হেগেলের সুশীল সমাজ সংক্রান্ত ধারণা মার্কস ও অন্যান্যদের প্রভাবিত করে

ফ্রিডরিখ হেগেলের সুশীল সমাজ (Hegel on Civil Society) সংক্রান্ত ধারণা মার্কস, এঙ্গেলস, গ্রামসিসহ আরো অনেককে বহুভাবে প্রভাবিত করে। ইংরেজি Civil Society শব্দটির বাংলা অর্থ হলো সুশীল সমাজ। অনেকেই প্রত্যয়টিকে নাগরিক সমাজ, পুরুষ সমাজ, জন সমাজ, লোক সমাজ, অ-রাষ্ট্রীয় সমাজ ও বেসামরিক সমাজ ইত্যাদি নামে অবিহিত করে থাকেন। অনেকে একে সিভিল সমাজও বলে থাকেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুশীল সমাজ আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গণতন্ত্র সংরক্ষণ, উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি তথা সার্বিকভাবে রাষ্ট্র যন্ত্রকে অধিক কার্যকরী ও ফলপ্রসূ করতে সুশীল সমাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। একথায় রাষ্ট্রকে জনকল্যাণধর্মী রাষ্ট্রে পরিণত করার ক্ষেত্রে সুশীল সমাজের বিকল্প নেই।

হেগেল বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করলেন খানিকটা ভিন্ন আঙ্গিকে। তিনি নাগরিক অধিকার সম্বন্ধে একটি নতুন ধারণা প্রদান করেন এবং সুশীল সমাজ শব্দটি ব্যবহার করেন। সুশীল সমাজ বলতে এমন একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন যা বিশ্লেষণ, প্রতিবিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের মাধ্যমে একটি বুর্জোয়ার রাষ্ট্রকে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিস্থাপর করবে।

হেগেলের সুশীল সমাজ ধারনাটির তিনটি প্রধান দিক হলো – ১. চাহিদার ব্যবস্থা, ২. ন্যায় বিচার এবং ৩. পুলিশ ও কর্পোরেশন। হেগেলের মতে সুশীল সমাজ রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যস্ততাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখে। কিন্তু হেগেল মনে করেন সুশীল সমাজের মধ্যে সমৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও, এই সমাজের অসঙ্গতি ক্রমশই একে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। স্বাভাবিক ঐক্য বা শান্তি বলে এখানে কিছু নেই। দারিদ্র্য, বৈষম্য, বিরোধিতাই এই সমাজের স্বাভাবিক প্রবণতা। সুশীল সমাজ নিজের আভ্যন্তরীণ সম্ভাবনা বা সামর্থ দিয়ে এই দারিদ্র্য বা বৈষম্য রোধ করতে পারে না। কেমনভাবে সুশীল সমাজে অসঙ্গতি ও ব্যর্থতার মধ্য থেকে সৃষ্টি হয় নতুন সম্ভাবনা, নতুন শক্তি সেকথা বলেছেন হেগেল। সুশীল সমাজের মধ্যে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে বটে কিন্তু এ রাষ্ট্রব্যবস্থা অর্থাৎ বিচার, প্রশাসন, আইন প্রভৃতি এখানে যুক্তির নির্দেশে কাজ করে না। প্রকৃত রাষ্ট্র হবে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের মধ্যে সামাজিক প্রয়োজন বা ব্যবস্থাদি থাকবে কিন্তু সুশীল সমাজ ধারণাটি থাকবে না। নাগরিক বা সুশীল সমাজের গুণগুলি এই রাষ্ট্র গ্রহণ করবে এবং বজর্ন করবে এর দোষ ত্রুটিগুলি।

আরো পড়ুন:  শ্রেণিহীন সমাজ হচ্ছে এমন সমাজ যেখানে কেউ সামাজিক শ্রেণিতে থাকে না

হেগেলের বিবেচনায়, মানবিক ও সামাজিক বিকাশের এই ধারায় রাষ্ট্র হচ্ছে পরম স্তর। আর ‘সিভিল সোসাইটি’ টিকে আছে রাষ্ট্রের পরিসরে। কেবল ‘সিভিল সোসাইটি’ কখনোই সর্বজনীন স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। এজন্য দরকার রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র ‘সিভিল সোসাইটি’র অন্বিষ্ট সর্বজনীন গুণাবলি টিকিয়ে রাখে। ‘সিভিল সোসাইটি’ হলো সর্বজনীনতার পরিসরে এমন ব্যক্তিবর্গের সংঘবদ্ধতা, যারা কেবল নিজ নিজ জীবন ধারণে সক্ষম।

কার্ল মার্কস হেগেলের রাষ্ট্র আর ‘সিভিল সোসাইটি’র পারস্পরিক সম্পর্ককে অনেকটা উল্টো দিক থেকে দেখেছেন। মার্কসের কথা হচ্ছে, রাষ্ট্র ‘সিভিল সোসাইটি’র ওপর নির্ভরশীল। কারণ প্রতিটি সমাজের শ্রেণিবিভাজনের প্রভাব রাষ্ট্রের গঠনে পরিষ্কারভাবে ফুটে থাকে। এ বিবেচনায় অর্থনৈতিক বিষয়াদির সঙ্গেও ‘সিভিল সোসাইটি’র সম্পর্ক সরাসরি। আরও এগিয়ে মার্কস রাষ্ট্রের বাইরের সবকিছুকেই ‘সিভিল সোসাইটি’র অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাই সর্বহারার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান ‘সিভিল সোসাইটি’র ধ্বংসও জরুরি বলে ঘোষণা করেন মার্কস। যে ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত ছিলেন মার্কসের চিন্তা-দোসর এঙ্গেলস।

মার্কস-এঙ্গেলসের বিশ্লেষণের পর রাষ্ট্রনৈতিক আলোচনায় ‘সিভিল সোসাইটি’র প্রসঙ্গ অনেক দিন স্তিমিত থাকে। বস্তুত বিগত শতাব্দীজুড়েই মার্কসীয় চিন্তাধারা আধিপত্য বিস্তার করেছিল রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতিসহ মানব ও সমাজ বিদ্যার প্রায় সব শাখায়। মানবীয় চিন্তন প্রক্রিয়ায় এই নতুন দৃষ্টিকোণ ও পটভূমি বিশ্বকে যতটুকু আলোড়িত করেছিল, তেমনটি ছিল অভূতপূর্ব। এমন কি সমাজ বিশ্লেষণে মার্কসীয় ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘সিভিল সোসাইটি’র কোনো বিকল্প বা ভিন্নতর রূপ ও চরিত্র ব্যাখ্যার প্রয়াসও সে সময় কার্যকর হয়নি। পরিস্থিতি এমনই ছিল যে, একটি ঘোরতর মার্কসীয় চিন্তাবলয় মানুষের ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল এবং ক্ষেত্র বিশেষে সেই সত্যমুখী চিন্তাস্রোত প্রচ্ছন্নে গোঁড়ামির দিকেও চলে গিয়েছিল। এ পরিস্থিতির অবসান ঘটে বিগত শতাব্দীর ৮০ দশকে। তখন পূর্ব ইউরোপের প্রতিক্রিয়াশীল সলিডারিটি আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রায়নের দাবির মুখে সমাজ অভিমুখী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে মার্কসবাদ এবং সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে নবতর প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় ফিরে আসে ‘সিভিল সোসাইটি’ প্রসঙ্গ। যে চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা আন্তোনিও গ্রামসির।

আরো পড়ুন:  হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বা দ্বন্দ্ববাদ হচ্ছে বস্তু ও সমাজ সম্পর্কিত অভীক্ষার পদ্ধতি

গ্রামসি মার্কসীয় ধারণার মধ্যে থেকেই খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে ‘সিভিল সোসাইটি’র এমন কিছু দিক সামনে নিয়ে এসেছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে চলমান নানা ধরণের ‘সিভিল সোসাইটি’ সংক্রান্ত আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। ‘সিভিল সোসাইটি’র অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এবং এ নিয়ে নানা মতলবের মধ্য থেকে মৌল ধারণাটিও পাওয়া সম্ভব গ্রামসির মাধ্যমে। ভাবনাটি গ্রামসি শুরু করেছেন বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে। বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা ও স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গ্রামসি দেখেছেন, সমাজের উপরিতলে দুটি স্তর রয়েছে – ১. ‘সিভিল সোসাইটি’ বা সাধারণভাবে ব্যক্তিগত বলে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমাবেশ সেখানে; ২. পলিটিক্যাল সোসাইটি বা রাষ্ট্র।

গ্রামসির মতে, ‘সিভিল সোসাইটি’ পলিটিক্যাল সোসাইটি বা রাষ্ট্রের ঢালস্বরূপ। গ্রামসির বক্তব্য থেকে সিভিল সোসাইটি সম্পর্কে তার ধারণা সরল সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। আসলে বৃহত্তর অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক প্রভাব এবং অবিরাম লেনদেনের কথা বিবেচনা করে সিভিল সোসাইটি ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট এবং সীমাচিহ্নিত সম্পর্ক নির্দেশ করা খুবই দুরূহ। কেননা, প্রচলিত অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তি প্রায়শই এই বিভাজন রেখা ভেদ করে যায়। অর্থাৎ সিভিল সোসাইটিতে থেকেও পলিটিক্যাল সোসাইটিতে তার দ্বৈত উপস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতা ও আধিপত্যে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে। ফলে একদিকে সে আধিপত্যের আওতাধীন। আবার সে-ই হয়ে ওঠে আধিপত্যশীল। সিভিল সোসাইটি থেকে ব্যক্তি তার ক্ষমতালিপ্সার তাড়নায় প্রবেশ করতে পারে পলিটিক্যাল সোসাইটিতে।

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৪০২-৪০৩।

Leave a Comment

error: Content is protected !!