রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি বা স্বরূপ হচ্ছে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সাথে মানবসমাজের সম্পর্ক

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি বা স্বরূপ (ইংরেজি: Nature of Political Science) হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা হিসেবে এই রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সাথে মানুষ ও সমাজের সম্পর্কের নিয়মাবলীর সারমর্ম। একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান পর্যায়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে কেবলমাত্র রাষ্ট্র ও তার সাবেকি প্রতিষ্ঠানের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি নির্ণয় করা মোটেই সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। নিম্নে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি বা স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

১. সরকারের আলোচনা: সরকার হলো রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ। সরকার ব্যতীত রাষ্ট্রের কল্পনা করা যায় না। কেননা সরকারের মাধ্যমেই রাষ্ট্র তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করে থাকে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তত্ত্বগত আলোচনার সাথে সরকারের প্রতিষ্ঠানগত আলোচনার সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিজ্ঞান পূর্ণতা লাভ করে।

২. রাষ্ট্রের বিজ্ঞান: অধ্যাপক জে. ডাব্লিউ. গার্নার বলেছেন, “রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো সে বিষয় যা কেবল রাষ্ট্রকে নিয়েই আলোচনা করে।”[১] রাষ্ট্রতত্ত্ব বা রাজনৈতিক তত্ত্ব মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞানেরই অংশ। রাষ্ট্রতত্ত্ব বলতে সাধারণত রাষ্ট্রনৈতিক বিষয়ে বিভিন্ন চিন্তাভাবনা, ধারণা এবং সমস্যাদি সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকে বুঝায়। রাষ্ট্র ও সরকার নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেসব আলোচনা করে থাকে তা কিছু ঐতিহাসিক ও কিছু সমসাময়িক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রের অতীত ও বর্তমান এবং এর স্বরূপ ও ভবিষ্যৎ প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে।

৩. রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান: রাষ্ট্রবিজ্ঞান সংবিধান, সরকারি কাঠামো, রাজনৈতিক দল, চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী ইত্যাদি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করে থাকে। সকল রাষ্ট্রেই কতিপয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকে। আর এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকার সঠিকভাবে পরিচালিত হয়।

৪. ক্ষমতাকেন্দ্রিক আলোচনা: রাজনীতির পাঠটি হচ্ছে প্রভাব বিস্তারকারী শ্রেণিগুলোর সম্পর্ক বিষয়ক আলোচনা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিত থেকেও ব্যাখ্যা করা যায়। রবার্ট ডাল রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে ক্ষমতা, শাসন ও কর্তৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। অতএব, রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন, সংরক্ষণ, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রয়োগ এবং প্রতিরোধ যে পাঠ্য বিষয়ে আলোচিত হয় তা হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান।

আরো পড়ুন:  ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হিসেবে স্বাধীনতা সম্পর্কে হেগেলের ধারণা

৫. আন্তর্জাতিক বিষয়ের আলোচনা: গোটা বিশ্বে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রাষ্টবিজ্ঞানে আলোচিত হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সংগঠন, কূটনীতি, সাম্রাজ্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, প্রতিরক্ষানীতি, যুদ্ধ ও শান্তির সাথে সম্পর্কযুক্ত নানা সমস্যা ইত্যাদি গুরুত্ব সহকারে বিশ্লেষিত হয়। তাই বলা যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রীতিনীতি অধ্যয়ন করা হয়।

৬. আইনের আলোচনা: উইলোবির মতে, আইন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয়। সার্বভৌমত্বের নির্দেশকেই আইন হিসেবে গণ্য করা হয়। রাষ্ট্রের পক্ষেই সরকার আইন প্রণয়ন করে, শাসনকার্য পরিচালনা এবং শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা করে। তাই আইনের আলোচনা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এখতিয়ারভুক্ত।

৭. তুলনামূলক রাজনীতির আলোচনা: বর্তমানে সমগ্র পৃথিবীর তুলনামূলক রাজনীতির পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান। রাষ্ট্রবিজ্ঞান দেশীয় রাজনীতির সাথে বহির্বিশ্বের রাজনীতির একটি তুলনামূলক আলোচনা করে। সে ক্ষেত্রে দেশ ও বহির্বিশ্বের সামগ্রিক রাজনীতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনার পরিধিভুক্ত।

৮. নৈতিকতার আলোচনা: নৈতিকতাও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান কেবলমাত্র বর্তমান বিষয় নিয়েই আলোচনা করে না বরং উচিত অনুচিত, ভালোমন্দ নিয়েও পর্যালোচনা করে থাকে। ইহা মানুষের নৈতিক বিচারের প্রতি দৃষ্টিপাত করে।

৯. মানুষের রাজনৈতিক জীবন: সমাজবদ্ধ মানুষের রাজনৈতিক জীবনের আলোচনাই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় বিষয়। মানুষের সমাজ প্রবণতার ভিত্তিতেই গোষ্ঠীবদ্ধ বা সমাজজীবনের সৃষ্টি। এর ফলেই সমাজতন্ত্রীদের ব্যক্তিত্বের উন্মেষ ঘটে এবং শান্তিপূর্ণ সমাজজীবন সম্ভব হয়।

১০. পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা: বর্তমান কালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। আর অতীত অবস্থা এবং পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞান সামঞ্জস্য বিধান করে। অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের অভিমত হলো, বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নতুন তত্ত্বের অভিজ্ঞতাবাদী অনুসন্ধানের, নতুন ভিত্তির, জ্ঞানের, নতুন ধরনের সংগঠনের প্রসারের সূচনা করেছে। 

১১. রাজনৈতিক আচরণের আলোচনা: বর্তমানে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো নাগরিকের রাজনৈতিক আচরণবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি সাম্প্রতিক উন্নয়ন। এর মাধ্যমে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলের রাজনৈতিক আচরণ বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়।[২]

পরিশেষে বলা যায় যে, সামাজিক বিজ্ঞানের একটি অন্যতম শাখা হিসেবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সমস্যার আলোচনা প্রসঙ্গে বিশেষভাবে রাষ্ট্র, সরকার ও আইনের উপর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি মূলত সমাজ ও মানুষকে ঘিরে আবর্তিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান যেহেতু সর্বদা গতিশীল, সেহেতু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রকৃতি গতিশীল পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে তার নিজস্বতা বজায় রাখে। সেজন্য আধুনিক কালে রাষ্ট্রের প্রকৃতি ব্যাপকভাবে প্রসারিত হচ্ছে।

আরো পড়ুন:  রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু বা পরিধি বা সীমানা মানুষের সকল রাজনৈতিক কার্যকলাপ

তথ্যসূত্র

১. An American professor of political science Jems wilford Garner said “Political science begins and ends with the state”. J. W. Garner, Political Science and Government, Calcutta, 1951, P. 9.
২. ড. রবিউল ইসলাম, মীর মোশাররফ হোসেন ও অন্যান্য, রাজনৈতিক তত্ত্ব পরিচিতি, গ্রন্থ কুটির ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ সেপ্টেম্বর ২০১৯, পৃষ্ঠা ১০-১১।

Leave a Comment

error: Content is protected !!