কামন্দকীয় নীতিসার একটি প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ যা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থা বর্ণনা করে

কামন্দকীয় নীতিসার বা নীতিসার (ইংরেজি: Kamandakiya Nitisar) একটি প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ, যা রাষ্ট্রশাসনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা পদ্ধতিবিদ্যার উপাদানগুলি বর্ণনা করে। এটি কামন্দক দ্বারা রচিত, যিনি কামন্দকী বা কামন্দকীয় নামেও পরিচিত, এবং তিনি কৌটিল্যের শিষ্য ছিলেন।[১]

গ্রন্থটির রচনাকাল সম্বন্ধে মতভেদ আছে। আনুমানিক পঞ্চম খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে অর্থাৎ ভারতে গুপ্তযুগের শেষ পর্যায়ে কামন্দক পণ্ডিত কর্তৃক এই গ্রন্থ রচিত হয় বলে অনেকের অভিমত। জয়সওয়াল মনে করতেন যে গুপ্ত আমলের দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের মন্ত্রী শিখরস্বামী গ্রন্থটির রচয়িতা ছিলেন। কোনও কোনও প্রাচীন গ্রন্থে এই নীতিসারের উল্লেখ দেখা যায়। ছন্দে রচিত কামন্দকীয় নীতিসারের কয়েকটি পৃথক সংস্করণ আছে।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, শুক্রনীতিসার ও কামন্দকীয় নীতিসার—এই তিনটি নীতিগ্রন্থের মধ্যে কামন্দকীয় নীতিসার অন্য দুটি অপেক্ষা ক্ষুদ্র হইলেও অল্পের মধ্যে বেশ উপযোগী। অন্যান্যগুলিতে রাজনীতি ছাড়াও অন্যান্য কথাও আছে; কিন্তু এটির বিশেষত্ব যে এতে কেবল রাজনীতির কথাই বেশি।

গ্রন্থের মোট কুড়িটি সর্গের প্রথমটির প্রারম্ভে বিষ্ণুগুপ্ত অর্থাৎ চাণক্য কৌটিল্যকে নমস্কার জানিয়ে বলা হয়েছে যে গ্রন্থটি সংক্ষেপে অর্থশাস্ত্রের অনুসরণে লিখিত। সুতরাং যাহারা কৌটিল্যের নীতিশাস্ত্র বুঝিতে চাহেন, তাঁহাদের এই বই খুব উপকারে আসবে। এই বইটি আয়ত্ত করতে পারলে শুক্রনীতি ও চাণক্যনীতি আয়ত্ত করা সহজ হবে।

কামন্দকের এই নীতিসারে রাজার কর্তব্য ও অকর্তব্য বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে যথাবিহিত দণ্ডবিধান, যথোচিত রাজ্যশাসন, প্রজাদের মঙ্গলের জন্য বিশ্বাসঘাতকতা ও বিষপ্রয়োগের প্রয়োজন দর্শিয়েছেন।

গ্রন্থটিতে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হিসেবে ষোল প্রকার সন্ধি, কী কী কারণে যুদ্ধ বিগ্রহের সূত্রপাত ঘটে, মন্ত্রীদের সঙ্গে কার্যনিবাহের কৌশল, উপযুক্ত গুণসম্পন্ন দূত ও গুপ্তচর নিয়োগ, যুদ্ধনীতি, শস্ত্রবিজ্ঞান, রথ-অশ্ব-নৌকা-হস্তী পরিচালনে এবং ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শিতা, শিবির স্থাপন, সৈন্যসমাবেশ এবং সতেরো প্রকার ব্যুহসজ্জা ইত্যাদির উপর অনুপুঙ্খ আলোচনা ও নির্দেশ আছে।[২]

এই গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদক গণপতি সরকার বলেছেন, নীতিশাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য দেশকে স্বাধীন, সুসমৃদ্ধ ও সুশৃঙ্খলায় রাখা। হঠাত কোনো কাজে অগ্রসর হতে না দেয়া বা হঠাত বিগ্রহে প্রবৃত্ত হতে না দেওয়া, এটাই নীতির প্রধান কাজ। সাম দান ভেদ ও দণ্ডকে উপযুক্ত ভাবে পরিচালনা করবার রীতি নির্দেশ করাই নীতিশাস্ত্রের প্রধান উদ্দেশ্য। কোন নীতি কি ভাবে, কোন স্থানে, কি উদ্দেশে, কার মাধ্যমে, কার উপর প্রয়োগ করতে হবে এবং কোন সময় কোন নীতি অবলম্বন করতে হবে তাই নীতিশাস্ত্র শিক্ষা দেয়। দেশকে সুশাসনে রেখে দেশের সুখ ও শান্তি বৃদ্ধি করাই নীতির কাজ।[৩] অর্থাৎ এই গ্রন্থ নীতিমূলক।

আরো পড়ুন:  এপ্রিল থিসিস ছিল বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন প্রদত্ত দিকনির্দেশক প্রতিপাদ্য

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ৫ জানুয়ারি ২০১৯, “কামন্দকীয় নীতিসার গ্রন্থ প্রসঙ্গে আলোচনা”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/book/kamandakiya-nitisar/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৮০-৮১।
৩. গণপতি সরকার, কামন্দকীয় নীতিসার, প্রকাশক নৃপেন্দ্রকুমার বসু, কলকাতা, আশ্বিন ১৩৩১, মুখবন্ধ।

Leave a Comment

error: Content is protected !!