আল্লামা আবুল ফজলের রাষ্ট্রচিন্তা বিষয়টির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজতন্ত্র

আল্লামা আবুল ফজলের রাষ্ট্রচিন্তা (ইংরেজি: Political Thoughts of Abul Fazl) বিষয়টির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজতন্ত্র। তিনি রাজতন্ত্রের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং পৃষ্ঠপোষক। রাজা ও রাজতন্ত্র সুষ্ঠু শাসনের জন্য অপরিহার্য বলে তিনি মত পোষণ করেন। ন্যায়বিচার এবং বাদশাহ সম্পর্কে তিনি বলেন যে, বাদশাহের ন্যায়বিচারের আলোকে কেউ কেউ আনন্দের সাথে আনুগত্যের পথ অনুসরণ করে আর অন্যরা শাস্তির ভয়ে অপরাধ হতে বিরত থাকে এবং প্রয়োজনের তাগিদে সংশোধিত হবার পথ বেছে নেয়।

আবুল ফজল শাসকদের প্রতি প্রজাদের আনুগত্যকে শক্তিশালী করার জন্য বাদশাহী পদের সাথে অতি প্রাকৃতিক উপাদান যুক্ত করেন। তিনি বাদশাহীর পদকে খোদার নিকট থেকে নিঃসৃত আলোক বিশেষ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন বাদশাহ খোদার ছায়া। তিনি খোদার নিকট থেকে সরাসরি আলোক লাভ করেন। বাদশাহ কেবল খোদাকেই ভয় এবং বিশ্বাস করেন। তিনি খোদার সাহায্য কামনা করেন ও তা লাভ করেন এবং খোদার অনুগ্রহই তার সাফল্যের কারণ বলে আবুল ফজল উল্লেখ করেন।

আবুল ফজল ধর্মীয় আইনের স্থলে বাদশাহর বিবেকের উপরই বেশি গুরুত্বারোপ করেন। বাদশাহ খোদার আইন বলতে যা বুঝেন আবুল ফজল তার উপরই আস্থা স্থাপন করেন। এ প্রসঙ্গে ত্রিপাঠি বলেন যে, আবুল ফজলের মতবাদ হতে প্রতীয়মান হয় যে, সার্বভৌমের বিবেক খোদার দ্বারাই নির্দেশিত হয়। আবুল ফজল বাদশাহ বা রাজার বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের বিদ্রোহের বিরোধিতা করেন। আবুল ফজল বলেন, রাজার অধিকার সূর্যের নিকট হতে লব্ধ।

বাদশাহর গুণাবলি কেমন হবে তার নির্দিষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন আবুল ফজল। তিনি বলেন, বাদশাহর পদ খোদার দান এবং তিনি কয়েক হাজার মহান গুণের অধিকারী না হওয়া পর্যন্ত বাদশাহ হতে পারেন না। তার মতে, রাজার গুণাবলিগুলো নিম্নরূপ:

১. মহানুভবতা, ২. দয়া, ৩. বিরাট সামর্থ্য, ৪. সহনশীলতা, ৫. বোধ শক্তি, ৬. সাহস, ৭. ন্যায়পরায়ণতা, ৮. কঠোর পরিশ্রমী, ৯. যথোচিত আচরণ এবং ১০. ক্ষমাশীলতা। 

আরো পড়ুন:  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ

আবুল ফজল মনে করেন, যুক্তিই বাদশাহর পথ প্রদর্শক। ধর্ম সম্পর্কে একজন বাদশাহর দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে তাও তিনি উল্লেখ করেছেন। আদর্শ বাদশাহ এবং স্বার্থপর বাদশাহর চরিত্রও অঙ্কিত হয়েছে আবুল ফজলের মতবাদে।

ইসলাম সম্পর্কে আবুল ফজলের ধারণা

ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সম্রাট আকবর এবং আবুল ফজলসহ (ইংরেজি: Abul Fazl Concepts of Islam) অন্যান্য দরবারীদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডই প্রমাণ করেছিল যে, তারা ইসলামের প্রতি ছিলেন বিদ্বেষী। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ্যে এবং ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচলিত বিধানের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেন। সুদ, জুয়া এবং মদকে হালাল, দাড়ি কেটে ফেলার ফ্যাশন প্রবর্তন করা হয়। চাচাত ও মামাত বোনের সাথে বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। ইসলামের বিধান অমান্য করে একাধিক বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়। তারা জিদের বশবর্তী হয়ে ইসলামে হারাম ঘোষিত শূকরকে পাক এবং পবিত্র প্রাণী হিসেবে ঘোষণা করেন। এসবই ছিল সম্রাট আকবরের চাতুরী এবং আবুল ফজলের ধূর্তপনা। বস্তুত তারা ইসলাম ও হিন্দু ধর্মকে এক করে ভারতের শাসন কার্যে চিরস্থায়ী আসন পাকাপোক্ত করার ফন্দি এঁটেছিলেন।

আবুল ফজলের রাষ্ট্রদর্শনের মূল্যায়ন

আবুল ফজলের রাষ্ট্রদর্শন বা রাষ্ট্রচিন্তা বিশ্লেষণ (ইংরেজি:Evaluations of Political Philosophy of Abul Fazl) করলে দেখা যায়, তিনি উদারমতবাদী মুসলিম ছিলেন। তিনি আকবরের উদ্ভট ধর্মনীতিকে ও ইলাহী ধর্ম প্রবর্তনকে মৌখিক সমর্থন করলেও একাজে তার অন্তরের সমর্থন কতটা ছিল তা ঐতিহাসিকদের কাছে বিতর্কের বিষয়। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে ঐতিহাসিক বাদাউনী এ বিষয়ে আলোচনাকালে তাকে বলেন, “এসব কুফুরি কার্যকলাপে আপনার চেয়ে আর কার বেশি সমর্থন আছে।” এর জবাবে হাসিমুখে আবুল ফজল বলেছিলেন, “আহা চটছেন কেন? খেলার ছলে কিছুদিন কুফুরির মুলকে বেড়াতে ইচ্ছা হচ্ছে।” তার এই জবাবে আকবরের দ্বীন ই ইলাহীর প্রতি তার মনের গভীরে পোষা বিদ্রুপেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তুযুক ই জাহাঙ্গীরের একটি বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, আকবরের ইলাহী ধর্ম প্রচারের সময় একদিন শাহজাদা সেলিম সহসা আবুল ফজলের বাড়িতে উপস্থিত হন ও চল্লিশজন নকল বীমাকে কুরআন নকল করতে দেখে অবাক হয়ে যান। এ থেকে বুঝা যায় তিনি ইসলাম ধর্মের অনেক কিছুই ওয়াকিবহাল ছিলেন।

আরো পড়ুন:  আল ফারাবির রাষ্ট্রচিন্তা বা রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবির অবদান সম্পর্কে আলোচনা

তথ্যসূত্র

১. অধ্যাপক একেএম শহীদুল্লাহ ও এম রফিকুল ইসলাম, প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তা, গ্রন্থকুটির ঢাকা, প্রথম পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৮/১৯, পৃষ্ঠা ১২৫-১২৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!