উপন্যাসের ইতিহাস ও বিবর্তন: বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী পরিক্রমা

ইউরোপ মহাদেশে, বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে উপন্যাস-যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে মূলত ড্যানিয়েল ডিফো’র বিখ্যাত কালজয়ী সৃষ্টি ‘রবিনসন ক্রুশো’র (১৭১৯) প্রকাশকাল থেকে। তবে অধিকাংশ সাহিত্য সমালোচকের মতে, ইংরেজি সাহিত্যের একদম প্রথম সার্থক ও খাঁটি উপন্যাস হলো স্যামুয়েল রিচার্ডসনের ‘পামেলা’ (১৭৪০)। গঠনগত দিক থেকে ‘রবিনসন ক্রুশো’ মূলত একটি রোমাঞ্চকর ভ্রমণকাহিনী বা অ্যাডভেঞ্চার স্টোরি হলেও, ‘পামেলা’ উপন্যাসে মানুষের ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে পরিবার ও সমসাময়িক সমাজের গভীর পরিচয় ও সম্পর্ক সুনিপুণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

ইংরেজি সাহিত্যের এই প্রথম যুগের পথপ্রদর্শক এবং উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ঔপন্যাসিক হলেন—হেনরি ফিল্ডিং (১৭০৭-১৭৫৪), স্যামুয়েল রিচার্ডসন (১৬৮৯-১৭৬১) এবং স্যার ওয়াল্টার স্কট (১৭৮১-১৮৩২)। এই প্রতিভাবান লেখকদের হাত ধরেই মূলত উপন্যাসের কাঠামো মজবুত হতে শুরু করে।

উপন্যাসের বিশ্বব্যাপী বিস্তার ও ধ্রুপদী যুগ

অষ্টাদশ শতাব্দীতে পা দিয়ে সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকাজুড়ে উপন্যাসের ব্যাপক বিস্তার ঘটে এবং এটি সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই ধারায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে জর্জ এলিয়ট (১৮১৯-১৮৮০), চার্লস ডিকেন্স (১৮২২-১৮৭০) এবং হেনরি জেমস (১৮৪৩-১৯১৬) উপন্যাসের প্রথম যুগের কয়েকজন শ্রেষ্ঠ ও সফল ঔপন্যাসিক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। এর পাশাপাশি বিশ্ব কথাসাহিত্যের ইতিহাসে রুশ সাহিত্যের কালজয়ী প্রবাদপুরুষ লিও তলস্তয়ের নামও এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে স্মরণ করা যেতে পারে।

ইংরেজি সাহিত্যের এই প্রথম যুগের এবং সামগ্রিকভাবে বিশ্বসাহিত্যের কয়েকটি শ্রেষ্ঠ ও ধ্রুপদী উপন্যাসের অনবদ্য দৃষ্টান্ত নিচে দেওয়া হলো:

  • ইংরেজি সাহিত্য: হেনরি ফিল্ডিং-এর ‘টম জোনস’, জেন অস্টেনের ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’, চার্লস ডিকেন্স-এর ‘ডেভিড কপারফিল্ড’ এবং এমিলি ব্রন্টির ‘উইদারিং হাইটস’।
  • ফরাসি সাহিত্য: গুস্তাভ ফ্লবেয়ারের সমাজ ও মনস্তত্ত্বের বিখ্যাত সৃষ্টি ‘মাদাম বোভারি’।
  • রুশ সাহিত্য: ফিওদর দস্তয়োভস্কির মহৎ সৃষ্টি ‘দি ব্রাদার্স কারামাজোভ’ এবং লিও তলস্তয়ের মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ ও ‘আনা কারেনিনা’।
  • আমেরিকান সাহিত্য: হেনরি জেমস-এর মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাসের উপন্যাস ‘দি পোর্ট্রেট অব এ লেডি’।

বিংশ শতাব্দী: আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আঙ্গিক বদল

বিংশ শতাব্দীতে পদার্পণ করে উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু এবং অভ্যন্তরীণ গঠনকৌশল নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিচিত্র ও যুগান্তকারী সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা লক্ষ্য করা যায়। এই যুগে সমারসেট মম, ডি. এইচ. লরেন্স, ভার্জিনিয়া উলফ, জেমস জয়েস, জ্যাঁ পল সার্ত্র এবং স্যামুয়েল বেকেট প্রমুখ বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক প্রথাগত নিয়মের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ নতুন নতুন ধারায় উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন। মূলত মানবসমাজের জীবনযাপন, মানুষের ধ্যান-ধারণা ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উপন্যাসের ভেতরের বিষয়বস্তুর যেমন আমূল পরিবর্তন ঘটেছে, তেমনি তা পাঠকদের সামনে পরিবেশন বা উপস্থাপন ভঙ্গিতেও যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিক রীতি (যেমন—চেতনাপ্রবাহ রীতি)।

সময়, সমাজ ও উপন্যাসের রূপবৈচিত্র্য

এ-প্রসঙ্গে এটি অত্যন্ত স্মরণীয় যে, উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ নির্ণয় ও এর বিষয়-আঙ্গিক বিচার সবসময়ই সমসাময়িক সময়, সমাজ এবং মানুষের রুচির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। যেমন—আয়তন, চরিত্র এবং ঘটনার বৈচিত্র্য ও বৈশিষ্ট্যের বিচারে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের তুলনামূলক ছোট আকৃতির সৃষ্টি ‘ওল্ডম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ (The Old Man and the Sea) এবং লিউ তলস্তয়ের সুবিশাল মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ (War and Peace) সম্পূর্ণ দুই ভিন্ন স্বভাবের সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও উভয়ই বিশ্বসাহিত্যে উপন্যাস হিসেবে সমভাবে স্বীকৃত ও সমাদৃত।

ঠিক একইভাবে হারমান মেলভিলের ‘মবিডিক’ এবং জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’, কিংবা বাংলা সাহিত্যের বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কপালকুণ্ডলা’ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’, কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মনস্তাত্ত্বিক সৃষ্টি ‘চাঁদের অমাবস্যা’ এবং শহীদুল জহির বা শহীদুল কায়সারের ‘সংশপ্তক’—আয়তন, চরিত্রায়ন এবং বিষয়বিচারে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও সবগুলোই কিন্তু সাহিত্যে উপন্যাস হিসেবেই চিহ্নিত ও বিশেষিত। এর প্রধান কারণ হলো, বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দিক থেকে এতটা ভিন্নধর্মী হওয়া সত্ত্বেও উক্ত প্রতিটি অমর গ্রন্থে উপন্যাসের মৌলিক কিছু সাধারণ লক্ষণ ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে, যার অকাট্য ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এই কালজয়ী গ্রন্থগুলো উপন্যাসের পর্যায়ভুক্ত হয়েছে।

উপসংহার: সংক্ষেপে বলা যায়, উপন্যাসের ইতিহাস হলো মানব সভ্যতারই রূপান্তরের ইতিহাস। ১৭১৯ সালে ড্যানিয়েল ডিফো’র হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সাথে সাথে সমাজ ও মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে ধারণ করে আজ এক সুবিশাল ক্যানভাসে রূপ নিয়েছে। ধ্রুপদী যুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগের বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের এই বিবর্তন প্রমাণ করে যে, এটি সাহিত্যের অন্যতম জীবন্ত ও গতিশীল একটি মাধ্যম—যা যুগে যুগে মানুষের জীবন ও রুচির পরিবর্তনকে ধারণ করে অমর হয়ে থাকবে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. বেগম আকতার কামাল, ভীষ্মদেব চৌধুরী, রফিকউল্লাহ খান ও অন্যান্য, বাংলা ভাষা: সাহিত্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, পুনর্মুদ্রণ ২০১১, পৃষ্ঠা ২৬-২৭।
২. রচনা ও প্রকাশকাল সংক্রান্ত টীকা: এই প্রবন্ধটি প্রথম ১৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে অনলাইন পোর্টাল ফুলকিবাজ.কম-এ প্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর আজ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বর্তমান ডিজিটাল সংস্করণের জন্য লেখাটি সম্পূর্ণ পরিমার্জন, পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংস্কার ও উন্নত সংস্করণে রূপান্তর করা হলো।

Leave a Comment