গান্ধীর রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে জমিদার, মুৎসুদ্দি ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা

মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর রাষ্ট্রচিন্তা বা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের মূল সূত্র (ইংরেজি: Political thoughts of Gandhi) হচ্ছে জমিদার ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষা করা। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী আমলের ধনী জমিদার, সামন্তপ্রভু, পরজীবী, মুৎসুদ্দি শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী গণশত্রু যিনি গান্ধীবাদ নামক এক অর্ধ-বর্বর মতাদর্শের প্রচারক। মিথ্যাচার, অসততা, কপটতা এবং ভন্ডামোকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের একনিষ্ঠ সেবক মানবেতিহাসের পরিচিত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিত্ব গান্ধী ছিলেন ভারতের এক গণবিরোধী রাজনীতিবিদ।

গান্ধীর জন্ম গুজরাতের পোরবন্দরে। পেশায় তিনি ছিলেন আইনজীবী। গান্ধীর রাজনৈতিক গুরু ছিলো গোপালকৃষ্ণ গোখলে। এ ছাড়া তিনি তলস্তয়, রাস্কিন, হেনরি ডেভিড থোরো প্রমুখের চিন্তায় প্রভাবিত হন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যুকাল অবধি প্রায় ৩৩ বছরের কালপর্বে গান্ধী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে জমিদার, জোতদার, মুৎসুদ্দি ও পুঁজিপতিদের কব্জায় আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং সফল হয়েছেন।

গান্ধীর রাষ্ট্রচিন্তা গান্ধীবাদ

গান্ধীবাদ (ইংরেজি: Gandhism) বলে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি মতবাদ হচ্ছে অবিভক্ত ভারতবর্ষের জমিদার ও শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর (১৮৬৯-১৯৪৮ খ্রি.) সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অভিমত। গান্ধীবাদ রাজনীতি ও সমাজনীতির সাথে ধর্মের সংমিশ্রণে গঠিত একটি চিন্তাধারা। অর্থাৎ গান্ধীবাদ হলো বিশেষ একটি জীবনধারা, যার সারমর্ম হলো সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও কুসংস্কারের সেবা করা।[১]

মূল নিবন্ধ: গান্ধীবাদ কাকে বলে?

গান্ধী সুসংবদ্ধ কোনো রাষ্ট্রদর্শন প্রবর্তন করেননি। প্রচলিত অর্থে গান্ধীবাদ বলে সুস্পষ্ট কিছু নেই, তবুও যদি কিছু থাকে সেটা হলো বিশেষ একটি জীবনধারা, যার সারমর্ম হলো সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, উপনিবেশবাদ, সামন্তবাদ ও কুসংস্কারের সেবা করা। গণতন্ত্রের শত্রু গান্ধী জনগণের সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতাকে, ভারতীয় বিপ্লবীদের প্রেরণাকে পদদলিত করে জনগণকে বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার নিগড়ে শতশত বছর ধরে আটকে রাখার অপচেষ্টা করেছিলেন।[২]

গান্ধীর অর্থনৈতিক চিন্তা বা অছিবাদ

অছিবাদ বা সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়কত্ব (ইংরেজি: Trusteeship) হচ্ছে ভারতবর্ষের ও শিল্পপতি ও জমিদারদের স্বার্থ রক্ষাকারী প্রতিক্রিয়াশীল গান্ধীবাদী ভুল-আর্থনীতিক চিন্তার মূলকথা; এবং পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের বিকল্প হিসাবে বিবেচিত। অছিবাদ জমিদারতন্ত্র ও সামন্তবাদের সংস্কার করে তাকে ভারতের জনগণের উপর চাপিয়ে রাখার একটি সুগভীর চক্রান্ত।[৩]

আরো পড়ুন:  অহিংসা হচ্ছে সশস্ত্র সংগ্রাম, গণতন্ত্র ও জাতীয় মুক্তির বিরোধীতাকারী এক কৌশল

মূল নিবন্ধ: অছিবাদ বা সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়কত্ব

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে আগা খাঁর প্রাসাদে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যখন বন্দি ছিলেন সে সময়ে অছিবাদের খসড়া প্রস্তুত হয়। গান্ধী রাজা জমিদার প্রভৃতিকে তাদের সম্পত্তির ট্রাস্টি বা তত্ত্বাবধায়করূপে গণ্য করেন। গান্ধীর মতে ‘‘যোগ্য লোকদের দ্বারা জনগণের সম্পদের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার কি করে করা যায় অছিবাদ তারই এক প্রচেষ্টা’’।[৪] তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ তারিখে হরিজন পত্রিকায় লেখেন, ‘‘আমি পরামর্শ দিই যে, ধনবানরা কোটি কোটি টাকা উপার্জন করতে পারে কিন্তু তা সকলের সেবায় উৎসর্গ করার জন্যেই করবে’’।

গান্ধীর রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে অহিংসা মতবাদ

অহিংসা বা গান্ধীবাদী অহিংসা (ইংরেজি: Nonviolence) হচ্ছে হাজার হাজার বছর ধরে সামন্তবাদ, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম, গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও নিপীড়িত জাতিসমূহের মুক্তির বিরোধীতাকারী এক প্রতিক্রিয়াশীল কৌশল।

অন্য অর্থে অহিংসা হচ্ছে প্রতিটি শর্তে নিজের এবং অন্যের ক্ষতি না করার ব্যক্তিগত অভ্যাস। এটি এমন বিশ্বাস থেকে আসতে পারে যে মানুষ, প্রাণী এবং/বা পরিবেশের ক্ষতি করা কোনও সাফল্য অর্জনের জন্য অপ্রয়োজনীয় এবং এটি সহিংসতা থেকে নিবৃত্তির সাধারণ দর্শনের কথা উল্লেখ করতে পারে। এটি নৈতিক, ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক নীতিগুলির ভিত্তিতে হতে পারে তবে এর কারণগুলিও নিখুঁত কৌশলগত বা প্রায়োগিক হতে পারে।

মূল নিবন্ধ: গান্ধীবাদী অহিংসা

অহিংসার “সক্রিয়” বা “সক্রিয়তাবাদী” উপাদান রয়েছে, এতে বিশ্বাসীরা সাধারণত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন সাধনের উপায় হিসাবে অহিংসার প্রয়োজনীয়তা গ্রহণ করেন। সুতরাং, উদাহরণস্বরূপ, তলস্তীয় এবং গান্ধীবাদী অহিংসা উভয়ই সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একটি দর্শন এবং কৌশল যা সহিংসতার ব্যবহারকে প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু একই সাথে এটি অহিংস পদক্ষেপকে (যাকে নাগরিক প্রতিরোধও বলা হয়) নিপীড়নের নিষ্ক্রিয় গ্রহণযোগ্যতার বিকল্প হিসাবে দেখায় বা এটা সশস্ত্র সংগ্রামের বিরোধীতা করে। সাধারণভাবে, অহিংসার সক্রিয়তাবাদী দর্শনের সমর্থকরা সামাজিক পরিবর্তনের জন্য তাদের প্রচারণায় এটার বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যার মধ্যে রয়েছে সমালোচনামূলক রূপের শিক্ষা এবং প্ররোচনা, গণ-অসহযোগ, নাগরিক অবাধ্যতা, অহিংস প্রত্যক্ষ সংগ্রাম এবং সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক রূপের হস্তক্ষেপ।

আরো পড়ুন:  সুভাষচন্দ্র বসুর সমাজতান্ত্রিক চিন্তা হচ্ছে সংস্কারবাদী অমার্কসবাদী ক্ষুদে-বুর্জোয়া

গান্ধীর গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধীতা

গান্ধীর রাষ্ট্রচিন্তা মূলত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে চালিত হয়েছে। গান্ধী ইতিহাসকে ধনী জমিদার ও শিল্পপতিদের নীতির নিরিখে বিচার করেছেন; তার জীবনদৃষ্টিতে জমিদার, পুঁজিপতি ও ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের স্বার্থরক্ষা ছিলো অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত। সেই কারণে ইতিহাসে শোষণ ও ধর্মের কোনো সম্পর্ক তিনি দেখতে অনিচ্ছুক ছিলেন। যেমন তার একটি কথাকে আমরা দেখতে পারি, তিনি বলছেন,

আপনারা [জমিদাররা] নিশ্চিন্ত থাকিতে পারেন যে, শ্রেণিসংগ্রাম এড়াইবার জন্য আমি আমার সমস্ত শক্তি ও প্রভাব নিয়োগ করিব। যদি অন্যায়ভাবে কখনো আপনাদের সম্পত্তি কাড়িয়া লইবার চেষ্টা হয় তবে আমি আপনাদের হইয়া সংগ্রাম করিব।[৫]

তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেছেন মূলত জমিদারদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য, তিনি অস্পৃশ্যতার বিলুপ্তি চেয়েছেন কিন্তু অস্পৃশ্যতা প্রথার বিলুপ্তি যে শুধুমাত্র শিল্পবিপ্লবের ফলে হবে তা বোঝেননি, তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিলুপ্তি চেয়েছেন কিন্তু ধর্মের বিলুপ্তি চাননি, তিনি জাতিবিদ্বেষ হটাতে চেয়েছেন কিন্তু ভারতীয়দেরকে আফ্রিকান নিগ্রোদের চেয়ে বড় ভেবেছেন।

রাজনীতির আধ্যাত্মিকরণ

গান্ধীর মনন ও সাধনার মূলে ছিলো আধ্যাত্মিকতা। সে ঈশ্বরে আস্থাবান ছিলো এবং শাশ্বত নৈতিক শৃঙ্খলার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। তার দৃষ্টিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডর স্রষ্টা ও নিয়ন্তা ঈশ্বর হলেন মঙ্গলময় এবং করুণার আধার; মানুষের ডাকে তিনি সাড়া দেন। ঈশ্বর হলেন নৈতিকতার উৎস। সে কারণে গান্ধী উপাসনায় বিশ্বাস করতো। ধর্ম ছিল তার রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব ও নৈতিকতার মূল ভিত্তি।[৬]

শ্রীমদ্ভগবদগীতার প্রভাবে তার মনে শুভ ও অশুভর তথা সত্য ও অসত্যের উপলব্ধি সঞ্চারিত হয় যার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল তার রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রীকতার “সত্যাগ্রহ” কর্মপদ্ধতি। গান্ধী জনগণের সত্যকে বলত মিথ্যা, আর নিজের মিথ্যাকে বলত সত্য। ভণ্ডামোকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে সে কর্ম সম্পাদনের প্রয়োজনে ত্যাগ ও আত্মনিগ্রহের আবশ্যকতার কথা বলেছিলো। নিস্পৃহ কর্মযোগীর আদর্শে স্বধর্ম অর্থাৎ নিজ কর্তব্যপালন করলে মোক্ষলাভ করা যায় বলে এই শয়তানের বিশ্বাস ছিল।

আরো পড়ুন:  সপ্তাঙ্গ মতবাদ বা সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব হচ্ছে কৌটিল্যের রাষ্ট্রের কাঠামো সম্পর্কিত চিন্তাধারা

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ২৩ মে ২০১৯, “গান্ধীবাদ প্রসঙ্গে” রোদ্দুরে ডট কম, দোলন প্রভা প্রকাশিত, ঢাকা, ইউআরএল https://www.roddure.com/international/gandhism/
২. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৯৮-৯৯।
৩. অনুপ সাদি, ১৮ অক্টোবর, ২০১৮, ‘অছিবাদ গান্ধীর প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা’, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা দোলন প্রভা প্রকাশিত, ইউআরএল: https://www.roddure.com/international/trusteeship/
৪. মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, “ব্যক্তি বনাম পদ্ধতি”, সত্যেন্দ্রনাথ মাইতি সম্পাদিত গান্ধী রচনা সম্ভার, গান্ধী মেমোরিয়াল কমিটি, পশ্চিমবঙ্গ, এপ্রিল ১৯৮৬, পৃষ্ঠা ১২০।
৫. মোহনদাস গান্ধী, গান্ধীবাদের স্বরূপ থেকে সুপ্রকাশ রায় উদ্ধৃত, র‍্যাডিক্যাল ইম্প্রেশন, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৪।
৬. অধ্যাপক একেএম শহীদুল্লাহ ও এম রফিকুল ইসলাম, প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা, গ্রন্থকুটির ঢাকা, প্রথম পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৮/১৯, পৃষ্ঠা ২২৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!