মৃত্যুকুপের মাঝে বাঁচার ধুর্ততা

বাঙলাদেশের গ্রামে এলো
আঠারো বছরের কিশোর, জগতের দুঃসহ১ বোঝা কাঁধে নেবে।
আর সুবিধাবাদীরা হ্যাচারি খুলছে অনেক,
প্রতিবাদ ও বামপন্থার হ্যাচারি, প্রতিবাদে আয় প্রচুর,
বৈঠকখানায় চর্চা করে ধান্দামুলক বস্তুবাদ,
কতো টাকা আয় হলো গোপনে ডলার ব্যবসা করে,
কতো টাকা আয় হলো শেয়ারে সফল লগ্নি করে।
জীবনতো একটাই বাকিসব কিছু হচ্ছে ফাঁকা
শ্রেণিভিত্তিক সমাজে গরিবী সরিয়ে কামাই করো টাকা।

তাই আমরা ৫১তম ছোট যমুনা২ পেরিয়ে
জাতীয় বাজেট, জমা খরচ, ভুল হিসাব ঠিক করে লিখলাম;
তোমাদের জীবন নিয়ে কবিতা লিখবো বলে খাতা কলম কিনেছি
কবিতাকে সংগে নিয়ে রাস্তায় নেমেছি;
অথচ আমাদের সামনে ছিলো ঋষি বা সন্ত বা গান্ধী ভাসানীর মতো পীর,
আমরা এগোতে পারিনি,
প্রেমিকার সংগে দেখা হলে দৌড়ে পালাতে পারিনি;
রামসাগর বা দুর্গাসাগরের তীরের অমূল্য
সম্পদ কেড়ে নিয়ে গেছে বিত্তবান পুরুষেরা,
নিঃস্ব আমরা প্রেমিকাকে বাঁচাতে পারিনি ভূমিদাসী শ্রমদাসীর কবল থেকে।
শুধু ভেবেছি, জনতার মূল্যবান সবকিছু কীভাবে হারিয়ে যায়,
চোরাকাদায়,
কীভাবে গড়ে উঠে উপশহর, প্রাসাদ – সাংহাই, গুলশানে;

সকালে রুটি ভালবাসি
বাসে চড়ে শহরে যাওয়া,
লোকাল ট্রেনে চড়ে ভিক্ষেতে,
এ দুটোই দশ বছরের প্রেম,
নতুন মুঠোফোনে তোমার সংগে গল্পে সারারাত,
ভুলে যাওয়া প্রথম পরিচয়ের গল্প,
প্রেমিকার ঘরে কিছুক্ষণ দুবাহুর বিহ্বলতার গন্ধে ভীত।

তারও ছয়মাস পরে রটে গেলো যৌন হয়রানির অভিযোগ,
সাংবাদিকের ছোটাছুটি, খবরের কাগজের টানা হেঁচড়া
কেমন কেমন মাংস মাংস গন্ধ
দুটি পুলিশ ও তদন্তকারি
আজেবাজে প্রশ্নোত্তর পর্ব,
হালকা ঘুমের শেষে টেলিফোনের বেজে ওঠা,
গানের সংগে অদ্ভুত মিল প্রেমিকার দেহের ও পায়ের,
ভালোবাসার জন্যে ১০৮টা নীল পদ্ম
কুটিকুটি করে ছেঁড়া,
নাটুকে সর্ম্পক ধ্বংসের টানাপোড়েনে ভুগে শেষ হলো,
আইন প্রনেতারাও নাটক দেখে,
যদিও একদা তারাই ছিল নাটকের বিষয়;
কী নয়া নেতা, কীভাবে উঠে এলে, কীভাবে ভোট পেলে
উত্তরে নেতা বললেন ‘ওই যে দেখছেন হাজতখানা,
ওইখানে বহুবার যাতায়াত ছিলো তো
তাই আমি এখন মানুষের গান গাই’।

সাম্রাজ্যবাদীরা যখন পুঁজিপতির বন্ধু তখন
এই গল্পকথকের বন্ধু জলফড়িঙ, ঘাসফড়িঙ, কালো পিঁপড়ে,
মাঠের মজুর, করাতশ্রমিক, হাতুড়ি বাটালিঅলা, নির্মাণ শ্রমিক,
জেলের ছেঁড়া জাল, মাছরাঙার ঠোঁট আর শিকলপরা মনুমেন্ট;
সেইসব প্রাণী ও বস্তুর সংগে ঘুমিয়ে
আমি জেনেছি সবাই কথা বলে, জানায় অভিজ্ঞতা;
আমার কেওকারাডঙ, গারো পাহাড়, মহাস্থানের ধূলিকণা,
আমাকে বলে চালাও সাইকেল, চালাও গল্প।

আর আমি দেখলাম
হাতে মুখে বুকে খোসপাঁচড়াঅলা শেষ মোগল সম্রাট
বাহাদুর শাহ জাফর৩ পার্বতীপুর জংশনে ছদ্মবেশে
ইংরেজদের হাত থেকে পালাচ্ছেন আর পরিকল্পনা করছেন
কীভাবে বাঁচবেন এই তীব্র জোস্নালোকিত রাতে,
তিনি মুখে করুনভাব ফুটিয়ে আমার চোখে তাকিয়ে
দুটি টাকা চাইলেন,
আমি তাকে মাফ করে দিতে বললাম যেনো
আমি একুশ শতকের শেষ অপরাধী;
তুমি পালাবে কোথায়, তুমি যেই হও
বনসাই বা বটবৃক্ষ;
তোমাকে আমরা ঠিক ঠিক মধ্যরাতে চিনে নিতে চাই,
তুমি ফালতু এখন, অথচ হৃদয়ে ছিলো সমগ্র ভরত সমগ্র মানুষ,
তোমার বন্ধু কুড়ি শতকে পরিপূর্ণ স্বামী ও সাঙসারিক
ভালোবাসায় ঋদ্ধ ভোরে একাকি লাঙল কাঁধে মাঠে যেত;
শিশুটি মাঠে নিয়ে গেছে বাবার খাবার, জগ হাতে
তোমার বন্ধু গান গেয়েছে ওকি গাড়িয়াল ভাই বা
সারাজীবন বাইলাম নৌকা নদীর ঘাটে পইড়া;
আর বিশ শতকে তোমার আরেক বন্ধু বব ডিলান৪
রেল স্টেশনের পর স্টেশন করেছে ভ্রমণ টিকেটবিহীন
গেয়েছে গান ‘আগামি বিশ্ব ডাকছে এ মানচিত্র বারবার কাঁপছে’
লিখেছে গান আসছে আসছে বৃষ্টি আসছে বৃষ্টি তোলপাড়,
তোমার বন্ধু জেলা শহরে গিয়ে প্রথম সিনেমা দেখেছিলো
গ্রামের যাত্রাপালা ও অশ্লীল নাচ—কিংবা কবিগান
সেসব বহু আগের কথা, এখন তারা টিভি আর সিডি ডিভিডি
কী মজা, জুলিয়া বা জুলিয়েটরা সখিনা রহিমাদের
সরালো গ্রাম থেকে, ইংরেজি সিনেমায় আধুনিকতা,
ইংরেজি গানের ছন্দ ফিরে এলো হিন্দি গানে আর
প্রভুত্ব এলো, এলো খবরদারি
এলো হাসির টিভি চ্যানেল, হাসলে হার্টের আয়ু বাড়ে কী না,
শুধু মানুষের আয়ু বাড়ে না; বায়ু বাড়ে,
হাসে আর হাসে আর হাসে
আর বারুদ বাসায় রাখে
যে কোনো সময় আগুন জ্বালাতে হতে পারে;
সে আগুন জ্বলছে না হাজারো আহ্বানেও,
তথাপি আগুনের সংগে বেগুনের মিল ভর্তায়,
বাংলাদেশের সেনাবাহিনি কৃষকের বউয়ের আচার ভর্তা চেনে না
তারা লেফট রাইট বোঝে,
ডানে টাইট করে নিজেদের;
তারা ডানপন্থি সেনাবাহিনী,
বিচারহীন মৃত্যু; —ক্রসফায়ার, হার্ট এ্যাটাক, এনকাউন্টার
দেখে কে আর ভয় পায়;
মারো, মানুষ মারা আর মুরগি মারা একই কথা;
ছয় মাসে ৬০০ জন, সামরিক অসামরিক ট্রাইবুনালে আরো হাজার দেড়েক;
প্লেগাক্রান্ত ইঁদুরের মতো তারা মারা যাবে,
আসবে না প্রেমিকারা কোনোদিন বাঁচাতে তাদের
ইন্দিরাও মারলো নকশালদের
বাকশালীরাও মারলো নকশালদের;
বাড়েনি সমাজবাদ ধর্মনিরপেক্ষতা,
বেড়েছে ধর্ম ব্যবসা;
ইলেকশনের আগে তসবি টুপি মাজার পুজা
পথ বানাও শুধু আর একবার ভোট চাই
দশবার পাঁচবার নয়, হাজার হাজারবার
দল দুটি নানা ছলে জনগণকে ভেজে খেলো
শুধু একজন পরদেশির পচা সাহায্য দেখিয়ে বললো
‘বাঙাল বাল খাতা হ্যায়’
আর হিসাব করলো কতদিন বন্দি কাটলো
তিন খাতা চারখাতায়;
এ-বাঙলায় সমস্ত বাঙালির
রাজনীতি কীভাবে হলো ভুলে ভরা নীতি
নীতিবিদ্যা শেখাও কাদের শেষরাতে,
কামসূত্র সব শিশুদের হাতে,
বুঝলে তো গুটু গুটু বাবু এইডস আর মূল্যবোধ চলে না এক সাথে
যদিও অস্ত্রশিক্ষা চলে বিশ্ববিপনিবিতানে।

দুর্বল করো না কাউকে
শক্তি দাও দ্রুত পায়ে দৌড়ানোর, দুর্বলকে বাঁচার
শক্তি হোক শক্তি হোক জয় হোক জনগণের
বিজয় দেখতে গিয়ে আবার ভাঙন দেখা
শহরে হাঁটতে গিয়ে পথ না পাওয়া অসীম রাত
স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে ডানা ঝাপটানো
হায়রে খাঁচা, আবার অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে মারা,
আবার মুক্তিযুদ্ধ আবার পতন;
পতনকে পাঠাবে কোথায়, নেই তো উত্থান,
শ্রমিক চাইলে সুবিধা দেখে বাক্য গঠন করা যেত,
আমার মনের মতো করে লেখা হতো ক্রিয়াপদ;
ভাষাকে করলে সহজ সবাই এগিয়ে যায়;
উন্মত্তকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা
সৃষ্টির নেশায় বিভোর সমাজশিল্পী
সেই একেঁছিল নীচতা হীনতা আর
উঠে দাঁড়াবার প্রবণতা।

টিকা :

১. ‘আঠারো বছর বয়স’ কি দুঃসহ হচ্ছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা, আঠারোতে নেমে আসবে দেশে আগুনের হলকা, এরকম কামনা বাস্তবে হামাগুড়ি দিচ্ছে আজো।
২. ছোট যমুনা হচ্ছে উত্তরবঙ্গের একটি ছোট নদী, যেটি দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
৩. বাহাদুর শাহ জাফর (২৪ অক্টোবর ১৭৭৫–৭ নভেম্বর ১৮৬২) ছিলেন সামন্তবাদী এবং মুঘলদের শেষ নির্বোধ সম্রাট। সিপাহী বিপ্লবের শেষে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বর্বর নরপিশাচ ব্রিটিশ শাসকেরা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
৪. বব ডিলান (জন্ম ২৪ মে, ১৯৪১) একজন নামকরা নৈরাজ্যবাদী শান্তিবাদী মার্কিন গায়ক, গীতিকার, সুরকার, এবং একই সঙ্গে একজন কবি, লেখক ও চিত্রকর।

⬅️ আগের কবিতা📜 সূচিপত্রপরের কবিতা ➡️

কবিতাটির সংক্ষিপ্ত সাহিত্যিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ

‘মৃত্যুকূপের মাঝে বাঁচার ধূর্ততা’ কবিতাটি মূলত বুর্জোয়া সমাজের রাজনৈতিক পচন, তথাকথিত ছদ্মবেশী প্রগতিশীলদের ধান্দাবাজি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং প্রান্তিক মানুষের অবিরত শৃঙ্খলিত হওয়ার বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ইশতেহার।

  • ছদ্মবেশী বামপন্থা ও সুবিধাবাদ: কবিতার শুরুতেই কবি প্রগতিশীল আন্দোলনের ভেতরের একশ্রেণীর ‘মহাভণ্ড’ সুবিধাবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন, যারা মুখে ‘ধান্দামূলক বস্তুবাদ’ চর্চা করলেও গোপনে ডলারের ব্যবসা ও শেয়ার বাজারে সফল লগ্নি করে বিত্তের পাহাড় গড়ে। রামসাগর বা দুর্গাসাগরের মতো প্রাকৃতিক ও অমূল্য লোকজ সম্পদ কীভাবে ধনী বুর্জোয়াদের দ্বারা লুণ্ঠিত হচ্ছে এবং কীভাবে সর্বহারা শ্রেণীর রক্ত চুষে গুলশানে উপশহর ও বিলাসবহুল প্রাসাদ গড়ে উঠছে, কবি তা সুনির্দিষ্টভাবে দেখিয়েছেন।
  • সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক রূপক: কবি এখানে শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে পার্বতীপুর জংশনে ছদ্মবেশে ইংরেজের হাত থেকে পালানোর রূপকে এনে উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। পাশাপাশি বব ডিলানের গান ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার সমান্তরালে আধুনিক স্যাটেলাইট ও হাসির টিভির মাধ্যমে কীভাবে গ্রামীণ সংস্কৃতির টুঁটি চেপে ধরে সাম্রাজ্যবাদী ও কর্পোরেট খবরদারি চালানো হচ্ছে, তার চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন।
  • রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: কবিতার শেষভাগে এদেশের চিরচেনা বিচারহীনতার রূঢ় বাস্তবতাকে কবি সাহসিকতার সাথে চাবুক মেরেছেন। ‘ক্রসফায়ার’, ‘হার্ট অ্যাটাক’ কিংবা ‘এনকাউন্টার’ এর মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতিকে কবি ‘প্লেগাক্রান্ত ইঁদুর’ বা ‘মুরগি মারা’র মতো তুচ্ছ বিষয়ে রূপান্তরের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ভারতের নকশাল আন্দোলন দমনের ইতিহাস এবং এদেশের দ্বি-দলীয় রাজনীতির ‘জনগণকে ভেজে খাওয়ার’ নীতি, ভোটের আগে নেতাদের তসবিহ-টুপি ও মাজার পূজার ভণ্ডামিকে কবি চূড়ান্ত ব্যঙ্গে ধূলিসাৎ করে দিয়েছেন। তবে সমস্ত পতন ও অন্ধকারের খাঁচাকে চূর্ণ করে কবি শেষ পর্যন্ত জনগণের উত্থান, শ্রেণী লড়াই ও নতুন এক প্রগতিশীল সৃষ্টির স্বপ্নে সমর্পিত হয়েছেন।

ফুটনোট: কবিতাটি পূর্বে ২২ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে লেখকের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী অনলাইনে ফুলকিবাজ.কম সাইটে কাব্যগ্রন্থ আকারে একটি পোস্টে প্রকাশ করা হয়। আজ ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একক কবিতা আকারে আপডেট করে প্রকাশ হলো।

Leave a Comment