প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব হচ্ছে শাসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার প্রথাহীন ব্যবস্থা

প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব (ইংরেজি: Plato’s theory of communism) হচ্ছে আদর্শ রাষ্ট্রের দাসমালিক দার্শনিক-শাসকদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত পরিবারপ্রথাহীন এক অভিনব কাল্পনিক সমাজব্যবস্থা। তিনি সাম্যবাদ দিয়েছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং তৎকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে। তিনি মনে করতেন, মানুষের স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা, দয়া-দাক্ষিণ্য এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকেই মানুষ স্বার্থপর ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়। তাই প্লেটো তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রে সাম্যবাদ ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন।

প্লেটোর সাম্যবাদ হলো তাঁর কল্পিত আদর্শ রাষ্ট্রে তিন ধরনের জনগণ অর্থাৎ দার্শনিক শাসক, যোদ্ধা বর্গ এবং উৎপাদক শ্রেণির সমন্বয়ে একটি সমাজব্যবস্থা। এদের মধ্যে দার্শনিক ও যোদ্ধা শ্রেণিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং পরিবার প্রথা বাদ দিয়ে শুধু উৎপাদক শ্রেণিকে উল্লেখিত দুই ধরনের অধিকার দিয়ে এক অভিনব ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ দাসমালিকদের ভেতর থেকে দার্শনিকদের কাজ হবে রাষ্ট্রীয় শাসন পরিচালনা এবং উৎপাদক শ্রেণির কাজ হবে উৎপাদন করা।[১]

প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব

প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব গড়ে উঠেছে তাঁর শিক্ষাতত্ত্বকে ভিত্তি করে এবং এই শিক্ষাতত্ত্ব আবার গড়ে উঠেছে আদর্শ রাষ্ট্রকে ভিত্তি করে। আদর্শ রাষ্ট্র গড়বার উদ্দেশ্যে প্লেটো শাসক শ্রেণিকে যোগ্য করে তোলার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলনের পাশাপাশি তাদের ব্যক্তিগত জীবনকেও এক বিশেষ নিয়ন্ত্রণে আবদ্ধ রেখে আদর্শ মানুষের স্তরে উন্নীত করতে চেয়েছিলেন। এই জন্য তিনি শাসক শ্রেণির জন্য এক বিশেষ জীবনধারার প্রচলন করতে চেয়েছেন।

প্লেটোর সময় এথেন্সে পুরুষদের তুলনায় নারীদের স্থান ছিল নিম্নস্তরে। পুরুষদের তুলনায় মেয়েরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সমান অধিকার ভোগ করত না। সন্তান প্রতিপালনের ও সন্তান উৎপাদনের মধ্যেই নারীদের ক্ষমতা সীমিত ছিল। প্লেটো বলেন, রাষ্ট্রর ঐক্যের স্থার্থে নারী-পুরুষ উভয়ই সমান দায়িত্ববান থাকবে। তার মতে, নারী ও পুরুষ উভয়েই ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রবণতা পরিত্যাগ করে নিজেদের মধ্যে এক যৌথ ঐক্যবদ্ধ জীবন গড়ে তুলবে। পরিবার ব্যবস্থার বিপক্ষে এই মৌল জীবনের কথা বলেছেন প্লেটো। এ জন্য তিনি বিবাহ ব্যবস্থার সংস্কারের কথা বলেন।

আরো পড়ুন:  প্রাচীন গ্রিক দর্শন রোম সাম্রাজ্য এবং প্রাচীন গ্রিসে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর দর্শন

প্লেটোর কাছে প্রেমের অনিবার্য পরিণতি বিবাহ নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে বিবাহ ও সন্তান উৎপাদনই বিবাহের পরিণতি। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যৌন সম্পর্ক স্থাপন ও স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী ও উৎকৃষ্ট সন্তান উৎপাদন করাই প্রধান লক্ষ্য। রাষ্ট্রের অনুমতি ছাড়া সন্তান প্রজনন অবৈধ। প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রে অবৈধ ও দুর্বল সন্তানদের বাঁচার কোনো অধিকার নেই। 

নারী ও পুরুষেরা এক শিবিরে জীবন যাপন করবে, সাধারণ ভোজনালয়ে খাদ্য গ্রহণ করবে এবং তাদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে না। তাদের সন্তানরা এবং স্ত্রীরা সর্বসাধারণের বলে পরিগণিত হবে এবং রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষা লাভ করবে। এই ভাবে সব রকমের ব্যক্তিস্বার্থ থেকে মুক্ত হয়ে শাসক শ্রেণির সদস্যরা সর্বজনীন সুখ-দুঃখের অধিকারী হবেন। এর মাধ্যমে আদর্শজাত দিক থেকে শাসক শ্রেণি মহৎ হয়ে উঠবে এবং সমাজের সার্বিক কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করবে – এই হলো প্লেটোর সাম্যবাদের মূল কথা।[২]

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ, “প্লেটো”, রাষ্ট্রদর্শন, মনন পাবলিকেশন, ঢাকা, দ্বিতীয় প্রকাশ; ১৪ এপ্রিল ২০১৪; পৃষ্ঠা ৭৫।
২. গোবিন্দ নস্কর, রাষ্ট্রচিন্তা, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!