কৌটিল্যের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে রাষ্ট্র, প্রশাসন, অর্থনীতি ও দণ্ডনীতি সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা

কৌটিল্যের রাষ্ট্রচিন্তা (ইংরেজি: Political views of Kautilya) হচ্ছে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতি, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল, শাসকের ভূমিকা, অর্থনীতি, দণ্ডনীতি, আইন ও ন্যায়বিচার, কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কিত চিন্তাভাবনা। তাঁর এসব চিন্তাধারার মূল উৎস তাঁর রচিত অর্থশাস্ত্র গ্রন্থ। নামে অর্থশাস্ত্র হলেও গ্রন্থটি মূলত শাসকের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতি বিষয়ক কৌশলের পরামর্শের ভাণ্ডার। উক্ত গ্রন্থে কৌটিল্য রাজনীতি ও রাজ্যশাসন প্রণালীর নানা দিক বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। রাজনীতি ও প্রশাসনের এমন কোনো দিক নেই যা অর্থশাস্ত্রে আলোচিত হয়নি।

কৌটিল্যের রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে  

রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে কৌটিল্য চুক্তির অনিবার্যতা স্বীকার করেছেন। শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে জনগণের ইচ্ছার ফলশ্রুতি হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রহীন অবস্থার মাৎস্যন্যায় থেকে পরিত্রাণের জন্য জনসাধারণ মনু বৈবস্বতকে রাজা নির্বাচিত করেছিল এবং উৎপাদনের ষষ্ঠাংশ করস্বরূপ নির্ধারণ করেছিল। বিনিময়ে রাজা প্রজাসাধারণের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাজার প্রধান কর্তব্যই হচ্ছে দণ্ডবিধান করা যাতে বর্ণাশ্রমধর্ম রক্ষা পায়। কৌটিল্য যখন বলেন রাজা নির্বাচিত হন চুক্তির মাধ্যমে, তখন পাশ্চাত্যের সামাজিক চুক্তি মতবাদের সঙ্গে তার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। অবশ্য উভয় চুক্তির মধ্যে মূলগত পার্থক্যও পরিদৃষ্ট হয়। পাশ্চাত্যের দার্শনিক যথা হবস, লক ও রুশোর মতে চুক্তি যেখানে প্রকৃতিগতভাবে সামাজিক, সেখানে কৌটিল্যের চুক্তির প্রকৃতি ছিল সরকারগত। তবে কৌটিল্য এবং হবস উভয়ই চুক্তি সম্পাদনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অরাজক অবস্থার কথা বলেছেন। সেদিক থেকে কৌটিল্য হচ্ছেন হবসের সার্থক পূর্বসূরি ।

কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব

কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ মতবাদ বা সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব হচ্ছে কৌটিল্যের রাষ্ট্রচিন্তা ও রাষ্ট্রের কাঠামো সম্পর্কিত রাজনৈতিক চিন্তাধারা। কৌটিল্য তাঁর গ্রন্থ অর্থশাস্ত্রের শুরুর দিকে আলোচনা করেছেন রাজধর্ম তথা রাজার কর্তব্য বিষয়ে। তিনি রাষ্ট্র ব্যবস্থার সপ্ত প্রকৃতি বা সাতটি প্রকৃতির কথা উল্লেখ করেছেন।

আরো পড়ুন:  কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব বা কৌটিল্যীয় কূটনীতি হচ্ছে আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের আলোচনা

মূল নিবন্ধ: কৌটিল্যের সপ্তাঙ্গ মতবাদ

মানব শরীরে যেমন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে, তেমনি সাতটি অঙ্গের সম্মিলিত ফলই রাষ্ট্রশরীর। এই সাতটি উপাদান হচ্ছে স্বামী (রাজা), অমাত্য (মন্ত্রী ও আমলা), জনপদ (ভূখণ্ড ও প্রজা), দুর্গ (সুরক্ষিত নগর), কোষ (রাজকোষ), দণ্ড (সেনাবাহিনী) এবং মিত্র (সুহৃদ)। এই সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রত্যয় সম্পর্কে আধুনিক যে সব লক্ষণের কথা বলা হয় অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব, সরকার, ভূখণ্ড, জনসংখ্যা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব

কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব বা মণ্ডল মতবাদ বা কোটিল্যীয় কূটনীতি বা ষষ্ঠাঙ্গনীতি হচ্ছে কৌটিল্যের আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক বা পররাষ্ট্র বিষয়ক রাজনৈতিক চিন্তাধারা। কৌটিল্য তাঁর রচিত র্থশাস্ত্র গ্রন্থে আন্তঃরাষ্ট্রিক সম্পর্ক ও পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন সবিশেষ গুরুত্ব সহকারে।

মূল নিবন্ধ: কৌটিল্যের মণ্ডলতত্ত্ব

সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তার ও পররাজ্য দখলের লক্ষ্যে রাজাকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। এই সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রগুলোকে কৌটিল্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্যে সন্নিবেশিত করেছেন যা মণ্ডল নামে খ্যাত। মণ্ডলের আওতায় মোট ১২ জন রাজা ও তাঁদের রাজ্যকে রাখা হয়েছে যাদের মধ্যে কার সঙ্গে কীরকম সম্পর্ক স্থাপিত হবে তার ওপর উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজার সাফল্য নির্ভরশীল।

গুপ্তচরব্যবস্থা 

কৌটিল্য গুপ্তচরব্যবস্থাকে প্রশাসনের অন্যতম স্তম্ভ এবং গুপ্তচরদেরকে ‘রাজার চক্ষু’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। রাজা গুপ্তচরদের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনব্যবস্থা এবং বিদেশী শাসকদের কার্যকলাপ সম্পর্কে গোপন তথ্য সংগ্রহ করবেন। আর গুপ্তচরদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা থাকবে।

অর্থশাস্ত্রে নয় প্রকার গুপ্তচরের উল্লেখ রয়েছে: কাপাটিক (ছাত্রবেশধারী), উদাস্থিতা (সন্ন্যাসী বেশধারী), গৃহপাতিকা (কৃষকরূপী), বৈদেহক (বণিকবেশী), তাপস (পুরোহিত বেশধারী), সাত্রি (বিভিন্ন শাস্ত্র অধ্যয়নকারী), তীক্ষ্ণ (শরীর নিরপেক্ষ অতি সাহসী ব্যক্তি), রসদ (বিষ প্রদানে সক্ষম) এবং ভিক্ষুকী (পরিব্রাজিকা)। কোনো গুপ্তচর ভুল তথ্য প্রদান করলে তার জন্য কঠিন শাস্তি অবধারিত। কৌটিল্য প্রদত্ত গুপ্তচর ও ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে উন্নতমানের, ব্যতিক্রমধর্মী এবং আধুনিক প্রশাসনযন্ত্রের জন্য অনুকরণীয়।

আরো পড়ুন:  নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক লড়াকু জননায়ক

তথ্যসূত্র

১. বায়েজীদ আলম, প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, পৃষ্ঠা ৩৪-৪০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!