প্লেটোর শিক্ষাতত্ত্ব হচ্ছে তাঁর ন্যায় সংক্রান্ত তত্ত্বের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার শিক্ষাব্যবস্থা

প্লেটোর শিক্ষাতত্ত্ব বা প্লেটোর শিক্ষাব্যবস্থা (ইংরেজি: Plato’s Theory of Education) হচ্ছে তাঁর ন্যায়তত্ত্বের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য একটি পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা। এই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে এক একটি বিশেষ কাজের জন্য যোগ্য করে গড়ে তুলবে, আর সেই কাজে নিঃস্বার্থভাবে আত্মনিয়োগ করতে শেখাবে। দার্শনিক প্লেটোর মতে এভাবেই ‘ন্যায়’ অর্জিত হবে। এই শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যক্তি পরিশুদ্ধ হবে, কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে যোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারবে।

রিপাবলিক ও প্লেটোর শিক্ষাতত্ত্ব

প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ এর এক বড় অংশ জুড়ে আছে তাঁর শিক্ষাব্যবস্থা। ‘ন্যায়’কে যদি বলা যায় ‘রিপাবলিক’- গ্রন্থের প্রাণপাখি তাহলে শিক্ষাচিন্তাকে বলতে হবে এর বাহন। প্লেটো মনে করেন কেবল রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সর্বজনীন আদর্শিক শিক্ষার মাধ্যমেই তাঁর পরিকল্পিত আদর্শ রাষ্ট্র সফল হতে পারে।

প্লেটো এত ব্যাপকভাবে বিষয়টি আলোচনা করেছেন যে, রিপাবলিককে শিক্ষা বিষয়ক গ্রন্থ বলা অসঙ্গত নয়। বেনজামিন জোয়েট মনে করেন শিক্ষার ক্ষেত্রে ‘রিপাবলিক’ অবশ্যই সর্বপ্রথম গ্রন্থ। ‘রিপাবলিক’ প্লেটোর সুবিন্যস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরবর্তী রচনা। একাডেমির লক্ষ্য ছিল রিপাবলিকের সে কাঙ্ক্ষিত দার্শনিক শাসক তৈরি করা।[১]

রিপাবলিক গ্রন্থের বিভিন্ন পর্বে প্লেটো নাগরিকদের শিক্ষা বিষয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন। রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত নাগরিক তৈরি করাই ছিলো প্লেটোর শিক্ষা সংক্রান্ত কর্মসূচীর লক্ষ্য। সমসাময়িক রাষ্ট্রগুলো নাগরিকদের চরিত্র গঠনের পরিবর্তে সুস্থ সবল দেহ গঠনের ওপর জোর দিয়েছিল। প্লেটো শরীর চর্চার পাশাপাশি মানসিক ও আত্মিক বিকাশের উপর জোর দিয়েছেন।

শিক্ষার প্রকারভেদ

প্লেটো শিক্ষাকে প্রধানত – দু’ভাগে ভাগ করেছেন, যথা প্রাথমিক শিক্ষা এবং উচ্চতর শিক্ষা। তার মতে প্রাথমিক শিক্ষা আবশ্যিক। ২০ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যক্তিরা এই আবশ্যিক শিক্ষা গ্রহণ করবে। এই পর্বের প্রধান লক্ষ্যই হবে শরীর চর্চা ও সঙ্গীত শিক্ষা। শরীর চর্চার উদ্দেশ্য ছিল প্রধানত যোদ্ধা শ্রেণির উপযুক্ত নাগরিক তৈরি করা, আবেগ অনুভূতিকে সংযত রাখা এবং তেজ প্রশমিত করা। শরীর চর্চার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের পক্ষপাতী ছিলেন প্লেটো। মনকে শিথিল করে তুলবে সঙ্গীত, সঙ্গীতের অন্তর্ভুক্ত হবে সাহিত্য, রূপকথা ও ভাস্কর্য। যুক্তিবোধ জাগ্রত করতে এবং সাধক মতামত তৈরিতেও সঙ্গীত সাহায্য করবে। এককথায় শরীর চর্চা ও সঙ্গীত উভয়েরই লক্ষ্য হলো চরিত্রগঠন।

আরো পড়ুন:  এরিস্টটলের বিপ্লব তত্ত্ব রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষে বিপ্লববিরোধী অবস্থানে থাকার তত্ত্ব

কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত এই ধরণের শিক্ষা লাভ করে যারা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে তাদের বাছাই করে আরো দশ বছর শিক্ষা দেওয়া হবে। পাটিগণিত, জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, সুরবিজ্ঞান প্রভৃতি পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই শিক্ষায় যারা পারদর্শিতা লাভ করবেন তাদের আরো পাঁচ বছরের জন্য দর্শন চর্চায় নিয়োজিত করা হবে। তবে শুধু শাসক শ্রেণিই নয়, প্লেটো মনে করতেন নিচু শ্রেণির প্রতিভাবানদের উঁচু শ্রেণিতে উন্নীত করা এবং অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে অপসারণ করা যেতে পারে। এই দর্শন চর্চায় যারা শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবে তারা রাষ্ট্রশাসনের দায়িত্ব পাবে। তবে তাদের পনেরো বছর ধরে সামরিক ও অন্যান্য জাগতিক কাজকর্মের শিক্ষা দেওয়া হবে। এঁরা জ্ঞানী দার্শনিক হবেন যারা প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণাকে বাস্তবায়িত করবে।[২]

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ, “প্লেটো”, রাষ্ট্রদর্শন, মনন পাবলিকেশন, ঢাকা, দ্বিতীয় প্রকাশ; ১৪ এপ্রিল ২০১৪; পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭।
২. গোবিন্দ নস্কর, রাষ্ট্রচিন্তা, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!