আমাদের বাড়ির এক লেজহীন বানর জিগাইল ‘আমি জানতে চাই’
অথচ সক্রেতিসের কথার সাথে মোরগের কথা
কোনোদিনই মিলবে না,
কারণ ভাষাই পরম প্রেম ভাষাই প্রতীক
তোমাকে ভেবেছে যারা সবাই লিখেছে ভাষা
ভাষাই সবার বেড়ে রাজদুলালি
ভাষাই সর্বশ্রেষ্ঠ সর্ব শক্তিশালি
ভাষাই তোমাকে ডাকে অভিজ্ঞতার ঘরে
ভাষাই তোমাকে নেয় রাতদুপুরে
ভাষাই শোনায় রাজ পথের গল্প
সিটি বাজানো হকারের বিকল্প
তাঁর যৌনানুভুতি, অন্যান্য ব্যর্থ অনুভুতি।
খুঁড়িয়ে হাঁটা ভিক্ষুক, হাবা শিরোমনি মুর্খ
কুঞ্চিত কেশাগ্রে প্লেটোর প্রেতাত্মা খুঁজে কিছুই পাবে না,
সে বোঝেনি মীরকাশিম দিল্লি শহরে কী কারণে ভিক্ষা করে,
শরৎচন্দ্র কেন রেঙ্গুনে স্বদেশির মঙ্গলচিন্তায় ব্যস্ত,
এইসব সাধারনের তেমন শক্তি থাকে না পুঁজির পোদ্দারিতে;
একালে কেবল শ্রমশক্তি বিক্রি করা যায়,
শ্রমদাসরা শক্তি পাবে তখনই যখন
কোনো রাজা ভাববাদি সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগবে না
কিংবা বলবে না আহা কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
দাসমালিকের আমলে
আর জনগন বলবে না ‘কী মজা
নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে অন্যের পদতলে’,
আর এখন চিন্তা ও দায়িত্ব বেড়ে গেছে
এর চেয়ে অনেক সহজ মাথার উপরে ছাতা পেলে
‘রক্ষা করেন বস, আপনেই প্রাচীন ঈশ্বর’।
আমরা কয়েকজন হাসতে পারি, হাসাতে পারি
কাঁদতে বা কথা বলতে বা গান গাইতে পারি
অভিজ্ঞতাকে লিখতে, সঠিক কাজে ব্যস্ত থাকতে পারি
নতুন একটি কবিতার বই তোমাদের হাতে দিতে পারি।
হাঁটতে বের হয়ে আমি দেখেছি
ভারতের মধ্যবিত্ত মানুষ এখন দুধে আলতা রঙে সাজতে বেরোয়
বিউটি পারলারে যায়, এদিক ওদিক তাকায়,
র্স্মাট তরুন তরুনিরা টিশার্ট মিনি স্কার্ট পরে
স্বস্বাধীনতায় ইটিশপিটিশ করে,
তারা গরুর গাড়ির বদলে হাওয়ার গাড়িতে চড়ে,
গরু পূজা করে,
অনুষ্ঠানে বেলুন ওড়ায়, টিভি ক্যামেরায় মুখ দেখে
এই তরুনিরা পুঁজি ও যুদ্ধের সংগে পাল্লা দিয়ে
নিজেদের নিতম্ব, স্তন ও উরুকে সঠিক মাপে তৈরি করে,
এই তরুনেরা মাথাগুলোকে মোটা করে,
তৃপ্তির ঢেকুরের সংগে বের করে কার্বন মনোক্সাইড,
নিজের দম্ভে বিভোর, দখল করে আঞ্চলিক পুকুর নদী, সামুদ্রিক সম্পদ,
তারা হয়ে যায় প্রচলিত গেরুয়াসংঘী মানুষ,
তীব্রভাবে হারিয়ে যায়,
এইসব মধ্যবিত্ত তরুন তরুনিরা
নিজেদের পাছার ভার টানতে পারে না।
| ⬅️ আগের কবিতা | 📜 সূচিপত্র | পরের কবিতা ➡️ |
|---|
ফুটনোট: কবিতাটি পূর্বে ২২ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে লেখকের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী অনলাইনে ফুলকিবাজ.কম সাইটে কাব্যগ্রন্থ আকারে একটি পোস্টে প্রকাশ করা হয়। আজ ১২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একক কবিতা আকারে আপডেট করে প্রকাশ হলো।
কবিতাটির সংক্ষিপ্ত সাহিত্যিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ
‘গেরুয়া গরুর দাসত্ব’ কবিতাটি মূলত বুর্জোয়া সমাজের সাংস্কৃতিক পচন, উত্তর-ঔপনিবেশিক দাসত্ব, উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং কর্পোরেট পুঁজির শৃঙ্খলে পিষ্ট তরুণ প্রজন্মের বিকৃত আধুনিকতার বিরুদ্ধে এক তীব্র রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক চাবুক।
- ভাষা, দর্শন ও ঐতিহাসিক বিচ্যুতি: কবিতার প্রথমাংশে কবি ভাষাকে মানব অভিজ্ঞতার সর্বশ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। প্লেটোর ভাববাদ কিংবা সক্রেটিসের দর্শনের সমান্তরালে মীর কাসিমের দিল্লির রাস্তায় ভিক্ষা করা এবং শরৎচন্দ্রের রেঙ্গুন জীবনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে কবি দেখিয়েছেন—পুঁজির পোদ্দারির সামনে সাধারণ মানুষের অসহায়ত্ব কতখানি। আধুনিক সমাজে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন এদেশের রাজারা বা শাসকেরা ভাববাদী বা মানসিক দাসত্বে ভুগবে না এবং সাধারণ মানুষ শোষকের পদতলে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াকে ‘সুখ’ মনে করা বন্ধ করবে।
- উগ্র জাতীয়তাবাদ ও করপোরেট পণ্যায়ন: কবিতার দ্বিতীয়াংশে ভারতের সমকালীন মধ্যবিত্ত সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের ওপর কবি তীব্র আক্রমণ করেছেন। পশ্চিমা ভোগবাদ ও ফ্যাশনের অন্ধ অনুকরণে বিউটি পার্লার, টি-শার্ট কিংবা মিনি স্কার্ট কালচারের পাশাপাশি কীভাবে উগ্র ধর্মীয় অবক্ষয় (যেমন: গরু পূজা বা গেরুয়াসংঘী মানসিকতা) সমাজকে আচ্ছন্ন করছে, কবি তা নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পুঁজি ও যুদ্ধের সাথে পাল্লা দিয়ে করপোরেট বাজারের চাহিদামতো নিজেদের শরীরকে পণ্যে রূপান্তর করা এবং ক্ষমতার দম্ভে আঞ্চলিক ও সামুদ্রিক সম্পদ গ্রাস করার এক কদর্য চিত্র এখানে আঁকা হয়েছে। নিজের লালসা আর বিকৃত আধুনিকতার বোঝায় মগ্ন এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কবি তীব্র ব্যঙ্গে চিত্রায়িত করেছেন, যারা নিজেদের অস্তিত্বের ভার বইতেও আজ অক্ষম।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚