ফুলবাড়ি উন্মুক্ত কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে এক মহান কৃষক সংগ্রাম

ফুলবাড়ি উন্মুক্ত কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন (ইংরেজি: Phulbari anti-open pit-mining movement) হচ্ছে ২০০৫ সাল থেকে দিনাজপুর জেলায় শুরু হওয়া এক মহান কৃষক আন্দোলন। এই আন্দোলন ২০০৬ সালের ২৬শে আগস্ট বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়িতে স্থানীয় অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে প্রধান অংশগ্রহণকারী হিসেবে ছিলেন স্থানীয় গরিব ও মাঝারি কৃষক। আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা রাখেন সাঁওতাল ও মুসলমান কৃষক ও বামপন্থী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও অংশ নেয় দিনমজুর, ক্ষেতমজুর এবং ছাত্রবৃন্দ।

এই আন্দোলনের ফলাফলে আমার চোখে পড়ে, ফুলবাড়িতে ফুল ফোটে কীনা সেই প্রশ্ন অবান্তর, ফুলবাড়িতে মানুষ ফোটে। ফুলের মানুষেরা জ্বলে উঠলে যে সত্য চারদিকে দেখা যায় তার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে বাংলাদেশের দিনাজপুরের ফুলবাড়ি। ফুলবাড়িতে ফসল ফলে, বাংলায় যত রক্তের ফসল আমরা দেখি তাঁর একটির চিত্রায়ন হয় ২০০৬ সালের ফুলবাড়িতে। ফসলের মাঠ বাঁচাতে যে মানুষেরা উন্মুক্ত কয়লাখনির বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে শিখেছিলাম মানুষ পরমাণু বোমার চেয়েও শক্তিশালী। ফুলবাড়িতে থাকে মানুষ আর পার্লামেন্টে থাকে নরখাদকেরা, ফুলবাড়িতে না গেলে এই সত্য জানা হতো না।

ফুলবাড়িতে একটি উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি করার আয়োজন করে জনগণের শত্রুরা। মূলত ১৫ জানুয়ারী, ২০০৫ তারিখে গোপনে ও অবৈধভাবে উম্মুক্ত খনন পদ্ধতি এবং ফুলবাড়ী ও বড়পুকুড়িয়ায় কোম্পানীর পুকুর চুরি হালাল করার জন্য ‘খনি ও খনিজ সম্পদ বিধিমালা ১৯৬৮’র’ পরিবর্তন করে তৎকালীন বিএনপি স্বৈরাচার। যা কেবল একটি পত্রের মাধ্যমে শুধু কোম্পানীকে জানিয়ে দেয়া হয় কোথাও কোন আলোচনা ছাড়াই। সাধারণত খনি উত্তোলনে যে কোনো বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক দেয় সাধারণ রয়ালটির পরিমান আগে ছিল ২০%; কিন্তু বিএনপি স্বৈরশাসকেরা এটাকে পরিবর্তন করে উম্মুক্ত খননে রয়ালটি ৬% ও ভুগর্ভস্থ খননে রয়ালটি ৫% নির্ধারন করে। এবং ‘চোরের মা’র বড় গলার’ মত সরকার ঘোষনা করে- ‘‘ কোম্পানীকে সংশ্লিষ্ট সকল বিধিবিধান ও পরবর্তী সময় পরিবর্তিত সকল বিধিবিধান মেনে চলতে হবে’’।[১] এইভাবে লুটেরা বিএনপি একটি ষড়যন্ত্র সফল করতে এগিয়ে যায়।

আরো পড়ুন:  বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম

ফুলবাড়ি কলেজের একটি ভিডিও দেখুন

ফুলবাড়িতে পৌঁছাই ২০০৫ সালের ২ জুলাই সূর্যোদয়ের আগে, ফুলবাড়ি ছেড়ে আসি ২০০৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে আটটায়। মাঝখানের সময়টুকু ফুলবাড়ির মানুষের মাঝখানে থাকা। আজ যে প্রতিবছর ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ি দিবস পালন করা হয় দেশব্যাপী; সেই ফুলবাড়ি বিদ্রোহের ৬ মাস ১৪ দিন আগে আমি সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। যদিও বিদ্রোহের পরেও মাঝে মাঝে ফুলবাড়িতে গেছি। আমরা ফুলবাড়িকে ভুলিনি, ফুলবাড়ি ছাড়া আমার জীবন পূর্ণতাও পায়নি।

ফুলবাড়িতে কাজ শুরু করে ‘সংস্কৃতির নয়া সেতু’র কর্মীরা ২০০৫ এর ডিসেম্বরে। সেই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে যায় বাবু নামের একজন। আর তার সাথে যায় সম্ভবত আরিফুল সজীব, বর্তমানে চ্যানেল ২৪-এর প্রতিবেদক। জানুয়ারি, ২০০৬ থেকে যেতে থাকে মঞ্জুরুল এহসান, সজীবসহ ‘প্রপদ’-এর আরো অনেকে যাদের কথা এখন আর মনে নেই। আমার সাথে যোগাযোগটি হয়তো সাজ্জাদ জাহিদ কিংবা অন্য কেউ করিয়ে দিয়েছিলেন, যা এখন বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। তারা ২০০৫ সালের ডিসেম্বরেই লিফলেট লিখে নিয়ে যায়, যেগুলো ফুলবাড়ি সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রীদেরসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকদের মাঝেও বিতরণ করা হতে থাকে।

২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে প্রতি মঙ্গলবার বিকেলে উর্বশী সিনেমা হলের সামনে সমাবেশ করা হবে। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবারের সমাবেশটি একটানা সাতমাস চলেছিল। সাপ্তাহিক সেই সমাবেশ থেকেই জনগণ জেনে যায় ফুলবাড়িতে কী ভয়ংকর ক্ষতি করার জন্য তৎকালীন সরকার নেমেছিল। তবে পরবর্তী কোনো সরকারই সেই কাজ বন্ধ করেনি। কৃষকদের শোষণ করার নীতিতে লিগেনপি একটাই দল, যদিও তারা একে অপরের বিরুদ্ধে হরহামেশাই ব্যঙ্গ-লড়াই করে থাকে।

ফুলবাড়ি উন্মুক্ত কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলন নিয়ে অনেক আবেগ স্থানীয় লোকজনের কাছে আজো জমা আছে। এতো বছর চলে গেল, আমার আবেগ কমে না। যে জনগণ বাঁশের লাঠি, কাস্তে কিংবা তীর-ধনুকে সজ্জিত হতে পারে হাজারে হাজারে তাদেরকে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই পরাজিত করতে পারে না।

আরো পড়ুন:  রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিতে ঘরে বাইরে একটি গোষ্ঠী অপেক্ষায় আছে

জন্মের পর থেকেই দেখেছি কৃষকের দারিদ্র যত গভীরই হোক না কেন তারা প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের সাথেই আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সিঁড়িতে হাঁটতে গিয়ে এবং ক্যাম্পাসে মিছিল করে করে যে আত্মঅহমিকায় ভুগতাম তা মুচড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেছিলো ফুলবাড়িতে গিয়ে। জনগণের বিদ্রোহী শক্তি দেখেছিলাম ফুলবাড়ির সাঁওতাল গ্রামগুলোতে। পুলিশ বিডিআরের শক্তি ফুলবাড়িকে দমাতে পারেনি। মৃত্যুর কিনারা থেকে ফুলবাড়ির জনগণের সাথে সারা দুনিয়া জেগে উঠুক ফিনিক্স পাখির মতো। ফুলবাড়ির লাল পতাকার কোনো দেশ নেই। ফুলবাড়ি অমর রহে।[২]

তথ্যসূত্র

১. প্রতিবেদন: ফুলবাড়ি কয়লাখনি প্রতিরোধ আন্দোলন, ২০১১, প্রগতির পরিব্রাজক দল।
২. লেখাটির রচনাকাল ২৬ আগস্ট ২০১৪, লেখাটি উক্ত তারিখে প্রাণকাকলি ব্লগে ‘ফুলবাড়ির লাল পতাকা অমর রহে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পরে এটি রোদ্দুরে ডট কমে ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে বর্ধিত কলেবরে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে ১৬ এপ্রিল ২০২২ তারিখে ফুলকিবাজ ডট কমে প্রকাশিত হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!