সাম্যের উদারবাদী ভাবনা হচ্ছে আইন ও সাংবিধানিক সাম্য যা পুঁজিবাদ রক্ষাকারী

সাম্যের উদারবাদী ভাবনা বা সাম্য সম্পর্কে উদারতাবাদী ধারণা (ইংরেজি: Liberal ideas on equality) হচ্ছে আইন ও সাংবিধানিক সাম্য যা পুঁজিবাদ, মুনাফা ও শোষণকে উচ্ছেদ করার বিপক্ষে থাকে। সাম্যের প্রকৃতি বিচারে সাম্য বিষয়ক তাত্ত্বিক বিতর্কটিকে তুলে ধরা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি বিশেষ প্রবণতা। বর্তমান আলোচনায় বিভিন্ন তত্ত্বকে সামনে রেখে সাম্য বিষয়ে মূল বিতর্কটিকে তুলে ধরার চেষ্টা হবে। দাস ও সামন্তবাদী যুগে সাম্যের কোনো তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল না। স্টোয়িক, সফিস্ট দর্শনে সব মানুষই সমান, প্রকৃতির চোখে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ নেই এই ধারণা প্রচারে এলেও বাস্তবের নিরিখে সাম্যের যাচাই হয় নি।

অষ্টাদশ শতকেই সাম্যের একটি দার্শনিক ভিত্তি রচিত হয় জ্যাঁ জ্যাক রুশো, টমাস পেইন প্রমুখের লেখার সূত্রে। সাম্যের অর্থ, প্রকৃত চরিত্র নিয়ে রীতিমত বিতর্ক শুরু হয়ে গেল ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে। এই যুগেই আমরা পেলাম সাম্যের উদারবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ভাবনা। এই পর্বেই বেশ কিছু মঞ্চ তৈরি হয়েছে সাম্যের প্রশ্নে রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবনাকে সামনে রেখে। সাম্যের নয়া-উদারবাদী ভাবনায় এই প্রবণতা স্পষ্ট। এছাড়া নারী মুক্তির প্রশ্নেও সাম্য সংক্রান্ত ভাবনা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় নজর কেড়েছে।

সাম্যের উদারবাদী ভাবনা

সাম্যের উদারবাদী ভাবনা বিষয়ক সূত্রটি জন লক, জ্যাঁ জ্যাক রুশো, চার্লস লুই মন্টেস্কু বা টমাস পেইনের আলোচনার সূত্র ধরে গড়ে উঠলেও এর প্রেক্ষাপটটি ছিল পুঁজিবাদের বিজয়ের যুগ। সামন্তবাদী সমাজের গর্ভে নতুন যে পুঁজিবাদী সমাজ ও সম্পর্কের উদ্ভব হলো এবং রূপলাভ করল তার সূচনা ও বিকাশ ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপের ইতালি, নেদারল্যান্ড, ব্রিটেন, ফ্রান্স হয়ে উঠেছে পুঁজিবাদের অনুকূল পরিবেশ যা উনবিংশ শতকেই জমাট বেঁধেছে। অষ্টাদশ শতকের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ও ফরাসি বিপ্লবের পরিস্থিতি উনবিংশ শতকে একটি পরিপক্ক রাজনৈতিক মতবাদ হিসাবে উদারবাদের উদ্ভবে সাহায্য করেছে। উদারবাদ সমতার প্রশ্নে যে মতবাদকে প্রচার করে তা হলো:

আরো পড়ুন:  সরল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক বানানো একটি শব্দ

১. ধর্ম, প্রকৃতিবোধ, সমাজ, রাষ্ট্র সব কিছুকেই বিচারবুদ্ধি দিয়ে বুঝতে হবে। 
২. রাষ্ট্র ও শাসনের রূপ পরিবর্তনের অধিকার জনগণের আছে। জনগণই হবে নতুন ইতিহাসের নির্ধারক শক্তি।
৩. সমাজের বিশৃঙ্খলা ও অন্যায্যতার প্রশ্নে প্রাধান্য পেল বিচক্ষণ ও ন্যায়পরায়ণ আইন। শাসনের অনাচার রোধে উদারবাদী ভাবাদর্শে স্থান পেল ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রশ্ন, নাগরিক হিতাহিতের ভাবনা এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং সাংবিধানিক-রাজনৈতিক সংস্কার।
৪. সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্রের প্রভুত্বের সীমা নির্ধারিত হলো। এই সঙ্গে এটাও বলা হলো সাম্যের দাবি কোনো অবিমিশ্র (absolute) দাবি নয়। এর মধ্যে বৈচিত্র্য যেমন থাকবে, প্রয়োজনে এর সীমাও বেঁধে দিতে হবে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি, মানবিকতার প্রেরণা, গণতন্ত্রের দ্রুত বিকাশ আধুনিক কালের দার্শনিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনায় উদারবাদের প্রেরণা সন্দেহ নেই। উদারবাদই গড়ে দিল অধিবিদ্যার (Metaphysics) সংকীর্ণ সীমা অতিক্রম করে বাস্তবতার পথে যাত্রার অভিমুখ।

কার্ল মার্কসের পূর্বে এই অভিমুখ গড়ার কাজ সম্পন্ন করেছেন ইমানুয়েল কান্ট, জন স্টুয়ার্ট মিল ও জেরেমি বেনথাম। জ্ঞানের এই ভাবাদর্শ বহুধাপি হলেও বা প্রভেদমূলক হলেও উচ্চমুল্য পেয়েছে এদের নরমপন্থা ও নতুনের সঙ্গে মানিয়ে নেবার কারণে। তবে এই উদারবাদী ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা হলো (১) সাম্যের প্রশ্নে কিছু অনুমানকে প্রস্তাবাকারে পেশ করা (যেমন আইনের চোখে সমানাধিকার, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের বেশি মাত্রায় হিতসাধন, সামাজিক শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ রক্ষা) হয় মাত্র, বাস্তবে এগুলির কার্যকারিতার প্রশ্নে তেমনভাবে মনোযোগ না দেওয়া (২) ব্যক্তি মালিকানা ব্যবস্থার অবসানের কথা এরা বলেন না, সাংবিধানিক সংস্কারের গন্ডি টেনেই এরা সন্তুষ্ট (৩) সাম্যের ক্ষেত্রে সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্র প্রস্তুত হলেও সমাজ পুনর্গঠনের প্রশ্নে, সামাজিক সম্পর্কের প্রশ্নে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটে নি। অগ্রগতির একটা ধাপেই থেমে যায় সাম্যের নির্মিতি।[১]

তথ্যসূত্র

১. দেবাশীষ চক্রবর্তী, রাষ্ট্রচিন্তার বিষয়সমূহ, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় পুনর্মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৯, পৃষ্ঠা ৫০-৫১।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page