পরমাণু ও সাম্প্রদায়িক বোম

কে দেয় কাকে আছাড়
কার ঘরে কটা উত্তরাধুনিক ষাঁড়?
মানুষ মরে গেলে এককালে ভুত হতো
পৌরাণিক প্রেতাত্মারা এখন টিভিতে অশ্লীল,
সেলিব্রেটিরা অতীতের শান্তিতে বুঁদ!
জুতাপেটা খেয়ে তারা মর্দে মুমিন ছিল
বেহায়া খাঁর আমলে।

ফাঁকিস্তান মুর্দাবাদ বলে বহু নেতা মাল পোয়া মিষ্টি খেল
হিন্দুস্তা হামারা, ধর্মভীরু পাব্লিক,
তাই কমরেড, এই আর একটু ঠেলা দিন,
ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বানাইতে আরেকটু ঠেলুন।

ডাইনে বাঁয়ে জোড়া লাগিয়ে হরি শিং১ স্বাধীন
করতে পারেন না কাশ্মীর, আজাদ কাশ্মীর জিন্দাবাদ,
কাশ্মীরি আর মনিপুরি জনতা খুঁজছেন স্বাধীনতার মতো উকুন
স্বদেশের রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রির পশ্চাতের ফুটোয়,
নেতারা দিচ্ছেন আশ্বাস,
ভাইসব, তোমরা হচ্ছো গিয়ে আজাদী মানুষ,
স্বাধীনভাবে নুনু নাচাও,
পুঁজিবাদি পণ্য ঐশ্বর্য রায়২কে কল্পনা করো;
কী সোন্দর,
নিজের ধর্মকে ফকফকা ভেবে মারো লাফ,
আহা হা, কী লাফায় দেশের মানুষ,
ভরতমাতা জিন্দাবাদ, ফাঁকিস্তা জিন্দাবাদ,
বাঁচতে হলে অস্ত্র চাই, ঘাস খেয়েও অস্ত্র চাই,
হিন্দুস্তা ফাঁকিস্তার পরমাণু বোম চাই,
মারহাবা মারহাবা, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ,
পরমাণু বোম জিন্দাবাদ, গান্ধিবোমা জিন্দাবাদ।

কিনতে হবে ফরাসি পারফিউম, ফরাসি জংগি বিমান;
মাগার শরীরেও জমেছে মেদ,
আহা হা হা কী সোন্দর নিতম্ব ভরতীয় মরদ ও মাগীর
কী সোন্দর ইন্দিরার উরু
পরমাণু বোমার মতো ইন্দিরার দুই উরু।

এক কবি বক্তৃতা কপচাচ্ছেন
কীসের এতো অমিল
সব মরদেই ভালোবাসার ভান করে,
সব দাসমালিকই অভিনয়ে মহান;
তারা টাকা হাতে নিয়ে খুঁজেছিল হেরেম ও উপপত্নি
খোজা পাহারাদারের ইতিহাস লেখে যারা,
তারা আকাশে চুমু খেতো,
কপালে আঘাতের চিহ্ন,
দুজন পালাল দেশ ছেড়ে,
জংগলে আশ্রয় নিলো, শিকারীর বেশ,
গোত্র আর সন্তানবৃদ্ধির ফল এসে গেল পশু পালনে;
ডাকাতি শুরু করল পাশের গ্রামে
অস্ত্র আর অস্ত্রগুদাম, যুদ্ধবিদ্যা, যোদ্ধাবাহিনী ও অস্ত্রে পারদর্শিতা।
পাশের বা দূরের গ্রামগুলোতে আক্রমণ, হরিলুট,
দ্বিদলীয় ভাগ বাটোয়ারা, শক্তি ও খনিজ সম্পদে;
সবই বিলাস, ভোগ আর ক্ষমতার খেল।

আর কয়েকজন অধিকার অধিকার সমতা স্বাধীনতা বলে লড়ে গেল
যুগ যুগান্তরে।

এবং শত শত সুবিধাবাদি বক্তব্য রাখছেন
রাজা আসছেন রাজা আসছেন
সবাই আকাশের দিকে হা করে তাকাও
রাজা তোমাদের মুখে থুথু ফেলবেন
আর যাদের অসুখ করেছে তারা
রাজার থুথুমিশ্রিত পানিপড়া খাও
তেল পড়া মাখো, সব অসুখ বন্দ হো যায়েগা।
বাচ্চা লোক লাগাও তালিয়া।

রাজা কহিলেন ‘হাগবো’
জমিদার পুরোহিত আমলারা
রাজার পশ্চাতের ফুটোয় একটি কৌটা ধরলেন,
পরিত্যক্ত কৌটা ভর্তি সম্পদ শুটকি বানিয়ে সংরক্ষণ করা হবে।
সুবিধাভোগীরা শ্লোগান ধরলো মারহাবা রাজা, জিন্দাবাদ রাজা;
রাজা কহিলেন, আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ শুটকি দিলাম পুটকি দিয়ে
আর কোনো রাজা এইরকম দিতে পারবে না,
আজ থেকে গোটা পৃথিবী শুটকি পূর্ণ হলো।

দুর্গন্ধে পূর্ণ থাকল সমস্ত সামন্ত আর পুঁজির কলঙ্কিত যুগ।

টিকা

১. হরি সিং (২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৯৫ – ২৬ এপ্রিল ১৯৬১) ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের শেষ সামন্তবাদী, যার স্বাধীনতার ইচ্ছা ভরত-ফঁকিস্তনের শাসকদের কারণে ব্যর্থ হয়।
২. ঐশ্বর্য রায় আধুনিক বর্বর যৌন ব্যবসায়ী অভিনেত্রী।

⬅️ আগের কবিতা📜 সূচিপত্রপরের কবিতা ➡️

কবিতাটির সংক্ষিপ্ত সাহিত্যিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ

‘পরমাণু ও সাম্প্রদায়িক বোম’ কবিতাটি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, উগ্র বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় উন্মাদনা এবং শাসকগোষ্ঠীর চরম নৈতিক ও চারিত্রিক দেউলিয়াত্বের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রগতিশীল সাহিত্যিক চাবুক।

  • উগ্র জাতীয়তাবাদ ও পারমাণবিক উন্মাদনা: কবিতার প্রথমাংশে ভারত ও পাকিস্তানের শাসকশ্রেণীর ছদ্মবেশী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিকে নগ্ন করা হয়েছে। মেহনতি মানুষকে ‘ঘাস খেয়েও অস্ত্র চাই’ এর মতো উগ্র জাতীয়তাবাদী আফিমে বুঁদ করে রেখে কীভাবে পারমাণবিক বোমা ও বিদেশী যুদ্ধবিমান কেনার উৎসব চলে, কবি তা তীব্র ব্যঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন।
  • পরাধীনতা ও শোষণের ইতিহাস: কাশ্মীর ও মনিপুরের নিপীড়িত জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বুর্জোয়া ও কর্পোরেট পণ্যায়নের (যেমন: ঐশ্বরিয়া রাইকে কল্পনা করা) মোড়কে আড়াল করার শাসকশ্রেণীর ধূর্ত নীতিকে কবি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় কীভাবে আদিম গোত্রীয় সামন্তবাদ থেকে আধুনিক দ্বিদলীয় ভাগ-বাটোয়ারার পুঁজিবাদী যুগের সৃষ্টি হয়েছে, তার এক নিপুণ রাজনৈতিক রেখাচিত্র এখানে আঁকা হয়েছে।
  • শাসকগোষ্ঠীর ভণ্ডামি ও ক্ষমতার প্রহসন: কবিতার শেষাংশে ‘রাজা’ ও তাঁর চাটুকার পুরোহিত-আমলাদের রূপকে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত পচনশীল চিত্র আঁকা হয়েছে। বুর্জোয়া ক্ষমতার দম্ভ, লুণ্ঠন ও দুর্গন্ধময় শাসনকে সাধারণ জনগণের সামনে কীভাবে ‘ঐশ্বর্য’ বা ‘শুটকি’ হিসেবে মহিমান্বিত করা হয় এবং সাধারণ মানুষকে অন্ধ আনুগত্যের শৃঙ্খলে বেঁধে রাখা হয়, কবি তা চূড়ান্ত ও রূঢ় বাস্তবতায় উন্মোচন করেছেন।

ফুটনোট: কবিতাটি পূর্বে ২২ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে লেখকের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী অনলাইনে ফুলকিবাজ.কম সাইটে কাব্যগ্রন্থ আকারে একটি পোস্টে প্রকাশ করা হয়। আজ ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একক কবিতা আকারে আপডেট করে প্রকাশ হলো।

Leave a Comment