সাম্যের মার্কসবাদী ভাবনা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা

সাম্যের মার্কসবাদী ভাবনা বা সাম্য সম্পর্কে মার্কসবাদী ধারণা (ইংরেজি: Marxist ideas on equality) হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নির্মাণ এবং সামন্তবাদী ও পুঁজিবাদী সমাজের উচ্ছেদ করে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। উনবিংশ শতকের রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে মার্কসবাদ এনেছে সাম্যকে রাষ্ট্রে ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের সম্পূর্ণ নতুন এক প্রবাহ।

উনবিংশ শতকেই জার্মানি ও রাশিয়ায় প্রগতিশীল আন্দোলনের একটি ধারা রাজনৈতিক সাহিত্যে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে এক সারি মনীষীর সৌজন্যে। এদের মধ্যে ছিলেন রাশিয়ায় পেস্তেল (Pestel), মুরাভিয়েভ (Muraviev) গের্তসেন (Gertsen), দস্তয়েভস্কির (Dostaevaski) মতো একদল বুদ্ধিজীবী। সামাজিক অন্যায় ও পীড়ন এবং স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একরকম জেহাদ ঘোষণা করেছেন এঁরা।

সাম্যের মার্কসবাদী ভাবনা

জার্মানিতে একই সময়ে কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের ভাবনা প্রচার করে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের কাছে বিপুল শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছেন। সাম্যের প্রশ্নই মিখাইল বাকুনিন, পিয়েরে জোসেফ প্রুধোঁ এবং সমকালের নয়া-হেগেলীয় বলে পরিচিত আর্নল্ড রুগে, ফয়েরবাখ প্রমুখের সঙ্গে বিতর্কে নেমেছেন মার্কস ও এঙ্গেলস। সাম্যের প্রশ্নে মার্কসবাদ প্রচার করেছে সমাজ সংগঠনের এক গঠনমুলক ভাবনা। সাম্যের ভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে একাধিক নীতি। 

  • পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আধিপত্য ও শোষণের চরিত্রকে উদঘাটন করা; 
  • প্রলেতারিয়েতাকে শাসক শ্রেণির পদে উন্নীত করা, গণতন্ত্রের সংগ্রামে জয়লাভ করা; 
  • সর্বহারার একনায়কত্ব ও বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রথমে আসবে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং অন্তিমে আসবে সমভোগবাদ বা সাম্যবাদ; 
  • সমাজতন্ত্রের সাম্যের নীতি হলো ‘প্রত্যেকের সামর্থ্য অনুসারে ও শ্রম অনুসারে প্রাপ্তি’। সাম্যবাদে এই নীতি হলো, ‘প্রত্যেকের সামর্থ্য ও প্রয়োজন অনুসারে প্রাপ্তি’। 
  • সাম্যবাদী সমাজে (১) আমলাতান্ত্রিক ও শ্রেণি আধিপত্যযুক্ত শাসন থাকবে না; (২) প্রভুত্ব ও অধীনতার সম্পর্ক দূর হবে; (৩) পুরোনো সমাজের স্থান নেবে সমিতি (৪) প্রতিষ্ঠিত হবে সমবায়, সহযোগিতা (৫) সামাজিক শ্রম, সৃজনী শক্তি সব কিছু মিলে রূপায়িত হবে এক আত্মসক্রিয়তার সমাজ। 
আরো পড়ুন:  আর্নেস্ট বার্কার সাম্য সম্পর্কে উদারবাদী মতামত প্রদান করেন

সাম্য সম্পর্কে মার্কসবাদের স্পষ্ট অভিব্যক্তি হচ্ছে যতদিন সমাজে শ্রেণিবিরোধ থাকবে ততদিন সমতা অর্জন সম্ভব নয়। সাম্যের দুটি বিশেষ ভাবনা মাকর্সবাদে তাৎপর্যপূর্ণ—অর্থনৈতিক সমতা এবং মানবিক সমতা। সমাজতান্ত্রিক সমাজ এই অর্থনৈতিক সমতার ভিত্তি প্রস্তুত ও ক্রমশ দৃঢ় করবে। সাম্যবাদী সমাজ মানবতাবাদী সমাজ। এখানে মানবিক মুক্তি প্রকাশ পায় ব্যক্তি মানুষের সমগ্র মানুষে (Concept of whole man) রূপান্তরে। প্রকারান্তরে মার্কস যেন জ্যাঁ জ্যাক রুশোর সেই নৈতিক, উচ্চমূল্যের মানবিক মূল্যবোধকে ফিরিয়ে নিয়ে এলেন সাম্যভিত্তিক এই সমাজে। উদারবাদের মতো সমতা এখানে কোনো সীমিত, নিয়ন্ত্রিত ভাবনা নয়, সম্পূর্ণভাবেই ইতিবাচক।

সাম্যবাদের নৈতিক, মানবিক প্রগতির ভাবনায় পুঁজিবাদী সমাজের উদারবাদী সাম্য ভাবনা বিরাজিত অর্থনৈতিক অসাম্য অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল। এই সাম্যবাদে সকলের সমান সুযোগ থাকবে, প্রতেক্যের চাহিদা ও প্রয়োজন মিটবে কিন্তু শ্রম ছাড়া রুটি মিলবে না। অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুঞ্জীভবন রোধ করে, সমষ্টিগত মালিকানা ও সামাজিক শ্রমের ভাবনাকে স্বীকৃতি দিয়ে সাম্যবাদ সমতার ধারণাকে ইতিবাচক ও প্রগতিশীল করেছে।

সাম্যের এই প্রগতিশীল ভাবনা কতটা কার্যকরি ও বাস্তব এ প্রশ্ন প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিবিপ্লবী মহল থেকে উঠেছে। তাদের মতে সাম্যবাদের নৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক ভাবনা তার্কিক বিচারে উত্তীর্ণ হয় না। প্রথম প্রশ্ন—কোনো জোর করে চাপানো আবেগ-অনুভূতির আবেদন নয়, সমতাকে বিচার করতে হবে বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে এটাই আশা করা হয় ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য, পরিস্থিতি ও পরিবেশগত পার্থক্য অনুসারেই সাম্যের ধারণাকে বিচার করা জরুরি। অসাম্য অবশ্যই বর্জনীয়, কিন্তু পার্থক্যের বৈধতা বা প্রয়োজনীয়তাকে ক্ষেত্রবিশেষে যাচাই করে নেওয়া দরকার। বিজ্ঞান চেতনা এটা বুঝতে অসমর্থ নয় যে খোলাখুলি বৈষম্য বা বিভেদের প্রচেষ্টা হলে তার পরিণাম কী হতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, সাম্যের প্রশ্নে অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদ (Economic Determinism) শেষ কথা হতে পারে না। প্রচলিত কাঠামো বা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, আর্থ-সামাজিক সমতার প্রশ্নে মার্কসীয় রচনাবলি জার্মান ভাববাদ (German Idealism), পুঁজি (Capital), রাজনৈতিক অর্থনীতির সমালোচনার ভূমিকা (Preface to a Critique of Political Economy), দর্শনের দারিদ্র (Poverty of Philosophy) কমিউনিস্ট ইস্তাহার (Communist Manifesto), ফ্রান্সে শ্রেণিসংগ্রাম (Class Struggle in France, 1848-50), গোথা কর্মসূচির সমালোচনা (Critique of Gotha Programme), এঙ্গেলস-এর অ্যান্টি ট্যুরিং (Anti-Duhring) বা লেনিনের ‘কী করতে হবে’ (What is to be done) অর্থনীতির প্রশ্নকেই বিচার করেছে। 

আরো পড়ুন:  হেগেলের জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা হচ্ছে জার্মান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উৎকর্ষ ও শ্রেষ্ঠ শক্তি

পুঁজিবাদী উৎপাদন প্রবণতাই যে শ্রমিক শোষণের কারণ, উদ্বৃত্ত মূল্য গ্রাস করে অসাম্যের যে বীজ রোপিত হয়, শ্রমিকের বিযুক্তির (Alienation) মূল কারণ যে পুঁজির কেন্দ্রীভবন, ধনতান্ত্রিক অমানবিক বৈশিষ্ট্য, অবাধ নীতি, এদিকে তাকিয়ে মার্কস-এঙ্গেলস সমাজ পরিবর্তনের যে বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দেন তা অনস্বীকার্য হলেও বুর্জোয়া শ্রেণির পতন ও প্রলেতারিয়েতের জয়লাভ স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে ১৯৯০ সালের পরে বড় ধাক্কা খেয়েছে।

সাম্যের মার্কসবাদী ভাবনা সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব ও অনুশীলনের মধ্যে অসঙ্গতি থেকে গেছে। চীন ও সোভিয়েতসহ বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে সুবিধাবাদ, সংশোধনবাদ, দলীয় আমলাতন্ত্র ও শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং সমাজতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। শ্রমিকের বিপ্লবী চেতনায়, শ্রমিক ঐক্যে ফাটল ধরেছে। বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের বিভিন্ন নীতি বিপর্যস্ত হয়েছে।

তথ্যসূত্র

১. দেবাশীষ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়সমূহ, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৯, পৃষ্ঠা ৫০-৫১।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page