লোককথা, লোক সঙ্গীত মানব অভিজ্ঞতার সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার। বহু বর্ণে রঞ্জিত ও প্রসারিত হয়ে এর মাধ্যমে সমসাময়িক বীরেরা আমাদের সামনে ধরা দেন। রাশিয়া, চীন বা আফ্রিকা সবদেশের লোককথা, লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে এ কথা একইভাবে প্রযোজ্য।
১৯৩৭ সালে মস্কোর আশপাশ থেকে শ্রমিক, কৃষক, শিল্পী ও যুবকেরা এসে জড়ো হয়েছিল বলশয় থিয়েটারে। তারা এসেছিল প্রতিভাময়ী তামারা খানুমের পরিচালনাধীন উজবেক ন্যাশনাল থিয়েটারের একটা অনুষ্ঠান দেখতে। আধুনিক ও প্রাচীন বাদ্যযন্ত্রে ভর্তি বিশাল অর্কেস্ট্রা। মুসোরাস্কি, চাইকোভস্কি, প্রকোফিয়েভ, শোস্টাকোভিচ, ক্রেনিঘভ, গ্লিয়েরের সঙ্গীত ঐতিহ্যের সাথে উজবেকিস্তানের প্রাচীন সমৃদ্ধ সুরের অভূতপূর্ব মিশ্রণ ঘটানো হয়েছে এই অর্কেস্ট্রায়।
হঠাৎ সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাত তালি দিয়ে উল্লাসে চিৎকার করতে শুরু করলো। দেখলাম সবার মুখে হাসি। শিশুরাও হাত নাড়ছিল। ডান দিকের একটা বক্সে দাঁড়িয়েছিলেন মহান স্তালিন। মুখে হাসি। দর্শক ও শিল্পীদের তিনি হাত তালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন।
মনে পড়ছে, আমিও হাসি মুখে হাত নেড়েছিলাম। আমার চোখ দিয়ে নীরবে অশ্রুমালা ঝরে পড়ছিল। মনে হলো, এই সেই মানুষ যিনি সবাইকে জড়িয়ে ধরে আছেন। তার সহৃদয়তার উষ্ণতা যেন আমি অনুভব করতে পারছিলাম এত দয়ালু! একটা নিরাপত্তার অনুভূতি যেন সারা দেহে বয়ে গেল। এখানে একজন আছেন যিনি জ্ঞানী ও যোগ্য। প্রতিদিন তার পথনির্দেশ লাভ করছে এটা সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার সৌভাগ্য। আমার ছেলে পাউলিকে উঁচু করে ধরলাম যাতে সে এই বিশ্ব নেতাকে অভিনন্দন জানাতে পারে। কারণ পল সোভিয়েতে মস্কো বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।
অনিন্দ্যসুন্দর অনুষ্ঠান শুরু হলো। প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের পাওনা হলো একটা পরম আনন্দের অনুভূতি। কণ্ঠ বা বাদ্যযন্ত্রের একক বা সমবেত অনুষ্ঠান ছিল অভূতপূর্ব মৌলিক। চিরায়ত বা লোকনৃত্যের ক্ষেত্রেও একথা বলা চলে। কয়েক বছর আগে ১৯১০ বা ১৯১৫ সালে এটা কি সম্ভব হতো? তখন এরা ছিল অর্ধ ভূমিদাস। তাদের সংস্কৃতির প্রকাশ ছিল নিষিদ্ধ। জারের নির্যাতনের বুটের তলায় তাদের সুমহান ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছিল।
এখানে একজন দেখতে পাবেন বহিরঙ্গে জাতীয় কিন্তু মর্মবস্তুতে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির রূপ। এখানে এমন মানুষের সন্ধান পাওয়া যাবে যারা এশিয়া ও পূর্ব-পশ্চিম আফ্রিকার বাসুতো উপজাতির সাথে তুলনীয়। কিন্তু এখন তাদের জীবন বিশ বছর ধরে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন লেনিন-স্তালিনের দক্ষ পরিচালনায় বিকশিত হচ্ছে। জাতীয় সংখ্যালঘুদের বিকাশের ক্ষেত্রে, গ্রেট রাশিয়ানদের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে স্তালিন একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এবং এখনও করে চলেছেন।
পরবর্তীকালে পিছিয়ে পড়া মানুষের কী কী পরিবর্তন হয়েছে তা নিজের চোখে দেখার জন্য আমি ঘুরে বেড়িয়েছি। পশ্চিমে (ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পর্তুগাল, হল্যান্ড), আফ্রিকায় এশীয়দের এত পিছিয়ে পড়া বলে ধরে নেয়া হয় যে, বলা হয় শত শত বছর কেটে যাবে এইসব উপনিবেশগুলির আধুনিক সমাজের অঙ্গ হতে।
কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ইয়াকুৎস, নেনেৎসেস, কিরঘিজ, তাজিক প্রভৃতি উপজাতিদের মর্যাদা দেয়া, সাহায্য করা হয়। এর ফলে সমাজতান্ত্রিক এই দেশে তারা খুব তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলেছে। আমেরিকার নিগ্রোরা যা প্রতিদিন শুনে থাকে তেমন শূণ্যগর্ভ প্রতিশ্রুতি নয় মর্যাদা দেয়া হয় বাস্তবে। যেমন বলা যায়, উজবেকিস্তানের মরুভূমিকে তুলা উৎপাদনের শস্য শ্যামলা ক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। আমার এক পুরোনো বন্ধু, মিস্টার গোল্ডেন, ট্যাক্সেগিতে কার্ডেরের অধীনে প্রশিক্ষিত হয়ে এই তুলা উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৪৯ সালে তাঁর মেয়েকে আমি দেখেছি। এখন বড় হয়ে গর্বিত সোভিয়েত নাগরিক হিসাবে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। আজ কোরিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকায় কোটি কোটি নির্যাতিত ঔপেনিবেশিক মানুষ স্বাধীনতার দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কী বীরত্ব, কী আত্মত্যাগ, কী দৃঢ়চিত্ততা! বিজয়ী না হওয়া পর্যন্ত যেন বিশ্রামের সময় নেই।
এদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে তথাকথিত মুক্ত পশ্চিমের সম্মিলিত শক্তি। নেতৃত্বে আছে আমেরিকার লোভী, মুনাফাখোর, যুদ্ধলোলুপ ও ধনকুবের গোষ্ঠী। আশু মুনাফার জন্য ‘মার্কিন শতাব্দী’র মোহ তাদের অন্ধ করে রেখেছে। এই সত্য তারা দেখতে পায়নি যে সভ্যতা তাদের ফেলে বহুদূর এগিয়ে গেছে — আমরা বাস করছি জনগণের শতাব্দীতে — ইউরোপের পূর্ব দিগন্তে এবং গোটা বিশ্বে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে উজ্জ্বল নক্ষত্র। পরাধীন দেশের মানুষ এখন তাকিয়ে আছে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের দিকে। তারা দেখছে, তাদের মতো সাধারণ মানুষ মহান স্তালিনের নেতৃত্বে নতুন জীবন খুঁজে পেয়েছে। তারা দেখছে, সোভিয়েতের নেতৃত্বে ও সাহায্যের মাধ্যমে মাও সেতুং-এর নতুন চীন শক্তিশালী ও বিকাশমান সমাজতান্ত্রিক জীবন ধারায় সুবিশাল বল সঞ্চার করেছে। তারা দেখছে, পূর্ব ইউরোপের পূর্বতন আধা ঔপনিবেশিক দেশগুলো জনগণের শক্তির উপর ভর করে, জনগণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র তৈরি করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করছে। বাস্তব ও তত্ত্বগত উভয়ক্ষেত্রে তাদের মহাবন্ধু জোসেফ স্তালিনের সুদক্ষ পরিচালনার ফলেই এই প্রগতি সম্ভব হয়েছে।
গল্পে গাথায় তাঁর প্রশস্তি তারা গেয়েছে, গাইছে এবং গাইবেও। স্তালিন মহান। চিরকাল সবদেশেই তাঁর নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে। আধুনিক জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই স্তালিনের প্রভাব বিস্তৃত ও গভীর। বিগত বছরগুলোর মতো তাঁর সহজ সাবলীল ভঙ্গিতে লেখা দিকনির্দেশকারী সুসংহত শেষ রচনায় তিনি বিশ্ব সমাজবিজ্ঞান সম্পর্কে যে জ্ঞান রেখে গিয়েছেন তা আজও অমূল্য। শ্রদ্ধার সাথে একজন বলতেই পারে, মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্ট্যালিন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ মানবতার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ।
হ্যাঁ, তাঁর গভীর মানবিকতা ও সুগভীর উপলব্ধির দ্বারা তিনি রেখে গিয়েছেন পর্বতমালা মূল্যবান ঐতিহ্য। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংগ্রামে পথনির্দেশ রেখে গিয়েছেন। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন শান্তি, বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃ তিক সম্পদের বন্ধুত্বপূর্ণ আদান-প্রদান, যুদ্ধ ও ধ্বংসের অবসানের পথ। নিরবিচ্ছিন্নভাবে, ধৈর্য ধরে হৃদয়বত্তা ও জ্ঞানের সাহায্যে শান্তি ও ক্রমবর্ধমান প্রাচুর্যের জন্য তিনি সংগ্রাম করে গিয়েছেন। দুঃখ ভারাক্রান্ত কোটি কোটি মানুষকে এই পৃথিবীতে রেখে তিনি চলে গেলেন।
কিন্তু তিনি জানতেন, সংগ্রাম চলবেই। তাঁর মহতী দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আসুন আমরা গর্বের সাথে ধীরে ধীরে মাথা তুলে দাঁড়াই এবং শান্তি ও সবার জন্য আনন্দময় জীবনের লক্ষ্যে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলি।
প্রগতিশীল সুরকার লুই অ্যালানের প্রেরণাদায়ী ভাষায় বলি,
“হে প্রিয় কমরেড, শপথ নিলাম
সংগ্রাম চলবে, সংগ্রাম চলবেই।”
আরো পড়ুন
- মহান স্তালিনের নেতৃত্বে নতুন জীবন পেয়েছে মানুষ — পল রবসন
- দিমিত্রি নালবান্দিয়ান: সোভিয়েত ইউনিয়নের কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী
- একটি সর্বহারা মিলিশিয়া বাহিনী
- প্রেসনেয়া জেলার জনসভায় বক্তৃতা
- কৃষক প্রতিনিধিদের কংগ্রেস
- সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে লেনিনবাদী বলশেভিক পার্টির ভূমিকা
- সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘর — পল রবসন
- সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্রের ইউনিয়ন
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. নিবন্ধটি পল রবসন রচিত এবং সাম্যবাদ নভেম্বর ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত। ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশের সময় কিছু বানান শুদ্ধ করা হয়েছে।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚