এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে প্রাচীন গ্রিসের এই দার্শনিকের রাজনৈতিক চিন্তাধারা

এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা বা এরিস্টটলের রাজনৈতিক চিন্তা বা এ্যারিস্টটলের রাষ্ট্রদার্শনিক চিন্তাধারা (ইংরেজি: Political Thoughts of Aristotle) হচ্ছে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটলের রাজনৈতিক চিন্তাধারা। এরিস্টটল রাষ্ট্রদর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিজ্ঞানে অসামান্য অবদান রেখেছেন। আমরা এখানে তাঁর রাজনীতি ও দর্শন সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করব।[১]

এরিস্টটলের বিজ্ঞান সম্বন্ধীয় অধিকাংশ লেখাই ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়েছে, তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একথা বলা যায় না। রাজনীতি বিষয়ক অসংখ্য লেখার মধ্যে সমকালিন গ্রীসের অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ক ‘Politics’ গ্রন্থটি সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থটির প্রায় সর্বত্র প্লেটোর ‘Republic’-এর সমালোচনা ও প্রতিবাদ দেখা যায়। গ্রীক নগর রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানে প্লেটো কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলেন কিন্তু এরিস্টটল সমস্যা সমাধানের জন্য অভিজ্ঞতা ও বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণের ওপর জোর দিয়েছিলেন।[২]

এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা বা রাজনীতিচিন্তা

এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে তাঁর পলিটিকস গ্রন্থে রাজনীতির নানা তত্ত্বের আলোচনা। তিনি মনে করতেন সহজাত যুক্তি প্রবণতা থাকায় মানুষ একটি রাজনৈতিক জীব। তাই স্বভাবতই মানুষ রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে সেখানে বসবাসের মধ্য দিয়ে নিজের সত্তার পরিপূর্তি খোঁজে। সর্বাঙ্গসুন্দর রাষ্ট্রে পুণ্যচরিত্র মানুষের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রকৃতি অনুযায়ী সেখানে পাপ-পুণ্য বিরাজ করে।

এরিস্টটল তাঁর গুরু প্লেটোর সঙ্গে অনেক বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করতেন, যেমন তিনি গণতন্ত্র ও যৌথ শিক্ষা ব্যবস্থা মানতেন না। পরিবারকে তিনি রাজনৈতিক তথা সমাজদেহের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে দেখতেন, এবং পরিবারের সঙ্গে গৃহপরিবেশের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক থাকায় ব্যক্তিগত মালিকানায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর মতে কিছু মানুষ অপরের ইচ্ছাধীন থাকায় স্বভাবতই ক্রীতদাসে পরিণত হয়; শ্রম বিভাজনও তাই স্বাভাবিক ও সংগত, তাঁর দৃষ্টিতে নাগরিক হলেন তিনি যাঁর শাসনব্যবস্থায় পদাধিকার থাকে। কালক্রমে নাগরিকদের রাজনৈতিক দায়িত্ব সঞ্চারিত হয়েছে। এরিস্টটলের আদর্শ শাসনব্যবস্থার বর্ণনার ভিত্তিতে আধুনিক নানান নিয়মতন্ত্র গড়ে উঠেছে।

এরিস্টটলের রাষ্ট্রতত্ত্ব

এরিস্টটলের রাষ্ট্রতত্ত্ব (ইংরেজি: Aristotle’s theory of state) বা এরিস্টটলীয় রাষ্ট্রের কাজ, চিন্তা, প্রকৃতি এবং সমালোচনা হচ্ছে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিস্তারিত চিন্তাধারা। রাষ্ট্রর উৎপত্তি এবং প্রকৃতি বিষয়ে এরিস্টটলের চিন্তা রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে গণ্য হয়। ঈশ্বর রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন বা চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি একথা এরিস্টটল অস্বীকার করেন।

আরো পড়ুন:  আল ফারাবির রাষ্ট্রচিন্তা বা রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবির অবদান সম্পর্কে আলোচনা

রাষ্ট্রর প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে অ্যারিস্টটল মনে করেন, রাষ্ট্র যেহেতু একটি স্বাভাবিক সংগঠন তাই মানুষের সবরকম চাহিদার তৃপ্তিসাধন রাষ্ট্রের মাধ্যমেই সম্ভব। রাষ্ট্র ছাড়া স্বার্থের পূর্ণতা অন্য কোথাও সম্ভব নয়। রাষ্ট্র কেবল সর্বোচ্চ কল্যাণের প্রতীক নয়, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সংগঠনও বটে। তিনি আরো মনে করেন, রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও অস্তিত্বের পিছনে রয়েছে উপযোগিতা। মানুষ তার বুদ্ধি ও চেতনা দিয়ে অনুভব করেছিল রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা আছে, তাই রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যক্তি নিজের কল্যাণের জন্য রাষ্ট্রের সৃষ্টি করে।[২]

এরিস্টটলের দাস তত্ত্ব

এরিস্টটল মানসিকভাবে তিনি গ্রিসের দাস প্রধান নগর-গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। দাস এবং প্রভুর শ্রেণিভেদ জন্মগত বলেই তিনি মনে করতেন। কিন্তু তিনি স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন করেন নি। যুগের পরিপ্রেক্ষিতে এরিরিস্টটলের চিন্তার ক্ষমতা এবং ব্যাপকতা যেরূপ বিষ্ময়কর ছিল, তেমনি তাঁর চিন্তাধারায় দাস-প্রধান গ্রিক সমাজের সীমাবদ্ধতার পরিচয়ও দুর্লভ নয়। জীবন ও জগতের এমন কোনো দিক ছিল না, যেদিকে এরিরিস্টটল তাঁর গবেষণার দৃষ্টিকে প্রসারিত করেন নি। এ কারণে এরিরিস্টটলকে জ্ঞানসমুদ্র বলে স্মরণ করা হয়।

এরিস্টটল রাষ্ট্রকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেন, যথা ক্ষমতার অধিকারী কে এবং কার স্বার্থে সেটা ব্যবহৃত হয়? উত্তর হলো: কিছু লোক কিংবা সকলেই ক্ষমতার অধিকারী এবং অন্যদের স্বার্থে। আদর্শ সমাজব্যবস্থা হলো অভিজাততন্ত্র, যেখানে সর্বোত্তম কিছু ব্যক্তি, যারা স্বভাবতই সংখ্যায় কম তারা সবাইকার স্বার্থে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। যেহেতু সে আদর্শের রূপায়ণ কঠিন ও বজায় রাখা আরও কঠিন, তাই আরিস্তোতল এক ধরনের মিশ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের সুপারিশ করেন যেখানে পালা করে সব নাগরিক শাসিত হয় ও শাসন করে; নির্দিষ্ট কোনও শ্রেণি ক্ষমতার মৌরসিস্বত্ব ভোগ করে না।[৩]

আইন সম্পর্কে এরিস্টটল

এরিস্টটল মনে করেন আদর্শ শাসনব্যবস্থায় ব্যক্তিমানুষের ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ও চালিত; আইন সবার উপরে; অর্থাৎ মূলে আইনের শাসন বিরাজ করে। তাতে সরকারেরও এমন এক চরিত্র আরোপিত হয়েছে যেটা আবহমান কাল যাবৎ প্রবহমান; তাতে শাসক ও শাসিতের মধ্যে একটা সৌহার্দের বন্ধন থাকে। নাগরিকদের রাজনৈতিক দায়দায়িত্বের সঙ্গে থাকে সুবিচার ব্যবস্থা এবং সেই নীতির ভিত্তিতে নাগরিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রের সঙ্গে সবাইকার সম্পর্ক সুসংবদ্ধ হয়ে ওঠে। সুবিচারের রীতিনীতি থেকে সমতাবোধ বিকশিত হয়। বিচার ব্যবস্থাসূত্রে ব্যক্তি মানুষের অধিকার ও কর্তব্য নিরূপিত হয়।[৪]

আরো পড়ুন:  এরিস্টটলের বিপ্লব তত্ত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষে বিপ্লববিরোধী অবস্থানে থাকার তত্ত্ব

প্রচলিত ধারা থেকে উদ্ভূত অধিকার ও কর্তব্যকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন, কারণ শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কর্তাদের খেয়ালখুশি মতো লিখিত আইনকানুনের রদবদল হয়। জৈব প্রত্যয়ে তিনি রাষ্ট্রকে বিচার করতেন। সমগ্র বস্তু তার অংশের অগ্রবর্তী বটে, কিন্তু তার উপর নির্ভরশীল। রাজনীতির বেলায় সমাজ সংগঠনে যোগ দেওয়ার আগে ব্যক্তি থাকে অসম্পূর্ণ। সেই সংগঠনও মূলত রাজনৈতিক, তবে সেইসঙ্গে ন্যায়সংগত বলে সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষ হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ও সার্থক।

এরিস্টটলের রাষ্ট্রচিন্তা ও তার প্রভাব

গ্রিক শব্দ ‘পেরিপ্যাটেটিকস’ থেকে পেরিপ্যাটেটিক শব্দের উৎপত্তি। শব্দটির অর্থ ছিল চলমান অবস্থাতে কিছু করা। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল তাঁর লাইসিয়াম দর্শনাগারে পদচারণা করতে করতে দর্শনের সমস্যাদি নিয়ে আলোচনা করতেন কিংবা বক্তৃতা দিতেন। এ কারণে তাঁর অনুসারীগণকে চলমান বা পেরিপ্যাটেটিক বলে অভিহিত করা হতো। এরিস্টটলের প্রতিষ্ঠিত দর্শনাগার প্রায় এক হাজার বছর পর্যন্ত প্রাচীন জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রচার কেন্দ্ররূপে কার্যকর ছিল। এর কার্যকালকে সাধারণত ৩৩৫ খ্রিস্টাব্দ পূর্ব থেকে ৫২৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত বলে মনে করা হয়। এরিস্টটলের মৃত্যুর পরে এই দর্শনাগারের সঙ্গে তাঁর যে সমস্ত অনুসারী যুক্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে থিওফ্রাস্টাস, স্ট্রাটো, এ্যড্রোনিকাস এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[৫]

এরিস্টটলের দর্শনের বস্তুবাদী এবং বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য মধ্যযুগের অন্ধকার ভেদ করে নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার সূচনায় এক বিরাট শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে কাজ করেছে। মুসলিম সভ্যতার আমলেও এ্যারিস্টটলের দর্শনই মুসলিম চিন্তাবিদদের ব্যাখ্যায় কেন্দ্র হিসাবে কাজ করেছে। এরিস্টটলের তত্ত্বসমূহের বিরুদ্ধবাদী বা সমর্থনকারী সমালোচনাই মুসলিম চিন্তাবিদদের আলোচনাকে ধর্মবিশ্বাসাতিরিক্ত দার্শনিক আলোচনার গুণে গুনান্বিত করেছিল। মুসলিম দার্শনিকদের নিকট থেকে ইউরোপ এরিস্টটলের পরিচয় লাভ করে। মধ্যযুগে ইউরোপের গোঁড়া ধর্মবিশ্বাস এরিস্টটলের দর্শনের ভাববাদী তত্ত্বকে ধর্মতত্ত্বের পরিপোষক হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। এর ভিত্তিতেই মধ্যযুগীয় স্কলাসটিসিজম বা যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা হয়। মার্কসবাদী দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস এরিস্টটলকে প্রাচীন জ্ঞান দর্শনের শীর্ষমণি বলে আখ্যায়ি করেছেন।

আরো পড়ুন:  প্লেটোর শিক্ষাতত্ত্ব হচ্ছে তাঁর ন্যায় সংক্রান্ত তত্ত্বের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার শিক্ষাব্যবস্থা

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৭ মার্চ ২০২১, “এরিস্টটল প্রাচীন গ্রিসের ধ্রুপদী সময়কালের একজন দার্শনিক এবং বহু জ্ঞানী”, ফুলকিবাজ ডট কম, ঢাকা।
২. গোবিন্দ নস্কর, রাষ্ট্রচিন্তা, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ৮।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৬৮।
৪. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩৯।
৫. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৩০৭-৩০৮।

Leave a Comment

error: Content is protected !!