ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বা পুনর্জাগরণ আন্দোলনের প্রভাব

ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বা পুনর্জাগরণ আন্দোলনের প্রভাব (ইংরেজি: The influence of the Renaissance on European political thought) ছিল অপরিসীম। মধ্যযুগীয় অবস্থা থেকে আধুনিক ইউরোপের অভ্যুদয়ের পেছনে রেনেসাঁর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রেনেসাঁর কালপর্বকে চিহ্নিত করা হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ কয়েক দশক থেকে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম তিন দশক পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কে। ১৪৫৩ সালে তুর্কীদের হাতে কনস্টান্টিনোপল ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর অনেক পন্ডিত পশ্চিম ইউরোপে পাড়ি জমান এবং সেখানকার চলমান প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবনের ধারায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে ইটালীকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয় এই আন্দোলন। যা পরবর্তীতে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, স্পেনসহ ইউরোপের অপরাপর দেশেও বিস্তৃত হয়।

উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৮৩৫ সালের পূর্বে ‘রেনেসাঁ’ শব্দটিকে ব্যাপকতর আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করে ব্যবহার করতে দেখা যায় না। আভিধানিক অর্থে রেনেসাঁর অর্থ হলো নব জাগরণ বা প্রাচীন বিশেষত: গ্রীসীয় যুক্তিবাদের ও বিদ্যাচর্চার পুনর্জন্ম। অভিধানে রেনেসাঁর এই অর্থ দেয়া হলেও একে কেবল পুনর্জন্ম বলে ধরে নেয়া যায় না। ব্যাপক ও গভীর অর্থে রেনেসাঁ বলতে বুঝায় পুরনোকে ভিত্তি করে নব নির্মাণ বা নতুন সৃষ্টি। কেবল অতীতে প্রত্যাবর্তনের নাম যেমন রেনেসাঁ নয়; আবার অতীতকে পুরোপুরিভাবে বর্জনের কর্মসূচীও রেনেসাঁয় নেই। অতীতের যা কিছু কল্যাণকর ও স্থায়ী তা-ই রেনেসাঁর বিষয়বস্তু। সে দিক থেকে রেনেসাঁ বলতে প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সাহিত্য, দর্শন, শিল্পকলা সম্পর্কে চর্চার এক অদম্য উৎসাহকে বুঝায়। অতীতের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে বর্তমানের অভিজ্ঞতার আলোকে রেনেসাঁ ভবিষ্যৎকে ধারণ করে। 

বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের নাম। মনের মুক্তি তথা চিন্তার স্বাধীনতা অর্জিত হয় রেনেসাঁর মাধ্যমে। মানুষের মধ্যে এক নতুন, স্বাধীন, সাহসী চেতনা ও অনুসন্ধিৎসার মনোবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলে রেনেসাঁ। এটি মানুষের চিন্তারাজ্যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। জাতীয় মানসলোকে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সংঘটিত হয় এই রেনেসাঁর মাধ্যমে। উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় রেনেসাঁর মূলে আরবীয় মুসলমানদের প্রচুর অবদান ছিল। ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইউরোপীয়রা মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে গ্রীক-ল্যাটিন ক্লাসিক্যাল চিন্তাধারা ও উন্নত মুসলিম সভ্যতার পরিচয় লাভ করে। এ পরিচয়ের ফলে ইউরোপে রেনেসাঁর উন্মেষ ঘটে। ঐতিহাসিক টয়নবি যথার্থই বলেছেন, ক্রুসেড বা ধর্ম যুদ্ধের ফলেই আধুনিক ইউরোপ জন্মলাভ করেছে (ইংরেজি: Modern Europe was born out of the spirit of the Crusade).

নবজাগরণের জীবনদর্শন

রেনেসাঁ রাজনৈতিক অথবা ধর্মীয় আন্দোলন ছিল না। একটি মানসিক অবস্থান বা জীবনদর্শন হিসেবে একে ব্যাখ্যা করা যায়। রিনেসাঁস্ আমলে মানুষ খ্রীস্টীয় গির্জার অনুগত সন্তান এবং রাজা, সম্রাট ও ডিউকের (ভূ-স্বামী) অনুগত প্রজা হিসেবে নিজেদের অবস্থান মেনে নিয়েছিল। কিন্তু তাদের জীবনদর্শনের আমূল পরিবর্তন হয়। তারা বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরিধান, বিভিন্ন ভাষায় মনের ভাব আদান-প্রদান এবং নিজেদের খুশিমতো বিভিন্ন ধরনের জীবনযাত্রার পদ্ধতি গ্রহণ করে। এরপর তারা মৃত্যুর পর স্বর্গে গিয়ে পবিত্র জীবন-যাপনের আশায় তাদের সমস্ত চিন্তা ও কর্মকে নিয়োগ করা থেকে বিরত থাকে।

সংস্কৃতিতে প্রভাব

এক অর্থে রেনেসাঁ একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রাচীন গ্রীস ও রোমের শ্রেষ্ঠ লেখক ও শিল্পীদের আদর্শ ও ন্যায়নীতির অনুসরণ কিংবা অনুকরণ সাধারণতঃ রিনেসাঁসের লক্ষণ হিসেবে পরিগণিত হয়। এই আন্দোলন জীবন, স্বাধীনতা, রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম প্রভৃতি সম্পর্কে মানুষের মধ্যযুগীয় ধর্মভিত্তিক ধারণাকে পুরোপুরিভাবে পাল্টে ফেলে। রেনেসাঁর মাধ্যমে সংঘটিত পরিবর্তন খন্ডিত বা বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার প্রতিফলন নয়; বরং এতে মানব সমাজের সামগ্রিক সর্বজনীনতা ফুটে উঠে। দেহের কোনো একটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ভালো থাকা দিয়ে যেমন দৈহিক সুস্থতা বুঝায় না, তেমনি রেনেসাঁ বলতে একটি জাতির মানসিক ক্রিয়াকর্মের বিশেষ কোনো দিক নয় বরং সার্বিক উৎকর্ষতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশকে বুঝায়। এখানে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সবকিছুই অন্তর্ভূক্ত। রেনেসাঁকে তাই কেউ কেউ মননশীল সাংস্কৃতিক চেতনা আর তার বিচিত্র সম্প্রসারণের নামান্তর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। 

শিল্পের ক্ষেত্রে রিনেসাঁস সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করে। জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে শিল্প অত্যন্ত মূল্যবান বলে স্বীকৃতি পায়। এর মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টিকর্তা এবং সৃষ্টির প্রতিফলন লক্ষ্য করতে পারে। তা’ছাড়া বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে মানুষ তার অবস্থান সম্পর্কেও অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো শিল্পীর হাতে তা’ বিজ্ঞানে পর্যবসিত হয় এবং তার সাহায্যে তিনি প্রকৃতিকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আবিষ্কারের ফলাফল সংরক্ষণ করেন। শিল্প দৃশ্যমান জগৎভিত্তিক হবে এবং ইতোমধ্যে আবিষ্কৃত ভারসাম্য (bal-ance), সমন্বয় (harmony) ও চিত্রানুপাত (perspection) সম্পর্কিত ধারণা গণিতশাস্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী বাস্তবায়িত করতে হবে। রিনেসাঁস আমলের চিত্রশিল্পী, ভাস্করশিল্পী এবং স্থাপত্যবিদদের শিল্পকর্মে মানুষের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান প্রতিফলিত হয়।

খ্রিস্টীয় ১৪৯০ সাল থেকে ১৫২৭ সাল অর্থাৎ প্রায় ৩৫ বছর যাবৎ উচ্চস্তরের রেনেসাঁ শিল্পকলা সাড়ম্বরে আত্মপ্রকাশ করে। এর উদ্‌দ্গাতা ছিলেন তিনজন উচ্চস্তরের শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯), মাইকেল এ্যাঞ্জেলো (১৪৭৫-১৫৬৪) এবং র‍্যাফায়েল (১৪৮৩-১৫২০)। তাঁরা ছিলেন সেই আমলের তিনটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব-রূপদানকারী শিল্পী। অদ্বিতীয় ও সহজাত সৃজনী-ক্ষমতার অধিকারী লিওনার্দো সর্বশ্রেষ্ঠ “রিনেসাঁস ম্যান” হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। জ্ঞানের কোনো শাখাই তিনি এড়িয়ে যাননি। মানবদেহ আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের চূড়ান্ত মাধ্যম বিধায় তা’ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি বিশালকায় পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করে তাঁর সৃজনীশক্তির পরিচয় দেন। রাফায়েল তাঁর শিল্পকর্মে সঙ্গতিপূর্ণ, সৌন্দর্যময় এবং শান্ত-সমাহিত ইত্যাদি প্রাচীন শৈল্পিক আদর্শের ধারণা রূপায়িত করেন।

লিওনার্দো তাঁর জীবনকালে মহান শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অঙ্গ-ব্যবচ্ছেদ বিদ্যা, আকাশ-ভ্রমণ এবং গাছপালা ও জন্তু-জানোয়ারের শারীরিক গঠন এবং জীবনযাপন-পদ্ধতি সম্পর্কে অনুসন্ধান-প্রিয় ছিলেন বলে চিত্রাঙ্কনে যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি। তিনি মাত্র কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ চিত্রশিল্পের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এর মধ্যে রয়েছে “মোনা লিসা” (Mona Lisa) এবং “দি ভার্জিন অব দি রকস্” (The Virgin of the Rocks) । এ দু’টি চিত্র পারীর লুভ্ (Luvre) মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।

মাইকেল এ্যাঞ্জেলোর শ্বেতপাথরে খোদাই-করা “পিয়েতা’ (Pieta) নামে পরিচিত ম্যাডোনার ক্রোড়ে যীশুর মৃতদেহ এবং ফ্লোরেন্সের এ্যাকাডেমিয়া (Accademia) মিউজিয়ামে রক্ষিত শ্বেত-পাথরের বিশাল মূর্তি “ডেভিড” (David) মহান শিল্পের এক অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ। মাইকেল এ্যাঞ্জেলো নিজেকে প্রধানতঃ ভাস্কর-শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করতেন। তা’ সত্ত্বেও ভ্যাটিকানের সিস্টিন চ্যাপেলের (Sistine Chapel) ছাদের নীচে তাঁর আঁকা বিশাল “ফ্রেস্কো” (Fresco) একটি অতুলনীয় শিল্পকর্ম এবং এর জন্য তিনি অধিকতর খ্যাতি লাভ করেন। ১৫০৮ সাল থেকে ১৫১২ সালের মধ্যে তিনি উল্লিখিত মহান শিল্পকর্ম সম্পর্কিত কাজ শেষ করেন।
মাইকেল এ্যাঞ্জেলো যখন সিস্টিন চ্যাপেলে কাজ করছিলেন, তখন ভ্যাটিকানে র‍্যাফায়েল তাঁর “দি স্কুল অব এ্যাথেন্স” (The School of Athens) শীর্ষক চিত্রাঙ্কনে নিয়োজিত ছিলেন। এই বিশালকার চিত্রে র‍্যাফায়েল “এরিস্টটেলিয়ান” ও “প্ল্যাটনিক” চিন্তাধারার প্রতিনিধিদের হাজির করেন। এই চিত্রে দার্শনিক ও শিল্পীরা কথোপকথনে নিয়োজিত রয়েছেন বলে দেখানো হয়।

রেনেসাঁ আমলের স্থাপত্যশিল্পীদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ছিলেন ডোনাটো ব্র্যামান্তে (Donato Bramante)। ১৪৪৪ সালে জন্মগ্রহণকারী ব্র্যামান্তে ১৪৯৯ সালে রোমে আসেন। পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস (শাসনকাল ১৫০৩ – ১৫১৩) তাঁকে ভ্যাটিকানের স্থপতি পদে নিয়োগ করেন। তাঁরা দু’জনে ৪ শতকে নির্মিত পুরাতন সেন্ট পিটার্স গির্জা ভেঙ্গে ফেলে নতুন একটি বিশালকায় গির্জা নির্মাণের পরিকল্পনা তৈরি করেন। এই গির্জা নির্মাণের কাজ ব্র্যামান্তের মৃত্যুর বহুকাল পর শেষ করা সম্ভব হয়। এই গির্জাটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ গির্জা।

বিজ্ঞানে প্রভাব

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ আন্দোলনের ফলে সূচিত হয় বিজ্ঞানে নব নব আবিস্কার। কম্পাস ও সমুদ্রপথ আবিষ্কারের ফলে ১৪৯২ সালে আমেরিকাসহ নতুন নতুন ভূ-খন্ডের সন্ধান ঘটে এ পর্বে। গোলাবারুদের আবিষ্কার এ যুগের অপর একটি অসাধারণ ঘটনা যা বিশ্বব্যাপী ইউরোপীয় আধিপত্য স্থাপনে ও বিস্তারে সহায়তা করে। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রসার ঘটে এ সময়। ছাপাখানা স্থাপনের প্রযুক্তিও আবিস্কৃত হয় একই সময়ে। মোটকথা, রেনেসাঁ এমন একটি আন্দোলন হিসেবে সূচিত হয় যার ফলে মধ্যযুগীয় শৃঙ্খল থেকে ইউরোপীয় মনন আত্মনির্ভরশীল ও যুক্তিবাদী মনোভাব অর্জনের মাধ্যমে বিজ্ঞান মনস্কতা চিরতরে স্বাধীনতা লাভ করে। ব্রুনো, কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিও’র অসমাপ্ত সংগ্রাম রেনেসাঁর মাধ্যমে সফল পরিসমাপ্তি লাভ করে। 

রিনেসাঁসের লক্ষণ হিসেবে প্রধানতঃ যে-বিষয়টিকে চিহ্নিত করা হয় তা’ হলো, প্রাচীনকালের শ্রেষ্ঠ রচনাদি আদর্শরূপে গ্রহণ কিংবা অনুকরণ করার প্রবণতা। রিনেসাঁস্কে অভিযান ও আবিষ্কারের যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। এর ফলে নতুন মহাদেশ আবিষ্কার এবং ইতঃপূর্বে অজানা বহু তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। তা’ ছাড়া দ্বিতীয় শতকে মিশরীয় জ্যোতির্বিদ টলেমীর (Ptolemy) চিন্তাধারা অনুযায়ী বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র পৃথিবী স্থির অবস্থানে থাকার পরিবর্তে কোপারনিকাসের (Copernicus) চিন্তাধারা অনুযায়ী পৃথিবীর সূর্যপ্রদক্ষিণ এবং গ্রহ-উপগ্রহ ও নক্ষত্রমণ্ডলীর গতিশীলতা স্বীকার করা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের আবিষ্কার এবং তার প্রয়োগ (যথা: কাগজ, ছাপাখানা, সমুদ্রযাত্রায় নাবিকদের ব্যবহারের উপযোগী দিনির্ণয়-যন্ত্র (এবং বারুদ) রিনেসাঁসের অঙ্গ বলে গণ্য করা হয়। অবশ্য, তৎকালীন বিদ্বজ্জনসমাজ অবক্ষয় এবং বহুকাল-স্থায়ী স্থবিরতার পর প্রাচীন গ্রীস ও রোমের শ্রেষ্ঠ লেখক ও শিল্পীদের আদর্শ এবং তৎকালে অর্জিত জ্ঞান ও চিন্তাধারার পুনরুজ্জীবনকে রিনেসাঁস বলে মনে করেন।

ধর্মীয় পরজীবীতার উৎখাত

মধ্যযুগীয় পৃথিবীতে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তা ও কর্ম ধর্মীয় বিশ্বাসের দ্বারা পরিচালিত হতো। সমুদয় কর্তৃত্ব ছিল ঈশ্বরতান্ত্রিকভাবে সাজানো। কতকটা হিন্দু ধর্মের বর্ণ প্রথার মতোই বিন্যস্ত ছিল খ্রিস্টীয় সমাজ। সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতীক হিসেবে কৃষকদের তুলনা করা হত চাঁদের সাথে, ব্যবসায়ীদের বুধ গ্রহ, ধনিক গোষ্ঠীকে শুক্র, অভিজাতদের মঙ্গল, পুরনো অভিজাতদের শনি, রাজাকে বৃহস্পতি এবং গীর্জার পুরোহিতকে সূর্যের সাথে। এভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের সবকিছুতেই ছিল খ্রিস্টীয় যাজকতন্ত্রের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতা।

ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে পার্থিব ও পারমার্থিক নানা সুবিধাদি ভোগ করছিল যাজক শ্রেণি। রেনেসাঁ মানুষের মননশীলতাকে পরিশীলিত করে গীর্জার যাজকদের কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মুক্ত করে। রেনেসাঁর কল্যাণে পুরোহিতদের যাজকীয় কর্তৃত্বকে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষ স্বয়ং অধিষ্ঠিত হয় মর্যাদার আসনে। এতে করে চূড়ান্তভাবে যাজকদের ঈশ্বরের দোহাই মানুষের ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা ও যুক্তির দ্বারা স্থানান্তরিত হয়।

এভাবে ইতালীতে গড়ে উঠা নবজাগরণ আন্দোলন প্রবাহ ক্রমশ সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। রেনেসাঁর দীক্ষায় দীক্ষিত ইউরোপবাসীরা এ সময় খ্রিস্টধর্মের মধ্যযুগীয় কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্তি লাভ করে মানুষের আত্মশক্তিকে অবিষ্কারে সক্ষম হয়। ইউরোপীয় রেনেসাঁ কালক্রমে মনের ইতিহাসের সকল পর্বে যুগান্তকারী মাইল ফলক হিসেবে দেখা দেয়। 

নিকোলা মেকিয়াভেলি

ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ আন্দোলনের প্রথম শুভ সূচনা ঘটে ইতালীয় চিন্তাবিদ নিকোলো মেকিয়াভেলী (১৪৬৯ – ১৫২৯) এর নেতৃত্বে। নব জাগরণে উদ্বুদ্ধ মেকিয়াভেলী যাজকদের অতিন্দ্রীয় শক্তিতে বিশ্বাস করতেন না। তিনি ছিলেন রেনেসাঁ জাতক; রাজনৈতিক নবজাগরণের মূর্ত প্রতীক। তার কাছে সাফল্যই ছিল মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি এবং তা যে-কোনো উপায়েই অর্জিত হোক না কেন। তার মতে, সাফল্য যেখানে উদ্দেশ্য সেখানে প্রয়োজন প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস আর নির্মমভাবে তা অর্জনের উপায় নির্ধারণ।

মধ্যযুগীয় পন্ডিতদের গীর্জাকেন্দ্রিক স্থান রাষ্ট্রচিন্তাকে অবমুক্ত করে মেকিয়াভেলী নতুন এক অভিনব কৌশল বিজ্ঞানের জন্ম দেন, যেখানে সাফল্যই শাসকের নৈতিকতার মাপকাঠি হিসেবে স্বীকৃত হয়। পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে ধর্ম ও নৈতিকতার বন্ধন থেকে রাজনীতিকে পৃথকভাবে উপস্থাপন করেন মেকিয়াভেলী। যুগের চাহিদাকে পূরণ করতে গিয়ে মেকিয়াভেলী রাষ্ট্র চিন্তাকে প্যাপাসির কুসংস্কার ও দুর্নীতি থেকে মুক্ত করে রাজনৈতিক বাস্তবতার দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেন। বাস্তবে রাজনৈতিক জগৎ যেভাবে পরিচালিত হয়, তারই আলোকে রাজনীতির কৌশল বিশ্লেষণ করেন মেকিয়াভেলী।

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ একটি সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের নাম। আধুনিক ইউরোপের অভ্যুদয়ের পেছনে রেনেসাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। রেনেসাঁ আন্দোলন কেবল যাজকতন্ত্রের হাত থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি। রেনেসাঁ ইউরোপের সমাজের সামন্তবাদীতার ধারার অবসান ঘটিয়ে আধুনিক জাতি রাষ্ট্র গঠনের সোপান তৈরী করে। ইউরোপের ইতিহাসে রেনেসাঁর প্রভাব ছিল সুদূর প্রসারী।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. হাসানুজ্জামান চৌধুরী, মো আব্দুর রশীদ, এ এমদাদুল হক ও অন্যান্য; রাষ্ট্রবিজ্ঞান দ্বিতীয় খণ্ড, রাষ্ট্রচিন্তা, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, ত্রয়োদশ প্রকাশ, ২০২০, পৃষ্ঠা ১১৯-১২০।

Leave a Comment