিতেই থাকে,
অর্ধসত্য মিথ্যাবাদির ঘরে ইট বালু পাথরের সংগে মিশে যায়
রিক্সাঅলা, ফেরিঅলার জীবনের অর্থ এবং
আলকাতরা জ্বালিয়ে হয় নতুন শহর,
পুড়ে যায় দেহের স্বাদ,
আমার পড়শি চাকার গতি বাড়াতে ব্যস্ত মানুষ
অথচ তাদের জীবনের চাকা ঘোরে না,
গতিহীন আরো অনেকের সাথে আমরা থেমে যাই,
শুধু বাড়ে উপরতলার লিফটের গতি,
উপরে বিশাল ছাদ, নিচে আমি চিহ্নহীন
চিহ্ন রাখি ভালোবাসার,
মৃৎশিল্প গড়ে কেউ, ফুল রাখে কেউ ফুলদানিতে,
হাতে হাত রেখে কয়েকজন হলো শক্তিশালি,
প্রতিবাদি হতে গিয়ে কেউ হলো সুবিধাভোগি,
কেউ আদম ব্যবসার দালাল,
দাদাগিরি চোরাচালানি নারী পাচারকারি,
আজকাল মেপে মেপে দেহ বিক্রি হয় গজ ও ফিতায়,
বিক্রি হয় হৃদপিন্ড, পাপড় ভাজা, নতুন মিস্ত্রি,
কে বেশি ভাত খায়; — আধুনিক দাস না গৃহের দাসি
কে বলে আরাম নাই, আরো আরাম চাই;
কে জিগায়, কোথায় চলেছো বাজান।
উত্তরে কে বলে আশা নগরে আশা কেনা যায় কেজি দরে
কে ভাবে, কীভাবে হবে শ্রমদাসের অবস্থার উন্নতি।
এখন তাই শহরের সবাই শক্ত পাথরে খোদাই করে লেখে
দুই সম্রাজ্ঞীর নাম।
উৎপাদন প্রক্রিয়ায়
আগামির মানুষেরা গণতান্ত্রিক হবে কী হবে না এই নিয়ে বক্তৃতা,
পত্রিকা বিক্রি লাল অক্ষরে,
শেষকালে ঝাড়ুমিছিল,
একটা ছেঁড়া টাকা বা ভাঙা কয়েন,
শেষমেষ দাদা, সাদা কাগজে মাতলামি,
রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রধর্ম, হিন্দু ট্রেন, মুসলমান বাস, পাদ্রী রাষ্ট্র
এইসব নিয়ে কবিতা!
দাদা, কবির কী দোষ,
স্নেহ আর চর্বি, তেল আর পিচ্ছিল বিপ্লবের
পার্থক্য কবি কতটুকু আর বোঝে,
কুলি আর বেলির প্রেম,
শেলির কবিতা আর গীতবিতানের গান,
জলে ডোবা নদী,
পানি খায় পানকৌড়ি সকাল থেকে সন্ধা অবধি,
ডুবে কোনো ক্লান্তি নাই,
মাথার খুলিতে মগজ নাই,
আর একবার সামলালেই
সব ঠিক হয়ে যাবে,
ভরসা চাই ভরসা দাও, সুযোগ আর সম্ভাবনা
তাহলেই এসে যাবে নতুন কবিতা
নতুন বিপ্লব।
| ⬅️ আগের কবিতা | 📜 সূচিপত্র | পরের কবিতা ➡️ |
|---|
ফুটনোট: কবিতাটি পূর্বে ২২ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে লেখকের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী অনলাইনে ফুলকিবাজ.কম সাইটে কাব্যগ্রন্থ আকারে একটি পোস্টে প্রকাশ করা হয়। আজ ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একক কবিতা আকারে আপডেট করে প্রকাশ হলো।
কবিতাটির সংক্ষিপ্ত সাহিত্যিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ
‘শ্রমিকের বেদনা গীত’ কবিতাটি মূলত বুর্জোয়া ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় মেহনতি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবক্ষয়, করপোরেট শোষণের নিষ্ঠুর বাস্তবায়ন এবং শ্রেণী শৃঙ্খল ভেঙে কার্ল মার্কসের বৈপ্লবিক দর্শনে মুক্তির পথ খোঁজার এক অনন্য প্রগতিশীল সাহিত্য।
- নগরায়ণ ও শ্রেণী বৈষম্যের রূঢ় বাস্তব: কবিতার প্রথমাংশে দিনমজুর, মালখালাসকারী ও শ্রমিকদের জীবনের ক্লান্তি, ওভারটাইম এবং নদী ভাঙনে জমি হারিয়ে শহরে এসে বোতলের পানি কিনে খাওয়ার মতো নির্মম পুঁজিবাদী বাস্তবতাকে কবি ফুটিয়ে তুলেছেন। পিচ আর আলকাতরা জ্বালিয়ে নতুন শহর গড়ে উঠলেও, উপরতলার মানুষের লিফটের গতি বাড়লেও—শ্রমিক শ্রেণীর জীবনের চাকা যে গতিহীন ও স্থবির হয়ে থাকে, তার এক নিপুণ অর্থনৈতিক রেখাচিত্র এখানে আঁকা হয়েছে।
- মার্কসীয় চেতনা ও চূড়ান্ত স্বপ্ন: কবিতার মধ্যভাগে কবি কার্ল মার্কসের ‘দাস ক্যাপিটাল’ এবং শোষণহীন দুনিয়ার সুমহান দর্শনকে আবাহন জানিয়েছেন। পৃথিবীর সারা শরীরের ব্যথার উপশম হিসেবে কবি পুঁজিবাদের এই কদর্য রূপকে ছুড়ে ফেলার আহ্বান জানান। একই সাথে প্রগতিশীল আন্দোলনের ভেতরের একশ্রেণীর সুবিধাভোগী, আদম ব্যবসায়ী ও দুই সম্রাজ্ঞীর চাটুকার আমলা-নেতাদের তীব্র ব্যঙ্গে চাবুক মেরেছেন। শেষাংশে সব ভাঙন ও ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে উঠে কবি সেই পরম ভরসার কথা বলেছেন, যা শ্রমিক-কুলির প্রেম, শেলি বা গীতবিতানের গানের সমান্তরালে মেহনতি মানুষকে এক নতুন কবিতা ও নতুন বিপ্লবের রক্তিম মোহনায় পৌঁছে দেবে।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚